ভারতের ওড়িশা রাজ্যে আদানি গোষ্ঠীর একটি বক্সাইট খনি প্রকল্পের জন্য আদিবাসীদের জমি ব্যবহারের সম্মতি নিতে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শত শত আদিবাসীর স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ জাল করে জমি ও বনভূমি ব্যবহারের অনুমতিপত্র তৈরি করা হয়েছে। এমনকি মৃত ব্যক্তি ও দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী মানুষের আঙুলের ছাপও এসব নথিতে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী গৌতম আদানির মালিকানাধীন কলিঙ্গ অ্যালুমিনা লিমিটেড প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এই খনি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, আদিবাসীদের বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রামসভার অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্যের লিখিত সম্মতি প্রয়োজন।
প্রকল্পের পক্ষে তৈরি নথিতে গ্রামের প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দার সম্মতি দেখানো হলেও স্থানীয় আদিবাসীদের দাবি, অধিকাংশ স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ জাল। আদানির প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে, গত বছরের ৯ অক্টোবর বালদা ও বান্নুরে আয়োজিত গ্রাম পরিষদ সভাগুলোর সময় প্রায় ৬০০ জন আদিবাসীর স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সভায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই জানিয়েছেন যে, তারা এই খনি প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিলেন।
‘তারা আমার কাছ থেকে কাগজটি নিয়ে নিল’
বান্নুরের এক কৃষক মাধব কুন্তিলি বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল, খনির অনুমতি দেওয়া হলে গ্রামে রাস্তাঘাট তৈরি হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, পয়ঃনিষ্কাশন ও পানির সংযোগ আসবে এবং একটি স্কুল নির্মাণ করা হবে।”
কোরাপুট ভারতের অন্যতম অনুন্নত জেলা, তাই এ ধরনের প্রতিশ্রুতি প্রায়শই মানুষের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। কুন্তিলি জানান, সেখানে একটি নথিপত্র সবার কাছে ঘোরানো হচ্ছিল এবং তাতে স্বাক্ষর চাওয়া হচ্ছিল।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “আমি বললাম, যদি বনভূমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে আমি এতে স্বাক্ষর করব না। তখন তারা আমার কাছ থেকে কাগজটি নিয়ে নিল।”
বালদা ও বান্নুর এলাকায় আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অনেক গ্রামবাসী জানিয়েছেন যে, কোনো এক প্রস্তাবনায় নিজেদের স্বাক্ষর বা আঙুলের ছাপ দেখে তারা হতবাক হয়ে গেছেন।
রামা হানতাল তার মরিচা ধরা টিন ও কাঠের তৈরি কুঁড়েঘরের দরজার পাশে নিশ্চল হয়ে বসেছিলেন। ৬০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বেশ কয়েক বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন।

তার পুত্রবধূ চন্দ্রমা হানতাল বলেন, “তার পক্ষে সভায় উপস্থিত হওয়া বা স্বাক্ষর করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।”
যদিও সম্মতিপত্রে ওড়িশার সরকারি ভাষা—ওড়িয়া ভাষায় হানতালের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দেখানো হয়েছে, কিন্তু চন্দ্রমা সেখানে তার (রামা হানতালের) আঙুলের ছাপ দেখতে পান। তিনি নিজেও ওই সভায় উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় ‘গুরুবারি খারাস’ নামে তিনজন ব্যক্তির নাম রয়েছে—যাদের আঙুলের ছাপ খনি প্রকল্পের সমর্থনে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বালদা গ্রামের বাসিন্দারা কেবল দুজন ‘গুরুবারি’-কে খুঁজে পেয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ৩ কিলোমিটার দূরে থাকেন, যিনি সভায় উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। অন্যজন একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন, কিন্তু গ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই তিনি মারা গেছেন।

তার ছেলে সহদেব প্রশ্ন করেন, “আমার মা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা গেছেন। আট মাস পর তারা কীভাবে তার উপস্থিতি ও স্বাক্ষর জাল করল?” স্বাভাবিক কারণে মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৭৫ বছর।
প্রথম ‘গুরুবারি’-এর পরিবারের আরও দুজন ব্যক্তির নাম স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় রয়েছে। তাদের একজন হলেন তার স্বামী, যিনি শয্যাশায়ী; গ্রাম পরিষদের সভার তিন মাস আগে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অন্যজন হলেন তার ভাতিজা। তারা দুজনেই ৯ অক্টোবরের সভায় উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
তৃতীয় ‘গুরুবারি’-এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আলজাজিরা ২০ জনেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং বালদা ও বান্নুর গ্রামের নথিপত্র যাচাই করেছে। তবে প্রস্তাবনায় স্বাক্ষরকারী হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্তত ৬৭ জনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
বান্নুর গ্রামে অন্তত তিনজন মৃত ব্যক্তির আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়েছে। নথিপত্রে সম্মতি প্রদানকারী হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের স্বজনরা মারা গেছেন।
বান্নুরের প্রস্তাবনায় ১০৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা সানাই আলাং-এর ৩৫ বছর বয়সী ছেলে নকুল আলাং বলেন, “আমার মা চার বছর আগেই মারা গেছেন।” নকুলের স্বাক্ষরটি ওড়িয়া ভাষায় দেওয়া হয়েছে, অথচ তিনি বলছেন যে সেই সময়ে তিনি বিশাখাপত্তনমে একটি নির্মাণাধীন জায়গায় কাজ করছিলেন। বিশাখাপত্তনম হলো ওড়িশার প্রতিবেশী রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশের একটি উপকূলীয় শহর, যা কোরাপুট থেকে ১৭০ কিলোমিটার (১০৫ মাইল) দূরে অবস্থিত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের নাম ও স্বাক্ষর কে দিয়েছে, তা আমি জানি না।’
বলদা গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, তার মা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা গেছেন। অথচ মৃত্যুর প্রায় আট মাস পর অনুষ্ঠিত একটি সভার নথিতে তার মায়ের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দেখানো হয়েছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি অন্য কাজের কথা বলে তাদের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। পরে সেসব কাগজ খনি প্রকল্পের সম্মতিপত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দুটি গ্রামের প্রধানও দাবি করেছেন, এ ধরনের কোনো বৈধ সভা বা স্বাক্ষর সংগ্রহের ঘটনা ঘটেনি।
অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ সম্মতি গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দ্রুত আদানি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানটিকে বনভূমি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে জমি হারানোর পাশাপাশি নিজেদের পবিত্র পাহাড় ও বনাঞ্চল ধ্বংসের আশঙ্কা করছেন আদিবাসীরা। এ নিয়ে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
আলজাজিরা এ বিষয়ে আদানি গোষ্ঠী ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের কোনো মন্তব্য পায়নি। অন্যদিকে, স্থানীয় আদিবাসীরা জানিয়েছেন, নিজেদের পূর্বপুরুষের জমি ও পবিত্র বনভূমি রক্ষায় তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
