যৌবন মানেই স্বপ্ন, উদ্যম আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এই বয়সে কেউ ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত, কেউ ছুটছেন অর্থ-সম্পদের পেছনে, আবার কেউ ডুবে আছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর বিনোদনের জগতে। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেকেরই দিন কেটে যায় দুনিয়ার নানা ব্যস্ততায়। অথচ যে জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে, সেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে মহান আল্লাহর কাছে। তাই প্রশ্ন জাগে, তরুণ বয়সের মূল্যবান সময় কি শুধু দুনিয়ার সাফল্যের পেছনে ব্যয় করার জন্য, নাকি পরকালের প্রস্তুতি নেওয়ারও এখনই উপযুক্ত সময়?
ইসলামে তরুণ বয়সকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, এই বয়সে মানুষের শারীরিক শক্তি, কর্মক্ষমতা ও প্রবৃত্তির টান প্রবল থাকে। নানা প্রলোভনের মধ্যেও যে তরুণ আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে ধরে রাখেন, তার জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদার সুসংবাদ।
ইবাদতকারী তরুণের জন্য বিশেষ সুসংবাদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে রয়েছেন সেই যুবক, যিনি আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩১)
এই হাদিস তরুণদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। যে বয়সে মানুষ নানা আকর্ষণ ও প্রলোভনে সহজেই হারিয়ে যেতে পারে, সেই বয়সেই আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইবাদতকারী তরুণের এই মর্যাদা প্রমাণ করে, আল্লাহর আনুগত্যে গড়ে ওঠা জীবন কতটা মূল্যবান।
যৌবনের সময় কি কেবল দুনিয়ার জন্য?
পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা, এসব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামও মানুষকে দায়িত্বশীল হতে এবং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু দুনিয়ার ব্যস্ততা যেন মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার কথা ভুলিয়ে না দেয়, সেদিকেও সতর্ক থাকা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
নামাজ শুধু একটি ফরজ ইবাদতই নয়, বরং একজন মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত করারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নিয়মিত নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে একজন তরুণ তার জীবনে আল্লাহর স্মরণকে প্রাধান্য দিতে পারেন। একই সঙ্গে মিথ্যা, প্রতারণা, অশ্লীলতা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করার মতো কাজ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে পারেন।
ইবাদত মানে শুধু নামাজ-রোজা নয়
ইবাদতের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমে আসে নামাজ, রোজা ও কোরআন তিলাওয়াতের কথা। এগুলো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শরিয়তসম্মতভাবে করা দৈনন্দিন অনেক কাজও সওয়াবের কারণ হতে পারে।
মা-বাবার সেবা করা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা, উপকারী জ্ঞান অর্জন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা, এসব কাজও সঠিক নিয়ত ও ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে ইবাদতের মর্যাদা পেতে পারে।
তাই একজন তরুণের ইবাদত শুধু মসজিদ কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। তার ব্যক্তিগত জীবন, পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক আচরণেও ইসলামের শিক্ষা প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
যৌবন সম্পর্কে জবাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে
মানুষের জীবন সীমিত। শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, এরপর যৌবন, সময় নিজের নিয়মে এগিয়ে যায়। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে অনেকেই বুঝতে পারেন না, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় কখন শেষ হয়ে যাচ্ছে।
জামে তিরমিজিতে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জীবন কী কাজে ব্যয় করেছে এবং বিশেষভাবে যৌবন কী কাজে অতিবাহিত করেছে, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)।
এই বার্তা তরুণদের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে। প্রতিদিনের সময় কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কোন অভ্যাস তাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিচ্ছে, আর কোন অভ্যাস দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
কীভাবে শুরু করবেন ইবাদতময় জীবন?
ইবাদতে অভ্যস্ত হতে একদিনেই সবকিছু বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথভাবে আদায়ের মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো পড়ার চেষ্টা, প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত তওবা-ইস্তিগফার এবং পাপের পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার উদ্যোগ ধীরে ধীরে জীবনকে সুন্দর করতে পারে।
পাশাপাশি ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ, উপকারী বই পড়া এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। কখনো ভুল হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে তওবা করে আবার সঠিক পথে ফিরে আসতে হবে।
কারণ, ইবাদতময় জীবন গড়ার জন্য শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন আন্তরিকতা, ধারাবাহিকতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা।
যৌবন জীবনের এমন এক সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। অর্থ-সম্পদ, সাফল্য কিংবা খ্যাতির পেছনে ছুটতে গিয়ে যেন মানুষ নিজের পরকালের প্রস্তুতি ভুলে না যায়। দুনিয়ার দায়িত্ব পালন এবং আল্লাহর ইবাদত, দুটিকে সমন্বয় করেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর জীবন।
আজকের তরুণই আগামী দিনের অভিভাবক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও সমাজের নেতৃত্বদানকারী। তাই তরুণ বয়স থেকেই ইবাদত, সততা ও নৈতিকতার চর্চা শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, পরিবার ও সমাজের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। যৌবনের প্রতিটি মুহূর্ত হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালের প্রস্তুতির পথে ব্যয় করার এক মূল্যবান সুযোগ।
