ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম রয়েছে, যাদের শ্রেষ্ঠত্ব সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও অমলিন। ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে তাদেরই একজন। তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি, অসংখ্য গোল এবং মাঠে অসাধারণ নৈপুণ্যের মাধ্যমে তিনি ফুটবলকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। শুধু গোল করাই নয়, নিজের খেলার ধরন দিয়ে বদলে দিয়েছেন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের ভাবনাও।
ফুটবলের এই কালজয়ী তারকার পুরো নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। ‘ফুটবলের রাজা’ হিসেবে পরিচিত পেলের জীবন ও ক্যারিয়ারে রয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় ঘটনা। তার জন্মদিন উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক এই কিংবদন্তির ১০টি উল্লেখযোগ্য কীর্তি ও অজানা তথ্য।
১. থমাস এডিসনের নাম থেকে এডসন
পেলের পুরো নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। মার্কিন বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক থমাস এডিসনের নাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তার নাম রাখা হয়েছিল এডসন। তবে জন্মনাম ছাপিয়ে ‘পেলে’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। পরবর্তী সময়ে এই ডাকনামই হয়ে ওঠে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় নাম।
২. যে ডাকনাম একসময় পছন্দ ছিল না
বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কাছে পরিচিত ‘পেলে’ নামটি শৈশবে তার খুব একটা পছন্দ ছিল না বলে জানা যায়। সহপাঠীদের দেওয়া এই নামই একসময় তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এই ছোট্ট নামটি তাকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছে দেয়।
৩. মাত্র ১৭ বছরেই বিশ্বকাপ জয়
১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিজের প্রতিভার জানান দেন পেলে। টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে দুটি গোল করেন তিনি। তার নৈপুণ্যে ব্রাজিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে। এত অল্প বয়সে বিশ্বমঞ্চে এমন সাফল্য তাকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তারকায় পরিণত করে।
৪. তিনবার বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র ফুটবলার
পেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের অংশ হওয়া। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে এখন পর্যন্ত আর কেউ তিনবার বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। এই অনন্য রেকর্ডই পেলের কিংবদন্তি মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
৫. গোলের সংখ্যা নিয়ে আজও আলোচনা
পেলের গোলসংখ্যা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও আলোচনা রয়েছে। প্রীতি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক ম্যাচসহ তার ক্যারিয়ারে ১ হাজার ২৮৩ গোলের হিসাব বহুল প্রচলিত। তবে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তার গোলসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা যায়। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ৭৭, যা দীর্ঘদিন দেশটির সর্বোচ্চ ছিল।
৬. এক ম্যাচেই আট গোলের কীর্তি
১৯৬৪ সালে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসের হয়ে বোতাফোগোর বিপক্ষে এক ম্যাচে আটটি গোল করেছিলেন পেলে। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সান্তোস ম্যাচটি জিতেছিল ১১-০ ব্যবধানে। এক ম্যাচে এমন গোলবন্যা তার অসাধারণ ফিনিশিং দক্ষতা ও গোল করার ক্ষমতার বড় উদাহরণ হয়ে আছে।
৭. ক্যারিয়ারের হাজারতম গোল
১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ এক মুহূর্তের জন্ম দেন পেলে। মারাকানা স্টেডিয়ামে ভাস্কো দা গামার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে ক্যারিয়ারের হাজারতম গোল করেন তিনি। ঐতিহাসিক এই মুহূর্ত ঘিরে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। সমর্থকদের আবেগ ও উদযাপনে স্মরণীয় হয়ে আছে পেলের এই মাইলফলক।
৮. গারিনচার সঙ্গে দুর্দান্ত জুটি
ব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তি গারিনচার সঙ্গে পেলের বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। জাতীয় দলে তাদের একসঙ্গে খেলার সময় ব্রাজিল কখনো হারেনি—এমন একটি পরিসংখ্যান বহুল প্রচলিত। দুজনের আক্রমণাত্মক দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সমন্বয় ব্রাজিলের সোনালি সময়কে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
৯. দুই ক্লাবের জার্সিতে বিদায়
১৯৭৭ সালে পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানান পেলে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কসমস ও ব্রাজিলের সান্তোসের হয়ে খেলার পর ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে দুই দলের জার্সিই পরেছিলেন তিনি। বিদায়ী ম্যাচের প্রথমার্ধে নিউইয়র্ক কসমসের হয়ে এবং দ্বিতীয়ার্ধে সান্তোসের হয়ে মাঠে নামেন এই কিংবদন্তি। দুই ক্লাবের প্রতি তার সম্পর্ক ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্মৃতি বহন করে এই বিদায়।
১০. ফুটবলের বাইরেও রেখেছেন অবদান
পেলের পরিচয় শুধু ফুটবল মাঠে সীমাবদ্ধ ছিল না। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। খেলাধুলার উন্নয়ন এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
চিরস্মরণীয় এক ফুটবল কিংবদন্তি
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানান পেলে। কিন্তু তার মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায়নি ফুটবলের এই মহানায়কের গল্প। তিনটি বিশ্বকাপ জয়, অসাধারণ গোল করার দক্ষতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
ফুটবল বিশ্বে অনেক তারকা এসেছেন, অনেকেই রেকর্ড গড়েছেন। তবে পেলের মতো করে খেলাটির ইতিহাস ও জনপ্রিয়তায় প্রভাব রেখেছেন এমন খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই কম। এ কারণেই আজও কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং চিরকালীন ‘ফুটবলের রাজা’।