জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ভুল কিংবা ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া স্বাভাবিক। জীবনে সফল হওয়ার পথে বাধা আসতেই পারে। কখনো পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হয় না, কখনো পরিশ্রমের পরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। কিন্তু একটি ব্যর্থতা দিয়ে মানুষের সামর্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। বরং ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা মানুষকে নিজের দুর্বলতা বুঝতে, ভুল সংশোধন করতে এবং নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
ব্যর্থ হওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়, ব্যর্থ হওয়া মানে জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ব্যর্থতা নতুন করে আবার শুরু করার প্রেরণা। ব্যর্থতা হলো একটি নতুন সূচনার মাধ্যম, যা আপনাকে আরও অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী করে তোলে।
হাল ছেড়ে দেওয়া মানেই হেরে যাওয়া। আমরা অনেকে মনে করি ব্যর্থ হলে হেরে গেছে। আসলে ব্যর্থ হলে আবার আপনি নতুন করে চেষ্টা করলে আপনি সফলতা দেখতে পারবেন। এবং ব্যর্থ হলে ভেঙ্গে পড়ার কোন কিছুর দরকার নেই। অনেকে মনে করে ব্যর্থ হলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবো না।
- পিছিয়ে পড়ার মানেই, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রিয়জন ছেড়ে যাওয়ার মানেই, বেচে থাকাটা মূল্যহীন হয়ে যাওয়া নয়। এক দরজা থেকে ফিরিয়ে দেয়ার মানেই, সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং ব্যর্থতার মানে, ভুল শুধরানোর সুযোগ।
- পিছিয়ে পড়ার মানে, স্কিল ডেভেলপ করতে উদ্বুদ্ধ হওয়া। ধোঁকায় পড়া মানে, বিকল্প উপায়ে চেষ্টা করার তাগিদ। পরীক্ষায় ফেল করা মানে, পড়ালেখার ব্যাপারে সিরিয়াস হওয়া। চাকরির ইন্টারভিউতে রিজেক্ট হওয়ার মানে, পরের ইন্টারভিউর জন্য ১০গুন ভালো প্রিপারেশনের ইঙ্গিত।
ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র-সব জায়গাতেই প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে একটি ব্যর্থতা দিয়ে মানুষের সামগ্রিক সক্ষমতা বিচার করা যায় না।
আমাদের সমাজে সফলতার পরিমাপক যেন বেশ স্পষ্ট—ভালো ফল, ভালো চাকরি, আর্থিক স্বচ্ছলতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা। এসব অর্জন করতে পারলে মানুষ প্রশংসা পায়। অন্যদিকে, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে অনেক সময় শুনতে হয় নানা প্রশ্ন, তুলনা কিংবা কটুকথা। ফলে ব্যর্থতার কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যের কাছে নিজেকে ছোট মনে করার ভয়।
এই ভয় থেকেই অনেকে নিজের ব্যর্থতার কথা লুকিয়ে রাখেন। কেউ নতুন করে চেষ্টা করার সাহস হারান, কেউ আবার অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করে হতাশ হয়ে পড়েন।
জানা যায়, ফিনল্যান্ডের আল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ২০১০ সালে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেন। তারা লক্ষ করেন, ব্যর্থতার ভয়ে দেশটির অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা কিংবা উদ্যোগ শুরু করতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এ পরিস্থিতি বদলাতে তারা এমন একটি দিনের প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে ব্যর্থতা স্বীকার করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। এতে মানুষ ব্যর্থতার ভয় কাটিয়ে নতুন উদ্যোগে উৎসাহিত হবে- এমনটাই ছিল তাদের প্রত্যাশা।
শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ দ্রুত ফিনল্যান্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। ২০১২ সালের মধ্যে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হতে শুরু করে। ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান- উভয়ের ক্ষেত্রেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াকে বিকাশ ও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আজ বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস। ইংরেজিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর ফেইলিউর’ নামে পরিচিত এ দিবসের উদ্দেশ্য হলো ব্যর্থতা নিয়ে সামাজিক সংকোচ কমানো এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে চেষ্টা করার মানসিকতা উৎসাহিত করা।
ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নতুন করে চেষ্টা করার অনুপ্রেরণা জোগাতেই প্রতি বছর দিনটি পালিত হয়। ২০১০ সালে ফিনল্যান্ডের একদল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়।
ব্যর্থতাকে লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে চেষ্টা ও সাহসের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করাই এ দিবসের মূল বার্তা। কারণ, ব্যর্থতা মানেই হেরে যাওয়া নয়, বরং কোনো কিছু অর্জনের জন্য চেষ্টা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব জীবনে ধোঁকা খাওয়া, বোকা হওয়া- সমস্যা নয়। পরীক্ষার ফেল করা, প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়াও- সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে- এইসব সাময়িক ব্যর্থতায় দমে যাওয়া। আশানুরূপ ফল না দেখে, রাস্তা ছেড়ে দেওয়া। ক্লান্ত হয়ে লক্ষ্য ভুলে যাওয়া। সুতরাং ব্যর্থতা মানে শেষ নয়, এটি শুধু নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেয়, তাই যেকোন পরাজয়ে হাল ছাড়লে হবেনা। লেগে থাকতে হবে, পরিশ্রম করে যেতে হবে!
