জীবনের কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কিন্তু থেকে যায় অভিমান, কষ্ট আর অসংখ্য স্মৃতি। কেউ বিশ্বাস ভেঙেছে, কেউ কথা দিয়ে কথা রাখেনি, আবার কেউ মাঝপথে ছেড়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে জীবন এগিয়ে গেলেও মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ অনেক সময় সহজে দূর হয় না। কিন্তু যে মানুষটি একসময় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, তার ভুল কি ক্ষমা করে দেওয়া যায় না? ইসলাম এ বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়?
ইসলাম মানুষকে ক্ষমা, ধৈর্য ও উদারতার শিক্ষা দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে কেউ কষ্ট দিলে তার প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে ক্ষমাশীল হওয়াকে উৎসাহিত করে ইসলাম। তবে ক্ষমা করা মানে অন্যায়ের সমর্থন করা নয়, কিংবা পুরোনো সম্পর্কে ফিরে যেতেই হবে, এমনও নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যকে ক্ষমা করা একজন মুমিনের মহৎ গুণ। কেউ কষ্ট দিলে তার প্রতি ঘৃণা পুষে না রেখে নিজের আচরণ সুন্দর রাখার শিক্ষা দেয় ইসলাম।
শুধু তাই নয়, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি কামনা করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত ২২)।
অর্থাৎ, অন্যকে ক্ষমা করার মধ্যেও রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা লাভের প্রত্যাশা। তবে ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, অন্যায়কে অন্যায় মনে করা যাবে না। কেউ প্রতারণা করলে, মানসিকভাবে আঘাত দিলে কিংবা বিশ্বাস ভাঙলে তার কাছ থেকে দূরে থাকার অধিকারও মানুষের রয়েছে।
প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে অনেকেই পুরোনো স্মৃতি, অপমান কিংবা প্রতারণার কথা মনে করে কষ্ট পান। কেউ কেউ প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তায় ডুবে থাকেন। কিন্তু অতীতের ক্ষোভ আঁকড়ে ধরে রাখলে নিজের বর্তমান জীবনও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে।এ ক্ষেত্রে ক্ষমা হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি মানসিক পদক্ষেপ। কাউকে ক্ষমা করা মানে তার কাছে ফিরে যাওয়া নয়; বরং তার প্রতি জমে থাকা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্তও হতে পারে।
ইসলামে মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্ষমা করার নামে নির্যাতন, প্রতারণা কিংবা ক্ষতিকর সম্পর্ক সহ্য করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও সুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সীমারেখা বজায় রাখা যায়।
তাই জীবনে কেউ কষ্ট দিয়ে থাকলে একবার ভেবে দেখুন, সেই কষ্টের ভার কি আজও নিজের হৃদয়ে বয়ে বেড়াবেন, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ক্ষমাশীল হওয়ার চেষ্টা করবেন? কারণ ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি নিজের রাগকে জয় করার শক্তি।
সম্পর্ক ফিরে আসুক বা না আসুক, অতীত বদলাক বা না বদলাক, মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কমিয়ে নিজের জীবনকে সুন্দর করার চেষ্টা করা যায়। আর অন্যকে ক্ষমা করার এই মহৎ গুণ অর্জন করতে পারলে তা হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভেরও একটি পথ।
