জন্ম তামিলনাড়ুতে। কর্ম পশ্চিমবঙ্গে। প্রায় ১৯ বছর এ রাজ্যে কাজ করেছেন। বার কয়েক বদলি হয়েছেন। এ বার বদলি হয়ে সোজা দিল্লি। রবিবারই হয়তো রাজধানী রওনা হবেন। তার আগে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে নিজের লেখা বই প্রকাশ করে গেলেন আইএএস অফিসার সি মুরুগন। শনিবার যার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় থেকে অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরীরা। বইয়ের নাম ‘নোয়াখালির রুস্তম খান’।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২০০৭ ব্যাচের আইএএস আধিকারিক মুরুগন এসআইআরের সময় স্পেশ্যাল রোল অবজ়ারভারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন শাসকদল তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব বেধেছে। এসআইআর আবহে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটে ‘ভোটারদের’ বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। একদা তামিলনাড়ুর ডিএসপি পদমর্যদার আধিকারিক মুরুগন ইউপিএসসি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আমলা হিসাবে রাজ্য প্রশাসনের বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। একদা দক্ষিণ দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলাশাসক ছিলেন। সেখান থেকে পদোন্নতি হয়ে রাজ্য পরিবহণ দফতরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বিভিন্ন কাজ এবং পদক্ষেপে নবান্নের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। পরে টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারম্যান হন তিনি। যা তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ পদ। তবে কমিশন মুরুগনকে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরের অন্যতম পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দিয়েছিল। সেই সময় ওই আইএএস অফিসারকে বিঁধে সমাজমাধ্যমে একাধিক পোস্ট করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। প্রত্যুত্তর দিতে দেরি করেননি মুরুগন। আবার শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় মুরুগনের একাধিক পোস্ট নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই জল্পনা শুরু হয়েছিল। তার মধ্যে প্রকাশ্যে আসে তাঁর বদলির সংবাদ। দিল্লি রওনা হওয়ার আগে টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার সদ্য প্রাক্তন ডেপুটি চেয়ারম্যানের লেখা ‘নোয়াখালির রুস্তম খান’ বই প্রকাশ হল কলকাতা প্রেস ক্লাবে।
১৯৪৬ সালের কলকাতায় ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’-কে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা এবং পরবর্তী সময়ে নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক হিংসা, এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে উপন্যাসের কাহিনি এগিয়েছে। সেই অস্থির সময়ে মানুষের জীবন, সম্পর্ক এবং সামাজিক পরিস্থিতি কী ভাবে বদলে গিয়েছিল, তারই ছবি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন লেখক মুরুগন। তিনি জানান, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রুস্তম খান। নোয়াখালির লামচরের বাসিন্দা রুস্তমের স্বপ্ন নীলাঞ্জনাকে ঘিরে। নীলাঞ্জনা একজন জমিদারের মেয়ে। দু’জনের মধ্যে ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি হলেও ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক শ্রেণিবিভাগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁদের সম্পর্কের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে ভালবাসা কেবল দুই বিপরীত লিঙ্গের মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা হয়ে ওঠে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক প্রতীক। মুরুগন বলেন, ‘‘ভাগ্যের টানে রুস্তম কলকাতায় আসে। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তনে তাকে আবার নোয়াখালিতে ফিরে যেতে হয়। সেখানে তার সামনে আসে আরও কঠিন বাস্তবতা। এক দিকে ব্যক্তিগত ভালবাসা, অন্য দিকে হিংসা ও সংঘাতের মধ্যে বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব। চারপাশের মানুষ যখন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের পক্ষ বেছে নিচ্ছে, তখন রুস্তমকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়— সে কোন পথে হাঁটবে? নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে, না কি বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবে?’’
এমন দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে চলে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় আচ্ছন্ন একটি সমাজে নিজের মানবিক পরিচয় ধরে রাখা কতটা কঠিন, সেই প্রশ্নও তুলে ধরে গল্পটি। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, ভালবাসা, সাহস এবং মানবিকতার মধ্য দিয়েই এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি এবং তামিল ভাষায় বইটি প্রকাশ হয়েছে।
কর্মজীবনের শুরুতে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ মাইসুরুর প্রবেশনারি অফিসার ছিলেন মুরুগন। পরে তামিলনাড়ু পুলিশ সার্ভিসে যোগ দেন। ডেপুটি সুপারিনটেডেন্ট অফ পুলিশ (ডিএসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পর ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইএএস অফিসার হিসেবে যোগ দেন। পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আধিকারিক মুরুগন এ বার কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রকের যুগ্মসচিব। ২০৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরের জন্য ওই পদে কাজ করবেন।
