কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না আলবার্টার অধিকাংশ মানুষ। সোমবার, ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রাথমিক ফলাফলে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। স্বাধীনতাসংক্রান্ত প্রশ্নে ৭৬ শতাংশের বেশি ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার লক্ষ্যে আরেকটি গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট পড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। একই গণভোটে অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তাসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোতেও ‘হ্যাঁ’ ভোট এগিয়ে রয়েছে।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির সরকার আয়োজিত এই গণভোটে মোট ১০টি প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা ও ভোটাধিকার নিয়ে। অন্য চারটিতে ছিল বিচারক নিয়োগ, কানাডার সিনেট বিলুপ্তি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় প্রদেশের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব। দশম প্রশ্নটি ছিল আলবার্টার স্বাধীনতার পথে এগোনোর সম্ভাবনা নিয়ে। ভোটগণনার শুরুতে স্বাধীনতাসংক্রান্ত প্রশ্নটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, স্বাধীনতাসংক্রান্ত প্রশ্নে ১৫ লাখের বেশি ভোট গণনার পর কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে পড়েছে ১১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১টি ভোট। অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতার লক্ষ্যে আরেকটি গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৩১টি। অর্থাৎ গণনা হওয়া ভোটের প্রায় ৭৬ শতাংশ কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে।
কানাডার অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রদেশ আলবার্টা। দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশটির একাংশ অভিযোগ করে আসছে, এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও প্রদেশটির স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পায় না। বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অটোয়ার সঙ্গে বিরোধ থেকেই স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়েছে। অন্যদিকে কানাডা থেকে আলাদা হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নাগরিকত্ব, সীমান্ত এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গণভোটের আগে আলবার্টা সফর করে কানাডার ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথও নিজে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ফল প্রকাশের পর তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, আলবার্টার মানুষ ঐক্যবদ্ধ কানাডার মধ্যে আরও শক্তিশালী আলবার্টা দেখতে চান। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। স্বাধীনতাপন্থী সংগঠন আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্টের নেতারা ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছেন। এমনকি আলবার্টা স্বাধীন হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তার বিষয়ে বৈঠক করেছেন। তবে কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোয়েকস্ট্রা আন্দোলনটির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি সম্পৃক্ততার দাবি অস্বীকার করেছেন। মার্কিন সরকারের অর্থায়ন বা সরাসরি হস্তক্ষেপেরও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আলবার্টার গণভোটে স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় ব্যবধানে সমর্থন হারালেও অভিবাসনসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর প্রাথমিক ফলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নে সর্বশেষ পাওয়া প্রাথমিক গণনায় ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৮৭৫টি এবং ‘না’ ভোট ৩ লাখ ২০ হাজার ৬৯৪টি। অর্থাৎ গণনা হওয়া ভোটের প্রায় ৫৮ শতাংশ প্রদেশের হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার পক্ষে।
প্রাদেশিক সরকার চায়, আলবার্টায় কতজন অভিবাসী আসবেন, কোন পেশার মানুষ অগ্রাধিকার পাবেন এবং নতুন কর্মসংস্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা কী ধরনের সুবিধা পাবেন, এসব বিষয়ে আরও বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। বিশেষ করে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী গ্রহণ এবং অভিবাসীর সংখ্যা সরকারি সেবা প্রদানের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ড্যানিয়েল স্মিথ।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই আলবার্টার জনসংখ্যা ছিল ৫১ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন বিদেশি কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির অস্থায়ী বাসিন্দা। প্রিমিয়ার স্মিথের অভিযোগ, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হাসপাতাল, বিদ্যালয়, আবাসন ও সামাজিক সেবার ওপর চাপ বেড়েছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, সরকারি সেবার সংকটের জন্য শুধু অভিবাসীদের দায়ী করা যায় না। অভিবাসীরা কর দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমিকসংকট দূর করতেও ভূমিকা রাখছেন।
গণভোটের দ্বিতীয় প্রশ্নে প্রস্তাব করা হয়েছে, কানাডীয় নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা এবং আলবার্টা সরকারের অনুমোদিত অভিবাসন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই প্রাদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন। সর্বশেষ প্রাথমিক গণনায় এই প্রস্তাবের পক্ষে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৭৩টি এবং বিপক্ষে ২ লাখ ৯০ হাজার ৭৬৫টি ভোট পড়েছে। তবে অস্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে কারা আলবার্টার অনুমোদিত অভিবাসন মর্যাদা পাবেন, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, অস্থায়ী বিদেশি কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং তাঁদের পরিবারের সরকারি চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবা গ্রহণের বিপরীতে ফি বা প্রিমিয়াম আরোপ। সর্বশেষ প্রাথমিক গণনায় এই প্রস্তাবের পক্ষে ২ লাখ ৫২ হাজার ৬০০টি এবং বিপক্ষে ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৯টি ভোট পড়েছে। প্রিমিয়ার স্মিথ এর আগে স্বাস্থ্যসেবার জন্য বছরে জনপ্রতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ কানাডীয় ডলার নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তবে কত টাকা দিতে হবে কিংবা কোন শ্রেণির অস্থায়ী বাসিন্দাদের ওপর তা প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ ছাড়া অস্থায়ী অভিবাসন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাদেশিক সামাজিক সহায়তা পাওয়ার আগে অন্তত ১২ মাস আলবার্টায় বসবাসের শর্ত আরোপের প্রস্তাবেও ‘হ্যাঁ’ ভোট এগিয়ে রয়েছে। সর্বশেষ প্রাথমিক গণনায় এই প্রস্তাবের পক্ষে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৪২৮টি এবং বিপক্ষে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৪৫৩টি ভোট পড়েছে। তবে এই ১২ মাসের অপেক্ষার শর্তটি সব চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবার জন্য নয়, সামাজিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
গণভোটের অন্য পাঁচটি প্রশ্নে ছিল প্রাদেশিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগে কানাডীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা বাড়ানো, কানাডার সিনেট বিলুপ্ত করা, নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেও সংশ্লিষ্ট অর্থ বরাদ্দ পাওয়া এবং প্রাদেশিক এখতিয়ারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় আইনের তুলনায় প্রাদেশিক আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব। সর্বশেষ প্রাথমিক গণনায় নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা, বিচারক নিয়োগে প্রাদেশিক ক্ষমতা বাড়ানো, সিনেট বিলুপ্তি এবং প্রাদেশিক আইনের অগ্রাধিকারের প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেও অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার প্রস্তাবে ‘না’ ভোট সামান্য এগিয়ে রয়েছে।
তবে এসব ফলাফল এখনো চূড়ান্ত নয়। বিভিন্ন প্রশ্নের ভোটগণনা একই গতিতে এগোয়নি। ফলে এক প্রশ্নে কয়েক লাখ ভোট গণনার ফলের সঙ্গে অন্য প্রশ্নে কয়েক হাজার ভোটের ফল সরাসরি তুলনা করা যাবে না। আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ২৯ অক্টোবর। গণভোটের ফল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। কোনো প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেও তা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। কয়েকটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা ও সংবিধান সংশোধনেরও প্রয়োজন হতে পারে।
গণভোটের ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অস্থায়ী বিদেশি কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী অনেক বিদেশি কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আলবার্টার সরকারি স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পান। তাঁদের সন্তানরাও প্রচলিত নিয়মে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। নতুন প্রস্তাবগুলো আইন হলে এসব সুবিধার শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অস্থায়ী অভিবাসীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
১৯ অক্টোবরের গণভোটে আলবার্টার ভোটাররা কানাডা থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাব বড় ব্যবধানে প্রত্যাখ্যান করলেও অন্য কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তনের পক্ষে সমর্থন দেখা যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ড্যানিয়েল স্মিথের সরকার কোন প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় এবং সেসব উদ্যোগে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার কী অবস্থান গ্রহণ করে। আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার, আলবার্টার অধিকাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু প্রদেশের অভিবাসননীতি, সরকারি সেবা ও ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: Elections Alberta, CityNews, Reuters, Associated Press
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::কানাডা থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান আলবার্টার ভোটারদের first appeared on DesheBideshe.