হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, চুরি ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৩৬টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ক্যামেরা। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে যাত্রীরা নিজেদের লাগেজের অবস্থান জানতে পারবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। শুধু ক্যামেরা স্থাপনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না উদ্যোগ। উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং যাত্রীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া নজরদারির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি। লাগেজ চুরি, কাটা ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধে এ কমিটি দিয়েছে ১২ দফা সুপারিশ। এর মধ্যে নিয়মিত নিরীক্ষা, আকস্মিক পরিদর্শন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশও করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ১০ আগস্ট এক অফিস আদেশে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত
হওয়া ও চুরির ঘটনার পুনরাবৃত্তি তদন্তে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা হয়। এতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, এয়ারলাইন অপারেশন কমিটি (এওসি) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
কমিটির সুপারিশে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের সামনে লাগেজ পরিবহনের কার্যক্রম সরাসরি প্রদর্শন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগের তথ্য সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই ক্যামেরাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যাত্রীরা যেন নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তাদের লাগেজ বুঝে পান, সে লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লাগেজের অবস্থান জানতে এআই ক্যামেরা : শাহজালাল বিমানবন্দরে ৩৬টি এআই ক্যামেরা স্থাপন লাগেজ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পদক্ষেপ। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রীরা নিজেদের লাগেজ কোথায় রয়েছে, সে তথ্যও জানতে পারবেন বলে জানা গেছে।
উড়োজাহাজ থেকে নামানোর পর লাগেজ পরিবহন, বাছাই এবং আগমনী লাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কোনো পর্যায়ে লাগেজ হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার স্থান ও সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে।
তবে ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজের দৃশ্যমান গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট ব্যাগের অবস্থান ডিজিটাল পদ্ধতিতে শনাক্ত করা এক বিষয় নয়। নির্ভুলভাবে লাগেজের অবস্থান জানাতে ক্যামেরার পাশাপাশি ব্যাগ শনাক্তকরণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। ক্যামেরাগুলো কোথায় স্থাপন করা হয়েছে, যাত্রীরা কীভাবে তথ্য পাবেন এবং সুবিধাটি পুরোপুরি চালু হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
এদিকে আগমনী লাগেজ বেল্ট এলাকায় বড় পর্দায় লাগেজ পরিবহনের কার্যক্রম সরাসরি দেখানোর সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া লাগেজ পরিবহনের যেসব স্থানে সিসি ক্যামেরা নেই বা নজরদারি দুর্বল, সেগুলো চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
লাগেজ চুরি ও মূল্যবান সামগ্রী খোয়া যাওয়ার অভিযোগে পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার দাবিও উঠেছে। ৫ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী জনস্বার্থে আইনি নোটিশ পাঠান। এতে উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে লাগেজ নামানো, ট্রলিতে তোলা, র্যাম্প দিয়ে পরিবহন এবং ব্যাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ উচ্চমানের সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি ছিল।
কর্মীদের গায়ে ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব : লাগেজ ওঠানো-নামানো ও পরিবহনের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শরীরে ধারণযোগ্য ক্যামেরা বা বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সুপারিশ করে কমিটি। দায়িত্ব পালনের সময় এসব ক্যামেরা চালু রাখা, ধারণ করা ফুটেজ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে তদন্তে ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজ শনাক্তে বিশেষ ব্যবস্থা : লাগেজে ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেলে তা নথিবদ্ধ করতে নির্ধারিত স্টিকার, নিরাপত্তা সিল বা ট্যাগ ব্যবহারের সুপারিশ করে কমিটি। সুপারিশ অনুযায়ী, উৎপত্তিস্থল বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে কোনো লাগেজ ছেঁড়া, খোলা, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুনরায় প্যাক করা অবস্থায় পাওয়া গেলে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে জানাতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী গন্তব্য বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষকেও আগাম তথ্য দিতে হবে। এ জন্য ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজের ছবি ই-মেইলে পাঠানো, ক্ষতির ধরন নথিবদ্ধ এবং ব্যাগে ড্যামেজ স্টিকার, নিরাপত্তা সিল বা ট্যাগ লাগানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে লাগেজটি কোন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রমাণ সংরক্ষণ করা সহজ হবে।
অভিযোগ নিষ্পত্তি ও জবাবদিহিতে জোর : লাগেজ হারানো, চুরি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিযোগের অগ্রগতি জানানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছে লাগেজসংক্রান্ত ১ হাজার ৩৮৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৭২টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে নথিভুক্ত করা হয়। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় মাত্র ১৫টি ক্ষেত্রে।
২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে প্রায় ১ হাজার ১০০টি অভিযোগ জমা পড়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯১৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে নথিভুক্ত করা হয়।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে জনবল ও সরঞ্জাম বাড়ানোর তাগিদ : লাগেজ ব্যবস্থাপনায় নজরদারির পাশাপাশি কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তদন্ত কমিটি। লাগেজ ওঠানো-নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং বেল্টে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিটি ধাপে দক্ষ কর্মী, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কোনো পর্যায়ে জনবল বা সরঞ্জামের ঘাটতি থাকলে লাগেজ সরবরাহে বিলম্ব, ভুল বাছাই কিংবা ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
লাগেজ পেতে ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা : লাগেজ হারানো বা চুরির পাশাপাশি উড়োজাহাজ থেকে নামার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ব্যাগ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে যাত্রীদের। ৭ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষার অভিযোগ উঠে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
যাত্রীদের সচেতন করার উদ্যোগ : লাগেজের নিরাপত্তায় যাত্রীদের সচেতনতার বিষয়টিও কমিটির সুপারিশে স্থান পেয়েছে। নিষিদ্ধ সামগ্রী ও বিপজ্জনক পণ্য বহনের নিয়ম মেনে চলা, ব্যাগের তালা ঠিকভাবে বন্ধ রাখা এবং ভঙ্গুর সামগ্রী যথাযথভাবে মোড়কজাত করা, ব্যাগে নাম ও যোগাযোগের তথ্য রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। লাগেজ গ্রহণের পর কোনো ক্ষতি চোখে পড়লে বিমানবন্দর ত্যাগ করার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস বা লাগেজ সার্ভিস ডেস্কে অভিযোগ জানানো ভালো। অভিযোগের রেফারেন্স নম্বর ও প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করলে পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ সহজ হয়। এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্যপ্রচার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সমন্বিত লাগেজ ট্র্যাকিং : আধুনিক বিমানবন্দরে লাগেজ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় বারকোড, রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি (আরএফআইডি), স্বয়ংক্রিয় বাছাইব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবহার করা হয়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে লাগেজ সঠিক ফ্লাইটে পাঠানো, পরিবহনের বিভিন্ন ধাপে অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া এবং ভুল গন্তব্য চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সুপারিশে বলা হয়, শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজসংক্রান্ত অভিযোগ যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি বিমানবন্দরের সেবার মান ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। ৩৬টি এআই ক্যামেরা স্থাপন এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে শুধু ক্যামেরা স্থাপন যথেষ্ট নয়। সেগুলোর কার্যকারিতা, তথ্য সংরক্ষণ, অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে।
