মোহাম্মদ রিদুয়ান হাফিজ, চকরিয়া প্রতিনিধি
কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় পোল্ট্রি মুরগির খামার পরিচালনা করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। মুরগির খাদ্য, ওষুধ, বাচ্চা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। অন্যদিকে, বাজারে মুরগি বিক্রি করে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে পুঁজি হারিয়ে অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে প্রতি বস্তা মুরগির খাদ্য ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৩ হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি বস্তা খাদ্যের দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা। এর পাশাপাশি মুরগির ওষুধ, বয়লার মুরগির বাচ্চা এবং খামারে ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা।
খামারিদের অভিযোগ, বেশি দামে বাচ্চা কিনে কয়েক সপ্তাহ ধরে লালন-পালন করার পর বাজারে বিক্রির সময় ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। ফলে খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের খরচ মেটানোর পর লাভ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে মূলধনও উঠে আসে না।
লক্ষ টাকার লোকসানে বন্ধ করেছেন খামার
মাতামুহুরী উপজেলার প্রান্তিক খামারি মোহাম্মদ মাশুক এলাহী বলেন, “পোল্ট্রি মুরগির খামার করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা লোকসান দিয়েছি। অতিরিক্ত লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এখন জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি। চেয়েছিলাম নিজের পায়ে দাঁড়াব, নিজের একটা কর্মসংস্থান গড়ে তুলব। কিন্তু পোল্ট্রি খামারে লোকসান দিতে দিতে আর সহ্য করতে না পেরে চাকরির পথ বেছে নিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, প্রান্তিক খামারিরা অনেক আশা নিয়ে এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। কিন্তু খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়তে থাকায় তাঁদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আরও অনেক খামারি তাঁদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।
উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগে খামারিরা
চকরিয়া উপজেলার আরেক প্রান্তিক খামারি মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, পোল্ট্রি খামার পরিচালনা করতে গিয়ে বর্তমানে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। খাদ্য, ওষুধ ও বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। কিন্তু মুরগি বিক্রির সময় সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এতে খামার পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারিদের পুঁজি সীমিত। একবার বড় ধরনের লোকসান হলে তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই খামারিদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ
চকরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আরিফ উদ্দিন বলেন, পোল্ট্রি খামারিদের সমস্যা সমাধানে উৎপাদন খরচ, খামারের ব্যবস্থাপনা ও মুরগির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। খামারিদের সঠিক নিয়মে মুরগি পালন, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খামারিরা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে খামার পরিচালনা করলে উৎপাদন ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকৃত হতে পারেন।
সরকারের সহযোগিতা চান প্রান্তিক খামারিরা
প্রান্তিক খামারিরা পোল্ট্রি শিল্পের সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, মুরগির খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুরগির ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
খামারিদের মতে, পোল্ট্রি শিল্প শুধু উদ্যোক্তাদের জীবিকার মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও দেশের প্রাণিজ আমিষের জোগান। তাই এ খাতের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় একের পর এক প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও পোল্ট্রি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম নিউজ / এসডি/
