কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে আছে ৫০ ফুট উচ্চতার এক দানব। তার হাতে উপড়ে ফেলা নারকেল গাছ, শরীরজুড়ে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসেছে কোনো ভয়ংকর প্রাণী। কাছে গেলে অবশ্য স্পষ্ট হয়, এটি কোনো কল্পকাহিনীর দানব না বরং মানুষের অসচেতনতা, ভোগবাদী আচরণ ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের একটি প্রতীক।
সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ভাস্কর্য। কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন সৈকত থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা টানা ২০ দিনের শ্রমে নির্মাণ করেছেন এটি। কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা ও সিগাল পয়েন্টের মাঝামাঝি বালিয়াড়িতে স্থাপন করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্ম। ভাস্কর্যটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
তবে এটি নিছক পর্যটকদের আকর্ষণ করার কোনো শিল্পকর্ম নয়। মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কীভাবে প্রকৃতি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে, সেই বিপদের বার্তাই তুলে ধরছে প্লাস্টিকের এই দানব। এর হাতে উপড়ে ফেলা নারকেল গাছের প্রতীকী দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে ধ্বংস করার দায় শেষ পর্যন্ত মানুষেরই।
পর্যটনের সৌন্দর্যের আড়ালে প্লাস্টিকের বিপদ
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন লাখো পর্যটক। কিন্তু পর্যটকদের একাংশের অসচেতন আচরণে সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবন, নালার মুখ ও উপকূলীয় পরিবেশে জমছে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য নানা সামগ্রী।
এসব বর্জ্য শুধু সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করে না। দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। প্লাস্টিক সহজে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। সূর্যের আলো, ঢেউ ও ঘর্ষণে বড় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক বালু, পানি ও সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করে।
সমুদ্রের মাছ ও অন্যান্য প্রাণী খাবার ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলতে পারে। আবার পরিত্যক্ত জাল ও প্লাস্টিকের দড়িতে আটকে আহত হতে পারে সামুদ্রিক প্রাণী। এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্লাস্টিক বর্জ্য নালা ও পানিপ্রবাহের পথ আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটকদের দায় উপলব্ধি
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক শাহরিয়ার শান্ত বলেন, ‘পরিবেশের জন্য প্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর, এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়েছে। এটি দেখে মানুষ যেন দূষণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে এবং সচেতন হয়। বিশেষ করে এত দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত যেন আমরা নিজেরাই ময়লা করে না ফেলি। কোথাও বর্জ্য ফেলার আগে মানুষ যদি এই ভাস্কর্যটি দেখে সচেতন হয়, তাহলেই এ উদ্যোগ সার্থক হবে।'
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক মহিউদ্দিন জুয়েল বলেন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগও জরুরি। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু সরকারের উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এজন্য সরকার ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
পাঁচ টন বর্জ্যে পরিবেশ ধ্বংসের প্রতীক
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক মুহাম্মদ মুবারক বলেন, ৫০ ফুট উচ্চতার এই প্লাস্টিক দানব তৈরিতে পাঁচ মেট্রিক টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণ কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গাছ উপড়ে ফেলার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি, এই দূষণ কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও অক্সিজেনের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে নীরবে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তা অনেক সময় আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য বিপর্যয়কেই দৃশ্যমান করার চেষ্টা করা হয়েছে এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে।
