
কাদামাটি আর খড়ের কাঠামোয় রূপ পাচ্ছে শারদীয় আনন্দ, কুমিল্লায় ৮৬০ মণ্ডপে চলছে প্রস্তুতি
সোহেল রানা, চান্দিনা।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। উৎসবের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা। বাঁশ, খড় আর কাদামাটির মায়াবী ছোঁয়ায় মণ্ডপে মণ্ডপে এখন রূপ নিচ্ছে শারদীয় আনন্দ। কোথাও চলছে প্রতিমার শরীরে মাটির শেষ প্রলেপ, কোথাও শিল্পীর নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে চোখ-মুখের অভিব্যক্তি, আবার কোথাও চলছে রং ও অলংকরণের কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি করে মণ্ডপে পৌঁছাতে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন কারিগররা। কাজের চাপে অনেককেই কাটাতে হচ্ছে নির্ঘুম রাত।
কুমিল্লা মহানগরীসহ জেলার ১৭টি উপজেলায় শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জেলা পূজা উদযাপন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কুমিল্লা জেলায় মোট ৮৬০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন প্রতিমা তৈরির কারখানায় তৈরি হচ্ছে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশসহ দেবদেবীর প্রতিমা। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জেলার পূজামণ্ডপগুলোর জন্য তৈরি প্রতিমার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই বিভিন্ন কারখানায় নির্মিত হয়; পাশাপাশি অনেক মণ্ডপে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও তৈরি করা হচ্ছে প্রতিমা।
প্রতিমা তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ, খড় ও কাদামাটি। প্রথমে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় প্রতিমার মূল কাঠামো। এরপর সেই কাঠামোর ওপর খড় পেঁচিয়ে দেওয়া হয় প্রাথমিক আকৃতি। পরবর্তী ধাপে মাটির প্রলেপ দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলা হয় প্রতিমার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব। মাটির প্রলেপ শুকানোর পর শুরু হয় সূক্ষ্ম কারুকাজ। মুখমণ্ডল, চোখ, নাক, ঠোঁট, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশের গঠন নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন দক্ষ কারিগররা। সবশেষে চলে রং করা, অলংকরণ ও অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ। প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও নিপুণ হাতের কাজ।
প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত কারিগররা জানান, উৎসবের আগে নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা সরবরাহ করতে গিয়ে দিন-রাত এক করে কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরের সাহাপাড়া এলাকার প্রতিমা তৈরির কারিগর রিপন পাল বলেন, “প্রতিবছর দুর্গাপূজায় আমার কারখানায় প্রায় ৫০টি মণ্ডপের জন্য প্রতিমা তৈরি করি। এ জন্য পূজার অন্তত চার মাস আগে থেকেই কাজ শুরু করতে হয়। শেষের দুই মাসে কাজের চাপ বেড়ে যায়, তখন অতিরিক্ত লোকজনের প্রয়োজন হয়। এখন ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছি।”
অনুকূল আবহাওয়ার স্বস্তির কথা জানিয়ে কুমিল্লা মহানগরীর মনোহরপুরের রাজরাজেশ্বরী কালী মন্দিরের কারিগর অনিল কৃষ্ণ পাল বলেন, “এবার ২৫টি মণ্ডপের জন্য প্রতিমা তৈরি করছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া অনেকটা অনুকূলে থাকায় বেশ স্বচ্ছন্দেই কাজ চালিয়ে যেতে পারছি। এখন বেশির ভাগ প্রতিমার রং করার কাজ চলছে। আগামী মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা পাঠানো শুরু হবে।”
এদিকে কুমিল্লা জেলা পূজা উদযাপন কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ সরকার জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রতিমার দাম কিছুটা বেশি হলেও জেলায় পূজামণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তিনি বলেন, “সকলকে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।”
দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। আর সেই উৎসবের সৌন্দর্য বাড়াতে প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের নিপুণ হাতে মাটি, বাঁশ ও খড়ের কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবদেবীর প্রতিমায়। এখন শেষ মুহূর্তের কাজ সম্পন্ন করে প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়ার পালা। কারিগরদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হবে এবং ভক্ত-পূজারিরা মেতে উঠবেন শারদীয় উৎসবে।
ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা
ট্যাগ: বৃহত্তর কুমিল্লা আন্তর্জাতিক রাজনীতি
