পরবর্তী গ্যালারি
কোরিয়া, ভিয়েতনাম থেকে আজকের ইরান, গত ৮১ বছরে কেন কোনও যুদ্ধ জেতেনি ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাগাতার যুদ্ধে জড়িয়েছে আমেরিকা। কিন্তু, চূড়ান্ত বিজয় প্রায় নেই বললেই চলে। কেন এই দুরবস্থা?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:০৭
০১ / ২০
ইরানকে ধুলোয় মিশিয়ে ফেলার লাগাতার হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জেরে সাবেক পারস্যে ফের আক্রমণের ঝাঁঝ বৃদ্ধির বাড়ছে জল্পনা। যদিও তাতে জয়ের সম্ভাবনা কতটা, তা নিয়ে বেশ সন্দিহান বিশেষজ্ঞমহল। কারণ তাঁদের বক্তব্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও লড়াইয়েই নির্ণায়ক জয় পায়নি ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা। উল্টে লাগাতার সংঘর্ষে জড়িয়ে বিপুল অর্থ এবং লোকক্ষয়, দুটোই করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
০২ / ২০
উদাহরণ হিসেবে কোরীয় যুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫০ সালে শুরু হওয়া ওই লড়াইয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আমেরিকা। কিন্তু, তা সত্ত্বেও তিন বছর পেরিয়ে অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয় সংঘর্ষ। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় বহু চেষ্টা করেও ডেমোক্রেটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়ার (পড়ুন, উত্তর কোরিয়া) অস্তিত্ব মুছে দিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। উল্টে পরবর্তী দশকগুলিতে আরও শক্তিশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করে তারা।
০৩ / ২০
১৯৫৩ সালে সংঘর্ষবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ধাপে ধাপে উত্তর কোরিয়ার উপর বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় আমেরিকা। ২১ শতক আসতে আসতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একরকম ‘একঘরে’ হয়ে পড়ে পিয়ংইয়ং। এই পরিস্থিতিতে সবাইকে চমকে দিয়ে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে আচমকাই পরমাণু অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। আণবিক হামলার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে তারা।
০৪ / ২০
উত্তর কোরিয়া পরমাণু শক্তিধর হোক, তা কখনওই চায়নি আমেরিকা। সেই কারণেই নিষেধাজ্ঞার চাপে পিয়ংইয়ংকে পিষে দেওয়ার ছক কষে মার্কিন প্রশাসন। যদিও তাতে এতটুকু সাফল্য পায়নি ওয়াশিংটন। উল্টে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নতুন এক ‘দৈত্যে’র জন্ম দিয়ে ফেলেছে তারা। তার আতঙ্কে কাঁটা হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। সরকারি ভাবে দ্বিতীয়টি আবার রিপাবলিক অফ কোরিয়া (আরওকে) নামে পরিচিত।
০৫ / ২০
দুই কোরিয়াকে বাদ দিলে অবশ্যই বলতে হবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা। ১৯৫৫ সালে শুরু হলেও গোড়ায় এই লড়াইয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি আমেরিকা। প্রথম পর্যায়ে সামরিক উপদেষ্টা ও আর্থিক সহায়কের ভূমিকা পালন করছিল তারা। কিন্তু, ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সেই নীতি থেকে সরে এসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সেনা পাঠাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানকার বিভিন্ন এলাকায় লাগাতার বোমাবর্ষণ করে মার্কিন বায়ুসেনা।
০৬ / ২০
১৯৬৫ সালে থেকে টানা আট বছর মরণপণ লড়েও ভিয়েতনামে শেষ হাসি হাসতে ব্যর্থ হয় ওয়াশিংটন। তত দিনে একাধিক ‘যুদ্ধাপরাধের’ দাগ লেগে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজের গায়ে। সরকারি মতে, এই সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৫৮,০০০-এর বেশি মার্কিন সৈনিক। এই ইস্যুতে আমেরিকার অভ্যন্তরে চড়ছিল অসন্তোষের পারদ। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই ১৯৭৩ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে তারা।
০৭ / ২০
মার্কিন ফৌজ ঘরে ফেরার পর ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে ভিয়েতনামের বেশি সময় লাগেনি। লড়াই থামতেই সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট সরকার। সালটা ছিল ১৯৭৫। চরম মতাদর্শগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত সেটা মেনে নেয় আমেরিকা। এর মধ্যেই ১৯৭৯ সালে সামরিক অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে সোভিয়েত ফৌজ। সঙ্গে সঙ্গেই হিন্দুকুশের কোলের দেশটি থেকে তাদের তাড়াতে ‘ছায়াযুদ্ধে’ নামে যুক্তরাষ্ট্র।
০৮ / ২০
গত শতাব্দীর ৭০ ও ৮০-এর দশকে আফগানিস্তানকে সোভিয়েত দখলমুক্ত করতে পাকিস্তানের সাহায্য নেয় আমেরিকা। মার্কিন অর্থানুকূল্যে কট্টরপন্থী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলে ইসলামাবাদ। তারা পরিচিতি পায় ‘মুজ়াহিদিন’ বা ধর্মযোদ্ধা নামে। এদের দিয়েই হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ১৯৮৯ সালে সেখান থেকে চম্পট দেয় মস্কোর বাহিনী। ওয়াশিংটনের এই গোপন অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’।
০৯ / ২০
আফগানিস্তানে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাফল্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মুজ়াহিদিনের ছদ্মবেশে অচিরেই সেখানে জন্ম হয় ‘আল কায়েদা’ নামের এক কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠীর। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে ভয়ঙ্কর এক ‘ফিদায়েঁ’ হামলা চালায় তারা। যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ধাক্কা মারে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) জোড়া ইমারতে। ফলে চোখের নিমেষে ধুলোয় মিশে যায় ওই দুই গগনচুম্বী অট্টালিকা।
১০ / ২০
আমেরিকার ভিতরে হওয়া ভয়ঙ্কর এই সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩,০০০। এই ঘটনার তদন্তে উঠে আসে ‘আল কায়েদা’র প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন-লাদেনের নাম। আফগানিস্তানে তাঁর লুকিয়ে থাকার খবর পায় মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী। ফলে তাঁকে খতম করতে হিন্দুকুশের কোলের রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম’। এই সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটনের দখলে আসে কাবুল।
১১ / ২০
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গোটা আফগানিস্তান দখলে এলেও লাদেনের টিকিও ছুঁতে পারেনি আমেরিকা। শেষপর্যন্ত ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে তাঁকে খতম করে মার্কিন ফৌজ। এর পর ২০২১ সালে কাবুল থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সেখানে ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। ওয়াশিংটনের চোখে তারা আর একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী। তা ছাড়া, ২০ বছর লড়েও ‘আল কায়েদা’কে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি তারা।
১২ / ২০
১৯৯১ সালে কুয়েতের স্বাধীনতার নামে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের সেই সেনা অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন ডেজ়ার্ট স্টর্ম’। ২০০৩ সালে ফের বাগদাদে চড়াও হয় মার্কিন ফৌজ। এ বার তাদের হাতে গ্রেফতার হন কিংবদন্তি ইরাকি প্রেসি়ডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর। তা সত্ত্বেও পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রটিতে ওয়াশিংটনের সাফল্যকে নজরকাড়া বলতে নারাজ বিশ্লেষকদের একাংশ।
১৩ / ২০
সাবেক সেনাকর্তাদের অনেকেই মনে করেন, বাগদাদ জয় করেও সেখান থেকে কিছুই পায়নি আমেরিকা। উল্টে সাদ্দামের পতনে সেখানে গজিয়ে ওঠে ‘ইসলামিক স্টেট’ বা দায়েশের মতো কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী। পাশাপাশি, পরবর্তী বছরগুলিতে আরব রাষ্ট্রটির বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় ইরান। বর্তমানে সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তেহরান মদতপুষ্ট একাধিক বিদ্রোহী দল। ফলে, তাঁদের হাতে ইরাকের দু’টুকরো হওয়ার বাড়ছে আশঙ্কা।
১৪ / ২০
১৯৯৯ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর হামলার মুখে পড়ে কসোভো থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য হয় যুগোস্লাভিয়া। কিন্তু, তাতে রাজনৈতিক ভাবে ওই এলাকাটির যে ভাগ্য খুলেছে, এমনটা নয়। বরং স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পরবর্তী ন’বছর সময় লেগে যায় তাদের। শেষে ২০০৯ সালে ওই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও আন্তর্জাতিক ভাবে রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি কসোভো। একে সার্বিয়ার একটি অংশ বলেই মনে করে চিন ও রাশিয়া।
১৫ / ২০
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরান আক্রমণ করে বসে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ গোটা পশ্চিম এশিয়াকে ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সংশ্লিষ্ট লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে পড়ে একগুচ্ছ যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর রকেট এবং রেডার হারিয়েছে মার্কিন ফৌজ। তাদের সামুদ্রিক ড্রোনও আটক করেছে সাবেক পারস্যের সেনা।
১৬ / ২০
ইরান যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ৪,২৬০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করে ফেলেছে আমেরিকা। অথচ, লড়াই থেকে তাদের প্রাপ্তি শূন্য বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। পশ্চিম এশিয়ার অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। তেহরানের দাপটে আগামী দিনে সেগুলি যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হওয়া একেবারেই অসম্ভব নয়। তা ছাড়া, সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হরমুজ় প্রণালী বন্ধ রেখেছে সাবেক পারস্য। ফলে বিশ্ব জুড়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সঙ্কট।
১৭ / ২০
সামরিক ক্ষেত্রে মার্কিন ব্যর্থতার কাহিনি এখানেই শেষ নয়। ১৯৮০ সালে ইরানে অবস্থিতি আমেরিকার দূতাবাসে ঢুকে সেখানকার কর্মীদের পণবন্দি করে একদল বিদ্রোহী। তাঁদের উদ্ধারে ‘অপারেশন ইগল ক্ল’ নামের একটি কমান্ডো অভিযানে নামে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। যদিও খালি হাতেই ফিরতে হয় তাঁদের। ১৯৮৩ সালে লেবাননে জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান ২৯৯ জন সৈনিক। এদের বড় অংশই ছিলেন ওয়াশিংটনের নাগরিক।
১৮ / ২০
অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও অতি শক্তিশালী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও লড়াইয়ের ময়দানে আমেরিকার ঘন ঘন ‘পরাজয়ের’ নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সে দেশের একটি আইন। তার নাম গোল্ডওয়াটার-নিকোলস অ্যাক্ট। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে তাতে সই করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। এর উপর ভিত্তি করেই একাধিক আঞ্চলিক কমান্ড গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাথায় রয়েছে চার বা পাঁচ তারা জেনারেল।
১৯ / ২০
গোল্ডওয়াটার-নিকোলস আইনের জেরে সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠন এবং আধুনিকীকরণে সুবিধা হয় আমেরিকার। কিন্তু, এতে একটা নতুন বিপদের মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, নতুন নিয়মে স্বতন্ত্র ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছেন বিভিন্ন কমান্ডের মাথায় থাকা জেনারেলরা। ফলে যাবতীয় সমস্যাকে সামরিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন তাঁরা। তা ছাড়া, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং তাঁদের চিন্তাভাবনার মধ্যে ফারাক তৈরি হচ্ছে।
২০ / ২০
বিশ্বের বিভিন্ন রণাঙ্গনে এরই খেসারত মার্কিন ফৌজ দিচ্ছে বলে স্পষ্ট করেছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। গত আট দশকে তাদের একমাত্র বড় সাফল্য হল সস্ত্রীক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা, এ বছরের শুরুতেই কারাকাসে ঢুকে যেটা করেছে আমেরিকার বাহিনী। সংশ্লিষ্ট অভিযানটির সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়লভ’ বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
