ডি এইচ দিরসান, যশোর : দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের বিনামূল্যে
দেওয়ার জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা ফিজিশিয়ান
স্যাম্পল ঘিরে যশোরে অবৈধ বেচাকেনার অভিযোগ উঠেছে।
করের আওয়াতামুক্ত এ মেডিসিন চিকিৎসকদের কাছে
পৌঁছানোর কথা থাকলেও এসব ওষুধের একটি অংশ বিভিন্ন
ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিরা। জেলার ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের স্যাম্পল
বরাদ্দের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে কমপক্ষে ২০ কোটি
টাকার নমুনা ওষুধ বিতরণের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। একটি
হিসাব অনুযায়ী, এ অঙ্ক সর্বোনিম্ন ২১ কোটি ৭৩ লাখ ৫০
হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) যশোর শহরের বঙ্গবাজারে ঔষধ প্রশাসন
অধিদপ্তরের অভিযানে তিনটি ফার্মেসি থেকে বিপুল পরিমাণ
ফিজিশিয়ান স্যাম্পল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হাসান
ফার্মেসি, হোসেন ফার্মেসি ও বাঁধন ফার্মেসিকে মোট
১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দোকানগুলো
থেকে বিপুল পরিমান ফিজিশিয়ান স্যাম্পল জব্দ করা হয়।
অভিযানের পর প্রশ্ন উঠেছে, দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার
জন্য বরাদ্দ করা ওষুধ কীভাবে খুচরা বিক্রির দোকানে পৌঁছাচ্ছে
এবং এ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে কারা জড়িত। যদিও এ সব
ফার্মেসি মালিকের দাবি ফিজিশিয়ান মেডিসিন তো আর
আমরা বানাই না। বড় বড় ডাক্তারের সহকারীরা আমাদেও কাছে
দিযে যান।
যশোরে দায়িত্বরত একটি স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানির নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ম্যানেজার বলেন, তাঁদের একজন
মেডিকেল প্রমোশন অফিসার (এমপিও) প্রতি মাসে কমপক্ষে
৬০ হাজার টাকার ফিজিশিয়ান স্যাম্পল পেয়ে থাকেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের একটি হিসাব অনুযায়ী, যশোর জেলায় ছোট
বড় মিলিয়ে ৬৯টি ওষুধ কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিটি কোম্পানিতে ৩০ থেকে ৩৫ জন এমপিও কাজ করেন।
কোম্পানিভেদে প্রত্যেক এমপিও প্রতি মাসে ৪৮ হাজার থেকে
৯০ হাজার টাকার ফিজিশিয়ান স্যাম্পল পেয়ে থাকেন। এই
হিসাব অনুযায়ী, জেলায় কোম্পানিগুলোর এমপিওর সংখ্যা ২
হাজার ৭০ থেকে ২ হাজার ৪১৫ জন। তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক
বরাদ্দের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ অঙ্ক ধরে হিসাব করলে প্রতি
মাসে মোট স্যাম্পলের আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৯ কোটি ৯৩ লাখ
৬০ হাজার থেকে ২১ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ,
সর্বোচ্চ হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ২৬১ কোটি টাকার
ওষুধের নমুনা বিতরণের জন্য বরাদ্দ থাকে।
ওষুধ কোম্পানিগুলো বাজারে নিজেদের ওষুধের পরিচিতি বাড়াতে
বিভিন্ন বিপণন কৌশল ব্যবহার করে। এর একটি হলো
চিকিৎসকদের কাছে ফিজিশিয়ান স্যাম্পল সরবরাহ। এসব
নমুনা ওষুধের উদ্দেশ্য হলো চিকিৎসকদের ওষুধ সম্পর্কে ধারণা
দেওয়া এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রোগীদের বিনামূল্যে সরবরাহ করা,
বিশেষত যাঁরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ওষুধ কোম্পানির ম্যানেজারের ভাষ্য,
কোম্পানিগুলোর মেডিকেল প্রমোশন অফিসাররা বাণিজ্যিক
ওষুধের পাশাপাশি স্যাম্পল ওষুধও পেয়ে থাকেন। তাঁদের
নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়। এ অবস্থায় স্যাম্পল
ওষুধের বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা
প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন মহল। অভিযোগ রয়েছে, কিছু
ক্ষেত্রে এমপিওরা চিকিৎসকদের পাশাপাশি ফার্মেসি মালিকদের
কাছেও স্যাম্পল ওষুধ পৌঁছে দেন। আবার কিছু ফার্মেসি
মালিকের দাবি, চিকিৎসকদের সহকারীরা তাঁদের দোকানে এসব
ওষুধ দিয়ে যান।
যশোর শহরের শংকরপুর এলাকার মহিউদ্দিন নামে এক ওষুধ ক্রেতা
বলেন, আমি বঙ্গবাজার থেকে ওষুধ কিনেছিলেন। পরে ওষুধের
গায়ে ‘ফিজিশিয়নি স্যাম্পল’ লেখা দেখতে পান। মহিউদ্দিন
বলেন, “আমি আগে ফিজিশিয়ান স্যাম্পল সম্পর্কে বুঝতাম
না। এখন জানি, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল হলো এমন ওষুধ, যা
বিক্রি করা নিষিদ্ধ।”
যশোরের নূরপুর এলাকার রবিউল ইসলাম নামে এক ওষুধ ক্রেতার
সঙ্গে কথা হয় বঙ্গবাজারের সামনে। তাঁর কেনা ওষুধ দেখতে
চাইলে প্রথমে তিনি কিছুটা দ্বিধা প্রকাশ করেন।
সংবাদকর্মী পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ওষুধগুলো দেখান।
রবিউল জানান, তিনি তাঁর সন্তানের জন্য হানিবাস, জিথ্রক্স ও
এইচ সিরাপ কিনেছেন। ওষুধগুলোর মধ্যে একটির গায়ে কোনো
মূল্য লেখা ছিল না এবং অন্য দুটিতে ফিজিশিয়ান স্যাম্পলের
চিহ্ন ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবিউল প্রথমে কিছুটা
ক্ষুব্ধ হন। পরে তাঁকে জানানো হয়, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল লেখা
থাকলেই ওষুধটি ভেজাল প্রমাণিত হয় না; তবে এ ধরনের ওষুধ
বিক্রির জন্য নয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দোকানির কাছে
জানতে চান, কেন তাঁকে স্যাম্পল ওষুধ বিক্রি করা হয়েছে। পরে
দোকানি ওষুধগুলো ফেরত নিয়ে নতুন ওষুধ দিতে বাধ্য হন বলে
রবিউল জানান।
বঙ্গবাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি দাবি করেন,
বাজারের প্রায় প্রতিটি দোকানেই ফিজিশিয়ান স্যাম্পল
পাওয়া যেতে পারে। কেন এসব ওষুধ দোকানে রাখেন এমন
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের সহকারী ও
কোম্পানির এমপিওরা তাঁদের কাছে কম দামে ওষুধ দিয়ে যান।
তাঁর দাবি, এসব ওষুধ বিক্রির পর টাকা পরিশোধ করার কথাও বলা
হয়।
ওই দোকানি আরও বলেন,গ্রামাঞ্চলের কিছু গ্রাম্য চিকিৎসক
কম দামে ওষুধ কিনতে এসব স্যাম্পল খোঁজেন। কম দামে
কিনতে পারলে তাঁদের লাভ বেশি হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর অভিযোগ, শুধু বঙ্গবাজার নয়, বিসিডিএস মার্কেট
এবং সদর হাসপাতালের সামনের এলাকাতেও স্যাম্পল ওষুধের
পাশাপাশি নিম্নমানের ওষুধের ডিপো রয়েছে।
যশোর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুলতানা
রিফাত ফেরদৌস বলেন, “আমরা যশোরের বঙ্গবাজারে অভিযান
পরিচালনা করে তিনটি দোকানে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা
করেছি। এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকেরা সচেতন হলে এ সমস্যা
অনেকাংশে দূর করা সম্ভব। ফার্মেসি মালিকেরা চিকিৎসকদের
নাম প্রকাশ না করলেও তাঁদের দাবি, চিকিৎসকদের সহকারীরা
দোকানে এসে এসব স্যাম্পল দিয়ে. যান। তিনি বলেন
বাংলাদেশের ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ৪০(গ) ধারা
অনুযায়ী, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিক্রি করা যায় না; বিক্রির
উদ্দেশ্যে মজুত বা প্রদর্শনও নিষিদ্ধ। ফলে চিকিৎসকদের জন্য
বিনামূল্যে সরবরাহ করা স্যাম্পল ওষুধ ফার্মেসিতে বিক্রির
উদ্দেশ্যে রাখা হলে তা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়। তিনি বলেন
দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরবরাহ করা ওষুধ যদি
বাণিজ্যিক লেনদেনে চলে আসে, তবে একদিকে রোগীরা
তাঁদের প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে আইন
লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি হয়। তাই শুধু ফার্মেসিতে অভিযান ও
জরিমানা নয়, কোম্পানি থেকে শুরু করে এমপিও, চিকিৎসক,
তাঁদের সহকারী এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো
সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

