ঢাকে কাঠি পড়েছে। শারদোৎসবের আনন্দে মেতেছে বাংলা। পুজোর আলো, মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে আপাতত ম্লান রাজনৈতিক তরজা। কিন্তু উৎসবের আবহেও অশান্তির ছায়া কাটছে না। চোরবাগানের ঘটনা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামেদের বই বিক্রির স্টলে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ঘিরে ক্রমেই চড়ছে রাজনৈতিক পারদ। রবিবার রাত থেকে সোমবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় বুক চলে হামলা চলেছে। কোথাও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কোথাও অভিযোগের তির গেরুয়া শিবিরের দিকে। ফলে পুজোর আনন্দের মধ্যেও বইয়ের স্টল ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সংঘাত। প্রতিবাদে সরব হয়েছে ভিন রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
প্রতিবাদ করেছেন কেরলমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী, বিজেপি নেতা জিষ্ণু বসু, রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ঘটনার নিন্দায় সরব হয়েছেন বাম নেতৃত্ব। প্রতিবাদে মুখ খুলেছেন কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী তৃণমূলের একাংশ এবং গেরুয়া শিবিরের নেতারাও। রাজনৈতিক মতাদর্শের ফারাক থাকলেও বই বিক্রির স্টলে হামলার বিরোধিতায় বিভিন্ন শিবিরের নেতাদের একাংশের সরব হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক বিরোধের ময়দানে বই বিক্রির মতো সাংস্কৃতিক উদ্যোগও কি ক্রমশ সংঘাতের নিশানা হয়ে উঠছে?
তবে এই সংঘাতের ছবির অন্য একটি দিকও রয়েছে। যেসব জায়গায় বইয়ের স্টল ভাঙচুর করা হয়েছে, তার অনেকগুলিতেই নতুন করে স্টল তৈরি করে বই বিক্রি শুরু করেছেন বাম কর্মীরা। ভেঙে পড়া স্টলের জায়গায় আবার বই সাজিয়ে বসা যেন নিছক বিক্রির উদ্যোগ নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ারও চেষ্টা। হামলার অভিযোগের মধ্যেও বই নিয়ে এই প্রত্যাবর্তন বামেদের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠছে। কিন্তু এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ কী? শারদোৎসব শেষ হলে কি বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনাও থিতিয়ে যাবে? নাকি পুজোর মরশুমে শুরু হওয়া এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়বে সারা বছরের রাজনীতিতে? বই বিক্রি কি শেষ পর্যন্ত বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা হয়ে উঠবে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন ও পালটা প্রতিরোধের হাতিয়ার? বাংলার রাজনীতিতে বইয়ের স্টল বরাবরই নিছক বেচাকেনার জায়গা নয়।
সেখানে থাকে মতাদর্শের প্রচার, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রকাশ এবং জনসংযোগের সুযোগ। কিন্তু সেই পরিসর যদি ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগে বারবার উত্তপ্ত হয়, তা হলে উৎসবের মরসুমে সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিসর নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। পুজোর আলো নিভে যাওয়ার পরে তাই নজর থাকবে একটাই দিকে – বইয়ের লড়াই কি বইয়ের পাতাতেই ফিরবে, নাকি রাজনীতির চক্রব্যূহে ঘুরপাক খাবে সারা বছর? গেরুয়া শিবিরের যোগান দেওয়া এই রাজনৈতিক রসদ সারা বছরই বামেদের কাছে প্রচারের হাতিয়ার হয়ে উঠবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
