বিশ্বেজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব বাড়ছে। একসময় তাপপ্রবাহ ছিল স্বল্পস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এখন তা বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, কখনো কখনো মাসের পর মাস স্থায়ী হচ্ছে তাপপ্রবাহ। এমন ভয়ংকর তাপপ্রবাহকে ‘তাপঝড়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী রেকর্ড গড়া একটি তাপঝড় পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকাকে কোনো না কোনো সময়ে প্রভাবিত করেছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রয়টার্সের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তাপঝড় সক্রিয় থাকত। চলতি দশকে সেই সংখ্যা বেড়ে বছরে গড়ে প্রায় ১০২টিতে দাঁড়িয়েছে। গত ছয় দশকে পৃথিবীর তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিবর্তন শনাক্ত করেছে সংস্থাটি।
রয়টার্স বিশ্বের ১০ লাখের বেশি ভৌগোলিক এলাকার ১৯৬০ সাল থেকে প্রতিদিনের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এ কাজে দুই ডজন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকের মতামতও নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো স্থানে টানা পাঁচ দিন বা তার বেশি সময় অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এমন তাপপ্রবাহ কোনো একপর্যায়ে পৃথিবীর মোট আয়তনের অন্তত এক শতাংশ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে তাকে ‘তাপঝড়’ বা হিট স্টোর্ম বলা হচ্ছে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকের সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি প্রায় ৪৬ দিন ধরে আটলান্টিক মহাসাগর, লাতিন আমেরিকার কিছু অংশ ও পশ্চিম আফ্রিকার ওপর বিস্তৃত ছিল। এটি পৃথিবীর প্রায় ছয় শতাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করেছিল। বিপরীতে, চলতি দশকের সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি ৩৬৭ দিন স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
তাপঝড়ের প্রভাব শুধু অসহনীয় গরমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি খরা ও দাবানল বাড়াতে পারে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ওই তাপঝড়ের সময় সৌদি আরবের মক্কায় হজের সময় তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়েছিল। এতে এক হাজার ৩০০ জনের বেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবানল পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে লিবিয়ার দেরনা শহরে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যাও দেখা দেয়।
২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে ইউরোপের বড় অংশে তীব্র গরমে রেললাইনের ইস্পাত বেঁকে যায়। ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকার এক সপ্তাহে স্বাভাবিকের অতিরিক্ত ১০ হাজারের বেশি মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে চলতি দশক পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে তাপপ্রবাহ ও তাপঝড়ে আক্রান্ত পৃথিবীর গড় অংশ ১২ গুণের বেশি হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানির পর্যায়ক্রমিক ঘটনা এল নিনোও তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করছে।
নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের অধ্যাপক জেমস রেনউইক বলেছেন, তাপঝড় বৈশ্বিক সভ্যতার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ তাপ। এর ফলে দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট, মৃত্যু ও সম্পদের জন্য সংঘাত বাড়তে পারে।
বর্তমান তাপপ্রবাহটি পৃথিবীর বড় একটি অংশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘রাইমুন্ডো’ নামের এই তাপপ্রবাহটি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় এবং পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করে। গ্রীষ্মকালে ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ এবং স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনার সঙ্গে এই তাপপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে জলবায়ু ঝুঁকিগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার সময় প্রায়শই বৈশ্বিক তাপমাত্রার লক্ষ্যমাত্রার কথা উঠে আসে, কিন্তু ব্যাপক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তাপপ্রবাহগুলো দৈনন্দিন জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও প্রত্যক্ষভাবে ফুটিয়ে তোলে।