আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের দুই আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপ অস্থিরতা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে সাজেক ও পাশের জেলা খাগড়াছড়ির প্রায় দেড় শ হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে।
চলতি মৌসুমের শুরুতে দিনে কোটি টাকার ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে তাদের।
সাজেক হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘সাজেকে মোট ১১০টি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এ ছাড়া দৈনিক ৭-৬ হাজার পর্যটকের জন্য খাবারের হোটেল, পরিবহনের লোকজন, ট্যুর গাইডসহ প্রায় ১ কোটি টাকার কারবার হয়। দফায় দফায় অস্থিরতার কারণে আমাদের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এতে কয়েক হাজার পরিবার বেকার হয়ে পড়বে।’
খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি স্বপন চন্দ্র দেবনাথ জানান, খাগড়াছড়িতে ৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। এ ছাড়া দৈনিক ৭-৮ হাজার পর্যটকের জন্য খাগড়াছড়ির পরিবহন ও খাবারের হোটেলের সঙ্গে কয়েক হাজার পরিবার জড়িত। সাজেকে অস্থিরতার কারণে ব্যবসার অবস্থা খারাপ।
দফায় দফায় অস্থিরতার কারণে আমাদের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এতে কয়েক হাজার পরিবার বেকার হয়ে পড়বে।
স্বপন বলেন, পাহাড়ের জেএসএস-ইউপিডিএফ সংঘাতে সাজেক-খাগড়াছড়ি অবরোধে বিপদে পড়ে পর্যটকেরা। গত দুসপ্তাহে তিন দফায় অবরোধের ডাক দেয় ইউপিডিএফ-সমর্থিত কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটি নামের দুই সংগঠন। গতকাল শুক্রবারও বাঘাইহাট-সাজেক সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। আজ শনিবার খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় ইউপিডিএফ-সমর্থিত ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ আধা বেলা নৌ ও সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে।
স্বপন আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ অবস্থার উত্তরণ না হলে পর্যটনশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।’
সাজেকে গত বৃহস্পতিবার অবরোধে আটকা পড়ে প্রায় ৩ হাজার পর্যটক। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে গেলে তাদের ওপর হামলা ও গুলি চালায় অবরোধকারীদের একটা অংশ। পরে নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা গুলি চালিয়ে ওই পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাজেকের উজোবাজার এলাকায় ইউপিডিএফ-সমর্থিত কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে ওই অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
অবরোধের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে স্থানীয় সূত্র জানায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাসখানেক ধরে সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতে জড়িয়েছে ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সন্তু)। মূলত ইউপিডিএফ কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে সমাবেশ করে জেএসএস (সন্তু)-কে সাজেক ছাড়ার জন্য আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। এ নিয়ে দফায় দফায় কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে তৃতীয় দফায় অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে তারা।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা জানান, আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ অস্থিরতায় ৮ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশ থেকে জেএসএস (সন্তু)-কে সাজেক ছাড়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা। বিভিন্ন সময়ে সংগঠন দুটির মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাচা থোয়াই মারমা বলেন, একটি পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এরই অংশ হচ্ছে বৃহস্পতিবারের ঘটনা। সরকারকে এ বিষয়ে সব সময় সজাগ থাকতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার সহিংসতা সম্পর্কে পুলিশ জানায়, ইউপিডিএফ নেতা বাবুধন চাকমা, আদী বাবু, মিলন চাকমা ও বিজয় কান্তি চাকমার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিরীহ পর্যটক ও স্থানীয় লোকজনকে জিম্মি করে সাধারণ জনগণের নামে সহিংসতা চালানোই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে পর্যদুস্ত হয়ে তারা এখানে অবস্থান নিয়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির নেতা নতুনজয় চাকমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে।
