কর্নওয়ালের ফালমাউথে একটি পুরোনো ব্যাংক ভবনের ভেতরে তখন চারপাশ কাঁপিয়ে বাজছে মিউজিক। ঘামে ভেজা তরুণ-তরুণীর ভিড়, আলো আর মিউজিকের তালে সবাই যেন এক অদ্ভুত সুরের জালে বন্দী। সেখানে ডিজে হিসেবে উপস্থিত রবার্ট (রস) অ্যাটকিনস স্পষ্ট অনুভব করেছিলেন—এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি ডিজে নাইটের নয়, এটি মানবীয় অনুভূতি ও উপস্থিতির এক অপূর্ব উদ্যাপন, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে তৈরি করা অসম্ভব।
কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই সহজ সত্যটাই পড়েছে বড় প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে, জেনারেটিভ এআই যখন নিমেষে গান বানাচ্ছে, ছবি আঁকছে বা উপন্যাস লিখে ফেলছে, তখন শিল্পপ্রেমীদের ভাবতে হচ্ছে—শিল্পের অন্তরালে মানুষের ছোঁয়া থাকাটা আদৌ জরুরি কি না।
অ্যালগরিদম বনাম মানুষের আবেগ
মিউজিক প্ল্যাটফর্ম ‘ডিজার’-এর তথ্যমতে, তাদের আপলোড করা গানের ৪৪ শতাংশই এআই দিয়ে তৈরি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, ৯৭ শতাংশ শ্রোতা বুঝতে পারছেন না, কোনটা মানুষের গাওয়া গান আর কোনটা এআই দিয়ে তৈরি। তবে আকর্ষণীয় তথ্য হলো, অর্ধেকের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, কাজটি কার করা, তা নিয়ে তাঁরা সত্যি ভাবেন। কারণ, মাইকেল জ্যাকসনের পারফরম্যান্স, মাইকেলেঞ্জেলোর সিস্টিন চ্যাপেলের দেয়ালচিত্র বা দাবা খেলায় গ্যারি কাসপারভের লড়াই মানুষকে যেভাবে অনুপ্রাণিত করে, তার মূলে রয়েছে মানুষের মেধা, শ্রম ও জীবনের অভিজ্ঞতা।
হিউম্যান প্রিমিয়াম ও শিল্পের নিজস্বতা
প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে এখন চারদিক কৃত্রিম এবং একই ছাঁচে ঢালা কনটেন্টে ছেয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, ঠিক এই কারণেই মানুষের তৈরি শিল্পের প্রতি আগ্রহ বা হিউম্যান প্রিমিয়াম তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিমতার এই ভিড়ে মানুষ এখন এমন শিল্প খুঁজছে, যেখানে মানুষের আবেগ, কিছুটা অসম্পূর্ণতা কিংবা নিজস্বতা রয়েছে। এমনকি বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও এআই ফ্রি হিউম্যান মেইড লেবেল ব্যবহারের ধুম পড়েছে, যাতে ক্রেতারা খাঁটি মানবীয় সৃষ্টির কদর করতে পারেন।
অ্যালগরিদমের ফাঁদে আমাদের বিনোদন
তবে মুদ্রার অন্য পিঠও কম উদ্বেগের নয়। বর্তমানে আমরা বই, চলচ্চিত্র কিংবা সংগীত নির্বাচনের ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমের তৈরি করে দেওয়া তালিকার ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এই সহজলভ্যতা আমাদের অলস করে দিচ্ছে এবং গভীর ও জটিল শিল্প বোঝার ধৈর্য কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে শিল্পীরাও অ্যালগরিদমের নজর কাড়তে তাঁদের সৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন আনছেন।
ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে
একসময় শ্রেণিকক্ষে ক্যালকুলেটর ব্যবহারের বিরোধিতা করেও বন্ধ রাখা যায়নি তার প্রসার। একইভাবে শিল্পেও এআইয়ের প্রবেশ আটকানো যাবে না। তবে একটি কনসার্টে হাজারো মানুষের সঙ্গে সরাসরি নাচগান করা বা জীবন্ত শিল্পীর উপস্থিতি উপভোগ করার যে অনুভূতি, তা এআই কখনো প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। আমরা কি ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমের নিখুঁত কনটেন্টেই মানিয়ে নেব, নাকি মানুষের অনুভূতি ভরা সৃষ্টি বুকের কাছে ধরে রাখব, সেই চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের হাতেই রয়ে গেছে।
শিল্পকলা ও প্রযুক্তির দ্বন্দ্বে আপনার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি কী? মানুষের আবেগহীন নিখুঁত সৃষ্টি, নাকি কিছুটা অসম্পূর্ণ হলেও মানুষের ছোঁয়া পাওয়া শিল্প—কোনটি আপনি বেশি প্রাধান্য দেবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আসলে শেষ পর্যন্ত আপনার হাতেই।
সূত্র: বিবিসি
