প্রতীকী ছবি ছবি: Istock
Published on
:
3 min read
সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
রামবাবুর লক্ষ্য ছিল, খড়গপুর শহর চলবে তাঁর অঙ্গুলি হেলনে। অন্য কারও দাদাগিরি সেখানে চলবে না। কিন্তু সবাই যে তা মানবে না, সেটাই তাঁকে বলার সাহস কেউ দেখায়নি। ফলে ১৯৮৬-৮৭ থেকেই মাফিয়া গোষ্ঠীর গ্যাং ওয়ারের সাক্ষী থেকেছে এই রেলশহর।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামবাবুর হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা না করে খড়গপুরের নিউ সেটলমেন্ট, ওল্ড সেটলমেন্ট এলাকায় মুরলী নামে আর এক মাফিয়া মাথা তুলেছিল। ব্যবসায়ীদের থেকে তোলাবাজি, লোকজনকে ধমক-চমক দেওয়া থেকে মালঞ্চর এক বিস্কুট ব্যবসায়ীকে খুনের অভিযোগ ওঠে মুরলীর বিরুদ্ধে। মাফিয়ারাজ কায়েমের প্রধান শর্তই হলো, সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে রাখা। না হলে সাধারণ মানুষকে যে বশে আনা যাবে না! তবে রামবাবু থাকতে মুরলীর আতঙ্ক! এমন হলো তো সাম্রাজ্য টেকানো যাবে না। অতঃপর শুরু গ্যাং ওয়ার। অভিযোগ, সেই লড়াইয়েই জীবন যায় মুরলীর। এরপরে কিছুদিন সব চুপচাপ ছিল।
রামবাবুর বিরুদ্ধে আর দাঁড়ানোর সাহস দেখা যায়নি রেলশহরে। কিন্তু সেই স্বস্তি আর কতদিন! নয়ের দশকে রেলের এক ঠিকাদার উদয় মাইতি বেঁকে বসলেন। বস্তুত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ঢুকে পড়লেন রামবাবুর রেলের ঠিকাদারির একচ্ছত্র সাম্রাজ্যে। রেলশহরের প্রবীণ বাসিন্দাদের কাছে জানা যায়, উদয় ঠিকাদার হিসেবে কখনও খুব কেউকেটা ছিলেন না। তবে তাঁর একটা জেদ ছিল, ছিল সাহসও।
তা ছাড়া রামবাবুর বিরুদ্ধে তাঁকে রুখে দাঁড়াতে দেখে পিছন থেকে কয়েকজন ঠিকাদার তাঁকে মদতও দিয়েছিলেন। যুক্তি ছিল, টাকা ঠিকাদারের। কাজ করবেন ঠিকাদার। তা হলে রামবাবুর কথামতো চলতে হবে কেন? তবে এর মাসুলও দিতে হয় উদয়কে। এক সকালে বোগদা থেকে ডেভেলপমেন্টের দিকে যাওয়ার সময় প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে খুন করা হয় তাঁকে। প্রতিবাদের এমন পরিণতিতে অন্য ঠিকাদাররা আর ঝামেলায় না জড়ানোই উচিত মনে করেছিলেন। ফলে ঠিকাদারি আর স্ক্র্যাপের ব্যবসা, দু'টো ক্ষেত্রই দখলে রেখে নিজের মতো করে চলছিলেন রামবাবু।
সেই সময়ে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ময়দানে উত্থান হয় রাজেশ গুপ্তার। ইন্দার বাসিন্দা রাজেশ তাঁর দুই সাগরেদকে নিয়ে একটি মোটরবাইকে চড়ে পুরোনো বাজার থেকে স্টেশনে যাওয়ার পথে ডাক ও তার বিভাগের প্রায় লক্ষাধিক টাকা ছিনতাই করে। পরে অবশ্য ধরাও পড়ে সে। সাজাও হয়। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে রাজেশ। তাকে দেখেছেন, খড়গপুরের এমন কয়েকজনের কাছে জানা যায়, জেল থেকে বেরোনোর পরে পার্সেল ব্রেকারের কাজে হাত পাকাতে শুরু করেছিল রাজেশ। রেলের পার্সেল ভ্যান ভেঙে তার থেকে মালপত্র ফেলে দিত রেললাইনের ধারে। তারপরে চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে নেমে সেই সমস্ত জিনিস তুলে নিয়ে বিক্রি করত সে। এতে ভালো টাকা হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে খড়গপুর শহরে তার দাদাগিরিও শুরু হয়। ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে টাকা তোলা থেকে দলবল নিয়ে দোকানে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে টাকা না দেওয়া ইত্যাদি নান দুষ্কমের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তার নাম।
এরই মধ্যে দলের কেউ কেউ ঠিকমতো কাজ না করায় রামবাবুর চোখের বালি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, দিনে দিনে কিছু এলাকায় নিজের কর্তৃত্ব বাড়াচ্ছিল রাজেশ। সূত্রের খবর, এমন সময় এক দিন দুষ্কর্ম করে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় রাজেশের খাস লোক ধনার। রাজেশের ধারণা হয়, পিছনে হাত রয়েছে রামবাবুর। তারই বদলা হিসেবে তেলমিলের কাছে রামবাবুর খাস সাগরেদ সুরিকে রাজেশ খুন করেন বলে অভিযোগ। এ দিকে গ্যাং ওয়ারে একের পর এক মৃত্যুতে শহরে আতঙ্ক বাড়ছিল। স্বাভাবিক ভাবে চাপ বাড়ছিল পুলিশের উপরেও।
রাজেশকে বাগে পেতে হন্যে হয়ে ওঠে পুলিশ। সেই সুযোগও এসে যায় একদিন। ডেভেলপমেন্ট এলাকার একটি রেল কোয়ার্টারে রাজেশ রয়েছে বলে খবর আসে পুলিশের কাছে। পুলিশ পুরো আবাসন ঘিরে ফেলে। পাছে অন্ধকারে সুযোগ নিয়ে রাজেশ পালানোর চেষ্টা করে, তাই রাতে আলোর ব্যবস্থা করে চারদিকে আলোকিত করে পুলিশ। গুলির লড়াইতে পাছে আবাসনের বাসিন্দাদের কারও ক্ষতি হয়, তাই মাইকে রাজেশের উদ্দেশে ঘোষণা করা হয়, অস্ত্র ফেলে বেরিয়ে এলে তাঁকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে। যদিও শেষ পর্যন্ত গুলির লড়াইয়ে রাজেশ, আব্বাস-সহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। (চলবে)
