খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
মাটির দেয়াল, ছনের ছাউনি। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি আটচালা ঘর। অথচ এই ঘরেই একসময় সপরিবারে সময় কাটিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ঘরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির স্মৃতি, সাহিত্যচর্চা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় ভৈরব নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা প্রায় এক শতাব্দী ধরে বহন করছে সেই স্মৃতি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়নি। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে কবির স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নদীর ঘাটও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আটচালা ঘরটি এখনো টিকে আছে মূলত হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উত্তরসূরিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে। ২০১৫ সালে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হলেও গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত স্মৃতি কমপ্লেক্স, গবেষণাকেন্দ্র কিংবা পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ফলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়েও স্থানটি রয়ে গেছে অনেকটা আড়ালে।
স্থানীয় নজরুল প্রেমীদের দাবি, কবির স্মৃতিবিজড়িত ঘর, ঘাট ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ করে কার্পাসডাঙ্গায় একটি পূর্ণাঙ্গ নজরুল স্মৃতি ও গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলা হোক।
কার্পাসডাঙ্গায় নজরুলের স্মৃতির শুরু
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা। ভৈরব নদের তীরঘেঁষা এই জনপদের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯২৬ সালের দিকে কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে অবস্থানকালে কার্পাসডাঙ্গার মহিম সরকার, হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস ও বৈদ্যনাথ বাবুর সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাদের আমন্ত্রণেই কবি সপরিবারে কার্পাসডাঙ্গায় আসেন। বিভিন্ন সূত্রে ১৯২৬ ও ১৯২৭ সালে তার একাধিকবার এখানে আসার কথা উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, কলকাতা থেকে ট্রেনে দর্শনায় এসে সেখান থেকে গরুর গাড়িতে কার্পাসডাঙ্গায় পৌঁছেছিলেন কবি। আবার কোনো কোনো সূত্রে নদীপথে আসার কথাও উল্লেখ রয়েছে। যাতায়াতের পথ নিয়ে বর্ণনায় ভিন্নতা থাকলেও কার্পাসডাঙ্গায় কবির অবস্থান ও স্মৃতিবিজড়িত আটচালা ঘরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্থানীয় ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
একশ বছর আগে কবি নজরুলের লেখা ও আজকের বাস্তবতা
কবি থাকতেন মিশনপাড়ার হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাগানবাড়ির আটচালা ঘরে। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস ছিলেন শিক্ষক, রাজনীতিক এবং তৎকালীন নদীয়া জেলা কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত নেতা। তার বাড়িটি সে সময় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।
নজরুলের সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী প্রমীলা দেবী, শাশুড়ি গিরিবালা দেবী এবং দুই সন্তান অরিন্দম খালেদ বুলবুল ও কাজী সব্যসাচী। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, কবি এখানে প্রায় দুই মাস অবস্থান করেছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় ১৯২৬ ও ১৯২৭ সালে দুই দফায় তার অবস্থানের কথা পাওয়া যায়।
মাটি ও ছনের তৈরি এই ঘরের গুরুত্ব শুধু এর স্থাপত্যে নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসে। এখানে কবির ব্যবহৃত খাট ও আলমারি সংরক্ষিত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উত্তরসূরিরা নিজেদের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে ঘরটি টিকিয়ে রেখেছেন।
ভৈরব নদের ঘাটেও কবির স্মৃতি
কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থানকালে ভৈরব নদের তীরে বাঁধানো সিঁড়ির ঘাট এবং ঝাউ ও দেবদারুগাছের ছায়াঘেরা স্থান কবির প্রিয় জায়গাগুলোর মধ্যে ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাস ও গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বসে তিনি প্রকৃতি উপভোগ করতেন, গান করতেন এবং সাহিত্যচর্চা করতেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
এই বাড়ি ও এলাকার সঙ্গে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতচর্চার নানা স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। কার্পাসডাঙ্গার সঙ্গে ‘লিচু চোর’ ও ‘পদ্মগোখরো’সহ কিছু রচনা এবং গানের স্মৃতির কথা স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের দুই মেয়ে আভা রানী সরকার ও শিউলী রানী সরকার নজরুলের কাছে গান শিখতেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।
হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাড়িটি শুধু কবির থাকার জায়গা ছিল না। তৎকালীন স্বদেশি আন্দোলনের নেতাকর্মীদের বৈঠক ও বিশ্রামের স্থান হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতো বলে জানা যায়। ফলে আটচালা ঘর ও আশপাশের এলাকা নজরুলের সাহিত্যিক স্মৃতির পাশাপাশি সে সময়কার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও সাক্ষী।
কিন্তু সেই স্মৃতিবিজড়িত ঘাটটির বর্তমান অবস্থা জরাজীর্ণ। দীর্ঘদিনের অবহেলায় এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। কবির স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘর ও ঘাটকে কেন্দ্র করে পর্যটন, গবেষণা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্যও নেই পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো।
উত্তরসূরিদের উদ্যোগেই টিকে আছে আটচালা ঘর
প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আটচালা ঘরটি টিকে আছে মূলত হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উত্তরসূরিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে। ছনের ছাউনি মেরামত, খড় সংগ্রহ এবং ঘরটির দেখভালের মতো কাজ নিজেদের অর্থ ও শ্রম দিয়ে করতে হচ্ছে তাদের। সরকারি সহায়তা সীমিত হওয়ায় ঐতিহাসিক স্থাপনাটির দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আটচালা ঘরটির মালিক প্রকৃত বিশ্বাস (বকুল) বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় নিজেদের উদ্যোগেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এই আটচালাঘরটি সংরক্ষণ করে আসছি। ২০১৫ সালে সরকারিভাবে সামান্য সহযোগিতা পেয়েছিলাম। তবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা গেলে কবির স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও তার স্মৃতিবিজড়িত স্থান সম্পর্কে জানতে পারবে।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মাদারীপুর প্রসঙ্গ
স্থানীয়দের মতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা প্রশংসনীয় হলেও এর সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। যথাযথ সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঐতিহাসিক তথ্যের প্রামাণ্য নথি তৈরি করা প্রয়োজন। তা না হলে সময়ের সঙ্গে স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
স্মৃতিফলক আছে, পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্সের অপেক্ষা
২০১৫ সালে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আটচালা ঘরটির পাশে নজরুলের স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়। তবে এরপরও স্থানটিকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
নজরুল স্মৃতি সংসদের সভাপতি শামসুল আলম বলেন, কার্পাসডাঙ্গার এই আটচালাঘর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থান। কবির স্মৃতি ও ইতিহাসের এই নিদর্শন সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। স্থাপনাটি সংস্কার করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা হলে কবির স্মৃতি রক্ষার পাশাপাশি এটি দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থাপনাটি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই।
মেলবোর্নের মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠবে কাজী নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি
স্থানীয় নজরুলপ্রেমীদের দাবি, শুধু আটচালা ঘর সংস্কার করলেই সংরক্ষণের কাজ সম্পূর্ণ হবে না। কবির স্মৃতিবিজড়িত ঘাট, আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পরিবেশও সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণাকেন্দ্র, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে স্থানটি নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ও সংস্কৃতিচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
নজরুল স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাব
স্থানটি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিষয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন জানান, কার্পাসডাঙ্গায় কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে ঘিরে ‘নজরুল স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, ভৈরব নদের তীরে কবির কবিতা রচনার সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ঘাটটি সংস্কারের পাশাপাশি সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সংযোগ সড়ক উন্নয়ন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
নজরুল বর্ষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার নির্দেশ
চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সম্মান জানিয়ে এ বছরকে নজরুল বর্ষ ঘোষণা করেছেন। কার্পাসডাঙ্গার আটচালাঘরটি সংরক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ কবি নজরুল স্মৃতি কমপ্লেক্স গড়ে তোলার বিষয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার কথা বলেছি। আশা করি, দ্রুত এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে এবং জাতীয় কবির জীবনাদর্শ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে।
তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবের বর্তমান অবস্থা, প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়, অর্থায়নের উৎস কিংবা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে পরিকল্পনাটি কবে বাস্তব রূপ পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
