দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো যাত্রীবাহী ড্রোন সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে শ্রীলঙ্কা। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে চীনা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ইহাংয়ের তৈরি দুই আসনের একটি বিদ্যুচ্চালিত উড়ুক্কু যান ইতোমধ্যে দেশটির কলম্বোর বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। অক্টোবরের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কলম্বো পোর্ট সিটি থেকে যাত্রী নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে উড়তে পারে যানটি।
শ্রীলঙ্কার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক দামিন্দা রামবুকওয়েল্লা জানিয়েছেন, এয়ারক্রাফটটির গন্তব্য চূড়ান্ত করতে ২৩ অক্টোবর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর মতে, শ্রীলঙ্কায় বিদ্যুচ্চালিত আকাশযানভিত্তিক ট্যাক্সি সেবা চালুর ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পর্যটন, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং দুর্গম এলাকায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজেও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবহন চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণে শিগগিরই একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল দেশটি সফর করবে।
দামিন্দা রামবুকওয়েল্লা বলেছেন, যাত্রীবাহী ড্রোন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ‘অ্যাডভান্সড এয়ার মোবিলিটি’ ব্যবস্থা চালুর নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
চীনা প্রতিষ্ঠান ইহাংয়ের তৈরি দুই আসনের ড্রোনটি শ্রীলঙ্কা থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করেছে। একই ধরনের আরেকটি ড্রোন আগামী ২৮ নভেম্বর দেশটিতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আগামী বছর চার থেকে ছয়জন যাত্রী বহনে সক্ষম অপেক্ষাকৃত বড় ড্রোন চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব যান ২০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর শাটল সেবার মতো পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আকাশপথে নতুন যোগাযোগব্যবস্থা
যাত্রীবাহী ড্রোন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে বিশেষ অবকাঠামো। ড্রোনের উড্ডয়ন, অবতরণ, ব্যাটারি চার্জ এবং যাত্রী ওঠানামার সুবিধা দিতে ‘ভার্টিপোর্ট’ নামের বিশেষ টার্মিনাল গড়ে তুলতে হবে। প্রকল্পের ব্যবসায়িক মডেল চূড়ান্ত হলে যাত্রীবাহী ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রীলঙ্কায় কার্যক্রম শুরুর সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক।
সাধারণ চালকবিহীন ড্রোনের সঙ্গে এ ধরনের যানের পার্থক্য হলো, এগুলো বিশেষভাবে মানুষ বহনের উপযোগী করে তৈরি বিদ্যুচ্চালিত আকাশযান। চীন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে এ প্রযুক্তি নিয়ে কার্যক্রম চলছে। শ্রীলঙ্কা প্রথমে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা যাচাই করে পরে বৃহত্তর পরিসরে সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
শহরাঞ্চলে যাতায়াতের পাশাপাশি পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় পর্যটকদের জন্য দৃশ্য উপভোগের ফ্লাইট চালু করা যেতে পারে। তিমি দেখার মতো পর্যটন আকর্ষণেও এসব যান ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্গম অঞ্চলে জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনেও ভূমিকা রাখতে পারে এ প্রযুক্তি।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, যাত্রীবাহী ড্রোন পরিবহনব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। প্রতিটি ড্রোন মাটি থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট উচ্চতায় চলাচল করবে। নিরাপদ উড্ডয়ন নিশ্চিত করতে থাকবে তাৎক্ষণিক অবস্থান শনাক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা।
দামিন্দা রামবুকওয়েল্লার ভাষ্য, একটি যাত্রীবাহী ড্রোনের দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির চেয়েও কম হতে পারে। ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি শ্রীলঙ্কার মানুষের যাতায়াতের ধরন বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
তবে নতুন এ পরিবহনব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের ফলাফল, প্রয়োজনীয় নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর। প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা ও নিয়মিত সেবা পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে শ্রীলঙ্কার সামনে বড় পরীক্ষা।
সানা/আপ্র/২২/১০/২০২৬
