নিরাকার থেকে সাকার, আদ্যাশক্তির মহিমায় সৃষ্টির স্পন্দন। দেবীই আদি, দেবীই অনন্ত। তাঁর ইচ্ছাতেই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। তাঁরই শক্তিতে প্রাণের সঞ্চার, তাঁরই মহিমায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণা ও প্রতিটি প্রাণে জাগে অস্তিত্বের স্পন্দন।
দেবীমাহাত্ম্য ও শ্রীশ্রীচণ্ডীর ভাবধারায় তিন চরিত্রে অসুরবধের পৌরাণিক আখ্যান, দেবীশক্তির মহিমা এবং সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশ তুলে ধরা হয়েছে ‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ শীর্ষক নৃত্যনাট্যে। এই উপস্থাপনার মূল বার্তা, দেবীশক্তি বিরাজমান প্রতিটি প্রাণে, প্রতিটি কণায়, প্রতিটি হৃদয়ের স্পন্দনে।

সোমবার রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে মহালয়া উপলক্ষে ‘দেবী আবাহন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদ। আয়োজিত অনুষ্ঠানের শুরুতে হাওয়াইয়ান গিটারের সুরের মূর্ছনায় মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আগমনী ডান্স প্রোডাকশন হাউসের বিশেষ নৃত্যপ্রযোজনা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মঞ্চে পরিবেশনা শুরু করেন নৃত্যশিল্পীরা। এই বৃহৎ প্রযোজনায় অংশ নেন ৭৫ জনেরও বেশি শিল্পী। তাঁদের পাশাপাশি নেপথ্যে কাজ করেন একাধিক কলাকুশলী। শিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রমে বাস্তবায়িত হয় এই আয়োজন।

তাছাড়া, মধ্যরাতে সংগীতের মোহনীয় সুরে মঞ্চ মাতিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন কোক স্টুডিও বাংলার জনপ্রিয় ‘পাতার বাঁশরি’ গানের শিল্পী ঈশান মজুমদার। একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তিনি মুগ্ধ করেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের।
‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ প্রযোজনার প্রধান কোরিওগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রাপ্ত প্রীতম। তাঁর সঙ্গে সহ-কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন অভিজিৎ কুণ্ডু কর্মকার ও দেবযানী রায়। এ ছাড়া প্রযোজনাটিতে বিশিষ্ট থিয়েটারশিল্পী জ্যোতি সিনহার অংশগ্রহণও বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে।

প্রযোজনাটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভদ্রকালীর শক্তিরূপে দেবযানী রায়ের উপস্থিতি। তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠেছে আদিশক্তির জাগরণী রূপ, যাঁর শক্তিতে প্রাণ ও জগৎ উদ্ভাসিত হয়। অন্যদিকে, মহাকালের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে শক্তির পুরুষতাত্ত্বিক প্রতিরূপ মঞ্চে তুলে ধরেছেন প্রাপ্ত প্রীতম। অভিজিৎ কুণ্ডু কর্মকার মহিষাসুরের চরিত্রে এবং জ্যোতি সিনহা মহিষাসুরমর্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করে দেবীশক্তির উগ্র, দুর্জয় ও বিজয়ী রূপকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ নৃত্যনাট্যটির শেষাংশে দেবী দুর্গার সঙ্গে অসুরের যুদ্ধ এবং অসুর বধের দৃশ্যের মধ্য দিয়ে প্রযোজনার সমাপ্তি ঘটে। দেবীর শক্তি, সাহস ও অশুভ শক্তির বিনাশের চিরন্তন বার্তা নৃত্য, অভিনয় ও সংগীতের সমন্বয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়। দেবী দুর্গার অসুর বধের মধ্য দিয়ে সত্যের জয় এবং অশুভ শক্তির পরাজয়ের প্রতীকী চিত্র ফুটে ওঠে, যা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মনে গভীর আবেগ ও মুগ্ধতার সৃষ্টি করে।

‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ প্রযোজনার প্রধান কোরিওগ্রাফার প্রাপ্ত প্রীতম বলেন, “চণ্ডী ও কালিকাপুরাণের বিষয়বস্তুকে কীভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করা যায় এবং মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা যায়, সেটিই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। দেবীশক্তির অনন্য মহিমা ও শক্তির স্বরূপকে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে এর গভীর তাৎপর্য পৌঁছে দিতে চেয়েছি।”
নীলাদ্রি এন্দ শ্বেতা বলেন, “কৃষ্ণের পারফরম্যান্স সত্যিই অসাধারণ লেগেছে! ওর নাচ, অভিনয়, অভিব্যক্তি ও উপস্থাপনা ছিল মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। আর আগমনী ডান্স প্রোডাকশন হাউস মানেই তো নতুনত্বের ছোঁয়া, ব্যতিক্রমী কিছু উপহার দেওয়ার প্রত্যাশা। পুরো আয়োজনটিও ছিল দারুণ সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও গোছানো। প্রতিটি মুহূর্তে ছিল মুগ্ধতার ছোঁয়া, যা অনুষ্ঠানটিকে আরও বিশেষ ও স্মরণীয় করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, এটি ছিল সত্যিই এক অসাধারণ ও হৃদয়ছোঁয়া অভিজ্ঞতা!”
অনুষ্ঠানে আসা সুচিত্রা দেব বলেন, “মঞ্চায়িত ‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ নৃত্যনাট্যটি সত্যিই অসাধারণ একটি পরিবেশনা। নৃত্য, সংগীত ও অভিনয়ের মাধ্যমে দেবীশক্তির মহিমা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা মুগ্ধ করেছে। প্রতিটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দেবীর শক্তি, সৃষ্টির রহস্য এবং নারীর মহিমা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। সবকিছু মিলিয়ে দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদের চমৎকার আয়োজন ছিল।”
বাবলু রায় বলেন, “নৃত্যনাট্যটি দেখে মনে হয়েছে, দেবীশক্তি শুধু মন্দিরের প্রতিমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণের মধ্যেই তাঁর অবস্থান। শিল্পীদের পরিবেশনা, পোশাক, সংগীত ও মঞ্চসজ্জা সব মিলিয়ে এটি ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।”
মঞ্জুশ্রী জয়া বলেন, “এ ধরনের আয়োজন আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ শুধু একটি নৃত্যনাট্য নয়, এটি দেবীশক্তির আরাধনা এবং নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক অনন্য মাধ্যম। পুরো পরিবেশনাটি ছিল আবেগ, ভক্তি ও শিল্পের অপূর্ব সমন্বয়। নৃত্য ও সংগীতের মধ্য দিয়ে দেবীর বিভিন্ন রূপ ও মহিমা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা সত্যিই মুগ্ধকর এবং দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এমন ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল আয়োজনের জন্য আয়োজকেরা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।”
দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদের উপদেষ্টা এস কে দাশ সুমন বলেন, “মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রীমঙ্গল দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদ বেশ কয়েক বছর ধরে আনন্দঘন পরিবেশে মহালয়া উদযাপন করে আসছে। এ বছরও অসংখ্য ভক্তের উপস্থিতিতে দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে এ আয়োজন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভক্তি ও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।”
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু আশ্রম ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বন্ধু প্রীতম ব্রহ্মচারী, শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক মো. সরফরাজ আহমেদ সরফু, দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদের উপদেষ্টা এস কে দাশ সুমন, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রেমসাগর হাজরা, সাতগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিলন শীল, সুপর্ণা দেবনাথ, অঙ্কিতা আচার্য্য ও ডা. পুস্পিতা খাস্তগীরসহ অনেকে। এ সময় সংগঠনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
ইএন/এসএ
