রক্তের গ্রুপের সঙ্গে শুধু রক্তদানের নয়, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকিরও সম্পর্ক রয়েছে। তবে আপনি কী জানেন রক্তের গ্রুপে স্ট্রোকের সম্পর্ক রয়েছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর দেড় কোটিরও বেশি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের শরীর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে অক্ষমতা দেখা দেয়।
স্ট্রোক অনেক সময় আকস্মিকভাবে ঘটে, ফলে রোগী বিপদ বুঝে ওঠার আগেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে যেতে পারে। এ কারণে স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায় খুঁজতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকির যোগসূত্র থাকতে পারে। বিশেষ করে কিছু রক্তের গ্রুপের মানুষের কম বয়সে স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ব্রেন স্ট্রোকের সম্ভাব্য সম্পর্ক উঠে এসেছে। গবেষকদের ধারণা, এই যোগসূত্র সম্পর্কে জানা গেলে ভবিষ্যতে স্ট্রোকের ঝুঁকি চিহ্নিত করা ও প্রতিরোধের কৌশল নির্ধারণে তা কাজে লাগতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো কোন রক্তের গ্রুপের মানুষের স্ট্রোকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণা অনুযায়ী, ‘এ’ রক্তের গ্রুপের মানুষের কম বয়সে স্ট্রোকের আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, ‘ও’ গ্রুপের মানুষের ঝুঁকি কম।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষণার ফল অনুযায়ী, ‘এ’ রক্তের গ্রুপের মানুষের অল্প বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে A1 উপগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে, ‘ও’ গ্রুপের মানুষের ঝুঁকি ১২ শতাংশ কম।
১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী ১৭ হাজার স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়। পরে আরও ছয় লাখ মানুষের ওপর বিশ্লেষণেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়।
‘এ’ গ্রুপে ঝুঁকি বেশি কেন?
গবেষকদের ধারণা, ‘এ’ গ্রুপের রক্তে কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য ও প্রোটিন—যেমন Von Willebrand Factor এবং Factor VIII—রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ইসকেমিক স্ট্রোক হতে পারে।
স্ট্রোক কত ধরনের?
স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের—
ইসকেমিক স্ট্রোক: রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়।
হেমারেজিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে
হঠাৎ শরীরের এক পাশের হাত বা পা অসাড় হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, দৃষ্টিতে সমস্যা, চোখে ঝাপসা বা অন্ধকার দেখা এবং ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
এসব উপসর্গ কয়েক মিনিটের জন্য দেখা দিয়ে সেরে গেলেও অবহেলা করা উচিত নয়। এটি টিআইএ (TIA) বা মিনি স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা উপসর্গ শুরুর প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া গেলে উপকার পাওয়া যেতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে করণীয়
রক্তের গ্রুপ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়। এ জন্য—
- নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখুন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।
- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ধূমপান এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণ গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
রক্তের গ্রুপ স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তবে এটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। জীবনযাত্রা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে নজর রাখাও জরুরি।
