তখন রাত আড়াইটা। ঢাকের বাদ্য তখনো থামেনি। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মধ্যে একের পর এক প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে বিদায়ের আবেগ। নৌকায় প্রতিমা তোলার আগে শেষবারের মতো প্রণাম করছেন কেউ কেউ। তারপর ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গার দিকে। নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে শেষ হচ্ছে কয়েক দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের। শুরু হচ্ছে আবার একটি বছরের অপেক্ষা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) গভীর রাতে পুরান ঢাকার সদরঘাট-সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাট, বিনা স্মৃতি স্নানঘাটসহ আশপাশের ঘাটগুলোতে এমন দৃশ্য দেখা যায়। রাত বাড়লেও ঘাটে ভক্তদের আনাগোনা থামেনি। বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে আসছিলেন তারা। কোথাও ঢাকের তালে তালে শোভাযাত্রা ঘাটে পৌঁছাচ্ছে, কোথাও বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে। আবার কোনো কোনো দল প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির বিসর্জন ঘাট কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিমা বিসর্জনের কার্যক্রম ভোর পর্যন্ত চলবে।
এদিকে উৎসবের কোলাহলের মধ্যেও বিদায়ের মুহূর্তগুলো ছিল আলাদা। কয়েক দিন ধরে যে প্রতিমাকে ঘিরে প্রার্থনা, আনন্দ আর মিলনমেলা, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সেই আয়োজনের সমাপ্তি। প্রতিমা নদীতে নামানোর আগে কেউ হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকছিলেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছিলেন। বিসর্জন শেষে ঘাটে ফিরে আসা মানুষগুলোর চোখেমুখে ছিল ক্লান্তি, তৃপ্তি আর আবারও ফিরে আসার প্রত্যাশা।
বিজ্ঞাপন
বিদায়ের কষ্ট, আবারও বরণের অপেক্ষা
প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নেওয়া সৌরভ সাহা জাগো নিউজকে বলেন, পূজার এই কয়েকটা দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে খুব আনন্দে কাটে। পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, একসঙ্গে প্রার্থনা করি। বিসর্জনের সময় তাই মনটা খারাপ হয়ে যায়। তবে জানি, আবার আগামী বছর দেবীকে বরণ করে নেওয়ার সময় আসবে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিসর্জনে আসা তনুশ্রী সরকার জাগো নিউজকে বলেন, পূজার দিনগুলোতে চারপাশে অন্য রকম একটা আনন্দ থাকে। বিসর্জনের সময় মনে হয়, এত তাড়াতাড়ি দিনগুলো শেষ হয়ে গেল! তবে পরিবারের সবাই মিলে নিরাপদে বিসর্জন দিতে পেরে ভালো লাগছে। এখন অপেক্ষা আগামী বছরের।
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা অমিত কুমার শীল বলেন, ছোটবেলা থেকেই বুড়িগঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন দেখে আসছি। ঢাকের শব্দ, মানুষের ভিড় আর নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্যের সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রতি বছরই মনে হয়, উৎসবটা আরেকটু সময় চলুক। কিন্তু নিয়ম মেনে বিদায় জানাতেই হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রতিমা বহনে সহযোগিতা করা তরুণ স্বেচ্ছাসেবক শাওন সরকার বলেন, আমাদের কাজ শুধু প্রতিমা বিসর্জনে সহযোগিতা করা নয়, সবাই যেন নিরাপদে আসতে ও ফিরে যেতে পারেন, সেটিও দেখা। ভক্তরা যখন বিসর্জন শেষে ফিরে যান, তখন তাদের মুখে একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে মন খারাপের ছাপ দেখা যায়। এই উৎসবের সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে।
বিদায়ের আয়োজনেও শৃঙ্খলা
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিসর্জন ঘাটগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা প্রতিমা নিয়ে আসা দলগুলোকে নির্দিষ্ট ঘাটে পৌঁছে দিচ্ছিলেন, নৌকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন এবং ওঠানামায় সহযোগিতা করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নৌকার ব্যবস্থা করা হচ্ছিল, এ জন্য ভক্তদের আলাদা করে অর্থ দিতে হচ্ছিল না।
বিসর্জন নির্বিঘ্ন রাখতে নদী ও সড়কে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল। পুলিশ, নৌ পুলিশ, গোয়েন্দা সদস্য, এপিবিএন, বিজিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছিলেন। নদীতে প্রতিমা বহনকারী নৌকাগুলোর আশপাশে ফায়ার সার্ভিসের স্পিডবোট নিয়ে সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়। ঘাট ও আশপাশের সড়কে মানুষের চলাচল এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণেও ছিল নজরদারি।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির বিসর্জন ঘাট কমিটির সদস্য বাপ্পী নন্দী জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা যেন সুশৃঙ্খলভাবে বিসর্জন দেওয়া যায়, সে জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে ভক্তদের সহযোগিতা করছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। যারা সাঁতার জানেন না, তাদের নৌকায় উঠতে নিষেধ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার রাত সাড়ে ১১টায় জাগো নিউজকে বলেন, বিসর্জন ঘিরে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট, এপিবিএন এবং নারী পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। তখন পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
ঢাকের শব্দ পেরিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষা
রাত সাড়ে ১২টার পরও ঘাটের পাশ থেকে দূরে ভেসে আসছিল ঢাকের শব্দ। কেন্দ্রীয় মঞ্চ থেকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল। একের পর এক প্রতিমা নিয়ে ঘাটে আসছিলেন ভক্তরা। বিসর্জন শেষে কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ফিরে যাচ্ছিলেন বাড়ির পথে।
বুড়িগঙ্গার জলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছিল দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু ঘাট থেকে ফিরে যাওয়া মানুষের মনে উৎসবের স্মৃতি তখনো তাজা। বিদায়ের আবেগের সঙ্গে মিশে ছিল আবারও একসঙ্গে পূজা উদযাপন, মণ্ডপে ফেরা এবং দেবীকে বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা।
বিজ্ঞাপন
বিসর্জন পর্বে অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অর্ণব পাল জাগো নিউজকে বলেন, উৎসব শেষ, ঢাকের শব্দ একসময় থেমে যাবে। দৈনন্দিন জীবনে ফিরবেন সবাই। তবু বুড়িগঙ্গার ঘাটে এই স্মৃতি থেকে যাবে। কয়েক দিনের আনন্দ, শেষবারের মতো প্রণাম আর আগামী শরতে আবার দেখা হওয়ার অপেক্ষা নিয়ে।
এমডিএএ/এমআইএইচএস
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
