Published on
:
3 min read
এই সময়, নয়াদিল্লি: গত সপ্তাহে দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) মিছিল ঘিরে যাতে ট্রেন–মেট্রো সব বন্ধ করে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত না–করা হয়, সে ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তারপরেও অনেকগুলি মেট্রো স্টেশন, যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রেখে এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যারিকেড বানিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তোলা হয়েছিল বলে মামলা দায়ের হয় শীর্ষ আদালতে। বৃহস্পতিবার সেই মামলায় ‘নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা’ করে ওই দিন প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র সচিব। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়ে সরকারের পদক্ষেপের জন্য জনগণের অসুবিধের প্রসঙ্গে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন৷ যদিও আদালতের নির্দেশ ইচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করা হয়নি বলেও হলফনামায় দাবি করেছেন তিনি। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে আইন মেনে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার অনুমতি চেয়ে তিনি আদালতের আগের নির্দেশ সংশোধনের আর্জিও জানিয়েছেন।
এর মধ্যেই আবার যন্তর মন্তরকে ধর্না–প্রতিবাদ আন্দোলনের বাইরে রাখার জন্য কেন্দ্রের নির্দেশিকায় বদল চেয়েও একটি মামলা দায়ের হয়েছে শীর্ষ আদালতে। এই মামলায় নোটিস জারি করে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট৷
বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানিতে বর্ষীয়ান আইনজীবী গোপাল সুব্রহ্মণ্যম বলেন, ‘যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদের স্থল হিসেবে ফের বৈধতা দেওয়া হোক। যন্তর মন্তরকে ডিনোটিফাই করার যুক্তি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আছে বলে কেন্দ্র দাবি করছে।’ কেন্দ্রের তরফে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা জানান, যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থল হিসেবে সরানোর সিদ্ধান্ত এই সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশেই হয়েছে। তখন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘কোন যুক্তিতে এবং কোন কোন দিক খতিয়ে দেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা আমরা দেখব। প্রতিবাদীরা চাইছেন, যে এস্টাবলিশমেন্ট থেকে দেশ পরিচালনা করা হয়, তার কাছে ধর্না–প্রতিবাদের অনুমতি দেওয়া হোক৷ এর প্রেক্ষিতে সরকারের বক্তব্য জানা প্রয়োজন৷’ তাঁর সুরেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘আমরা কেন্দ্র, দিল্লি পুলিশকে নোটিস ইস্যু করছি। তাদের জবাব দিতে দিন। যদি তাদের জবাব সন্তোষজনক না–হয়, তা হলে আইন আইনের পথে চলবে।’সিজেপির ‘যন্তর মন্তর চলো’ ঘিরে গত সপ্তাহে যে সব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গে এ দিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব ব্যাখ্যা দেয়— আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য অশান্তি এড়াতেই এই সব পদক্ষেপ করা হয়েছিল। ৯ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে পরের দিন রাত ১০টা পর্যন্ত রাইসিনা হিলসের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ওয়াইফাই ও ব্রডব্যান্ড পরিষেবা চালু ছিল বলে দাবি কেন্দ্রের।
সিজেআইয়ের বেঞ্চের সামনে মেহতা বলেন, ‘সারা দেশের সংবাদমাধ্যম যে ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনার (১০ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে) বিষয়টি নিয়ে হইচই করছে, তা একেবারেই ঠিক নয়৷ শীর্ষ আদালতের প্রচলিত আইনি পরিভাষা অনুযায়ীই হলফনামায় এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে৷’ তাতে আদালত জানায়, সংবাদমাধ্যমে কী প্রকাশিত হচ্ছে, সেই বিষয় নিয়ে তাঁরা মামলার বিচার করেন না৷ হলফনামায় উল্লিখিত বিষয়টিই একমাত্র প্রাসঙ্গিক৷ যন্তর মন্তর চত্বরের আশপাশে বিএনএসের ১৬৩ ধারা জারি নিয়ে সরকারের কী নির্দেশ ছিল, সে বিষয়ে বিশদে হলফনামায় জানানোর জন্য সলিসিটর জেনারেলকে নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এই সূত্রেই আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীর অভিযোগ, কত জনকে আটক করা হয়েছে সেই সংখ্যা জানানো হয়নি দিল্লি পুলিশের তরফে। এই বিষয়টিও হলফনামায় উল্লেখ করতে বলে শীর্ষ আদালত৷
যন্তর মন্তরে সিজেপির অভিযানের দিন আটক হওয়া আন্দোলনকারীদের ‘ভালো মানের, গরম এবং টাটকা খাবার’ দেওয়া হয়েছিল বলে আদালতে হলফনামায় দাবি করেছেন দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার। একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্রের দাবি, হলফনামায় অনুরাগ আরও জানিয়েছেন, যাঁদের সে দিন আটক করা হয়েছিল, তাঁদের পুলিশের লকআপেও রাখা হয়নি। রাখা হয়েছিল অস্থায়ী ডিটেনশন সেন্টারে, সেটাও মাত্র ২-৬ ঘণ্টার জন্য।
এ দিনের সুপ্রিম শুনানি চলাকালীন এক মামলাকারীর তরফে আইনজীবী বলেন, ‘প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে৷ অথচ এটা ভাবা হচ্ছে না যে, প্রতিবাদের অধিকারের পাশাপাশি বেঁচে থাকারও অধিকার আছে নাগরিকদের৷ রাইট টু লাইফ কী ভাবে সুরক্ষিত হবে— সেটা আগে ভাবা দরকার৷ ওই আইনজীবীর যুক্তি, ‘রাজনৈতিক দলের নেতারা বড় হোটেলে লাঞ্চ করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন৷ ও দিকে তাঁদের প্রতিবাদের জেরে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠছে। আমরা শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ চাইছি৷’ তখন মেহতা বলেন, ‘প্রতিবাদীরা রিকশা চালক, অটোচালক, ট্যাক্সিচালক এবং সাধারণ শ্রমজীবীদের কথা ভাবছেন না৷’
