
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় মৃৎশিল্পীরা, ১২২ মণ্ডপে চলছে পূজার প্রস্তুতি
কয়েকদিন আগেও যেখানে পড়ে ছিল বাঁশ, কাঠ, খড় আর মাটির স্তূপ, এখন সেখানেই ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার মুখাবয়ব। কারও হাতে রংতুলি, কারও হাতে মাটির প্রলেপ; কেউ ব্যস্ত চোখের পাতা আঁকতে, কেউ সাজিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গার অলংকার। সকাল গড়িয়ে রাত, রাত পেরিয়ে ভোর—সময় যেন থামছে না বানিয়াচংয়ের মৃৎশিল্পীদের। শারদীয় দুর্গোৎসব যতই এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের ব্যস্ততা।
মাটির শরীরে নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছেন দেবী দুর্গা। সঙ্গে তৈরি হচ্ছে সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশ। রংতুলির শেষ আঁচড়ে প্রতিমাগুলো হয়ে উঠছে আরও আকর্ষণীয়। উৎসবের আনন্দের আড়ালে এ যেন মৃৎশিল্পীদের নিরলস শ্রম, ঘাম আর বংশপরম্পরায় টিকে থাকা এক শিল্পের গল্প।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় এবার ১২২টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী ১৬ অক্টোবর মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের এই উৎসবের সমাপ্তি হবে। পূজাকে ঘিরে এরই মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির মূল কাজ শেষ পর্যায়ে। কোথাও চলছে রঙের কাজ, কোথাও প্রতিমার অলংকার পরানো হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। মাটির প্রতিমায় রংতুলির প্রতিটি আঁচড় যেন উৎসবের আগমনী বার্তা বহন করছে।
মৃৎশিল্পীরা জানান, প্রতিমা তৈরির কাজ মোটেও সহজ নয়। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করতে হয় কাঠামো। এরপর খড় দিয়ে প্রতিমার অবয়ব তৈরি করে দেওয়া হয় মাটির প্রলেপ। কয়েক ধাপে মাটি শুকানোর পর আসে সূক্ষ্ম কারুকাজ, রং ও সাজসজ্জার পালা। একটি প্রতিমা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রম প্রয়োজন। তাই শেষ সময়ের চাপ সামলাতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন তারা।
প্রবীণ মৃৎশিল্পী নিখিল আচার্য বলেন, “বয়স ৬৫ পেরোলেও প্রতিমা গড়ার নেশা আর ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা আমাকে আজও মাটির কাছে টেনে আনে। একই বাড়িতে টানা ৪০ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিমা তৈরি করছি। এবার মাটির কাজ শেষ, চলছে রংতুলির শেষ আঁচড়ে প্রতিমাকে জীবন্ত করে তোলার প্রস্তুতি। সময়ের সঙ্গে প্রতিমার নকশা ও আকারে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু আমি বুকের গভীরে আগলে রেখেছি পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য আর আদি শিল্পধারা।
কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে আর্থিক চাপ বাড়লেও প্রতিমা গড়ার আনন্দ ও দায়বদ্ধতা কখনো কমেনি। তবে আগের তুলনায় সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা বেড়েছে, যা আমাদের মতো প্রবীণ শিল্পীদের নতুন করে সাহস জোগায়। তাঁদের এই সহযোগিতার জন্য আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।”
প্রতিমাশিল্পী অঞ্জন পাল বলেন, “প্রতিমা তৈরির কাজ এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে। রংতুলির নিপুণ আঁচড়, সূক্ষ্ম কারুকাজ ও নান্দনিক সাজসজ্জায় প্রতিটি প্রতিমাকে অপরূপ রূপে ফুটিয়ে তুলতে আমরা সর্বোচ্চ যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছে দিতে দিন-রাত একাকার করে পরিশ্রম করতে হচ্ছে। পূজার আগমনী আনন্দকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে এখন আমাদের চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তি উপেক্ষা করেই চলছে শেষ মুহূর্তের কর্মযজ্ঞ।”
বানিয়াচং পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মাধব দেব জানান, শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে বানিয়াচংয়ের পূজামণ্ডপগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ, চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আগামী ১৬ অক্টোবর শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে পাঁচ দিনব্যাপী এ মহোৎসবের। দুর্গোৎসবকে সুশৃঙ্খল, আনন্দঘন ও নির্বিঘ্ন করতে মণ্ডপে মণ্ডপে নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।
ভক্ত, পূজারি ও দর্শনার্থীরা যেন নিশ্চিন্তে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এবং উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পূজামণ্ডপ সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো। সরকার ও প্রশাসন অন্যান্য বছরের তুলনায় খুবই আন্তরিকভাবে কাজ করছে। প্রতি মণ্ডপে এবার ৬'শ কেজি করে সরকারি বরাদ্দকৃত চাল পাবে।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলছেন, দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও এটি এখন অনেকটাই সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। পূজার দিনগুলোতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলন ঘটে। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমার রূপ ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বানিয়াচংয়ের জনপদেও ছড়িয়ে পড়ছে উৎসবের আবহ।
এদিকে প্রতিমা তৈরির কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার প্রস্তুতি। উৎসবকে ঘিরে বাজারেও বাড়ছে ব্যস্ততা। নতুন পোশাক, পূজার সামগ্রী ও বিভিন্ন পণ্যের কেনাকাটায় জমে উঠছে স্থানীয় বাজার।
বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ নাজমুল হক জানান, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। উপজেলার ১২২টি পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পূজার পুরো সময়জুড়ে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি আনসার বাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন। পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, ভক্ত-দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক ও তৎপর থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মেহরাব হোসাইন বলেন, “দুর্গোৎসবের আনন্দ যেন সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, কোনো ধরনের শঙ্কা ছাড়াই ভক্তরা যেন নির্বিঘ্নে পূজার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন—সে লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
পুলিশ, আনসার ও এসআরবি সদস্যরা পূজামণ্ডপগুলোতে টহল দেবেন। ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে থাকবে বিশেষ নজরদারি। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলার ১২২টি পূজামণ্ডপের প্রতিটিতে ৬০০ কেজি করে মোট ৭৩.২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক ভালোবাসার এক অনন্য বন্ধন। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ সবার—এই চেতনাকে ধারণ করে বানিয়াচংয়ে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপনে সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই জনপদে কোনো বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
