চাঁদাবাজির শিকার হয়েও ভয়ে মামলা করতে চান না অনেকে। এই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় চাঁদাবাজি প্রতিরোধে আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মামলা করতে না চাইলেও পুলিশ যেন নিজেই বাদী হয়ে মামলা করতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখার চিন্তা করা হচ্ছে।
এ জন্য বিদ্যমান দণ্ডবিধি সংশোধন অথবা চাঁদাবাজি প্রতিরোধে পৃথক আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার। একই সঙ্গে চাঁদা আদায়কারী ও তাঁদের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের শনাক্ত করতে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যামেরায় ধারণ করা অডিও-ভিডিও আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ১৩ আগস্টের বৈঠকে এসব পরিকল্পনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ। গতকাল বৃহস্পতিবার কমিটির বৈঠকে ওই কার্যবিবরণী উপস্থাপন করা হয়।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, চাঁদাবাজির ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো ব্যক্তি ভয়ের কারণে মামলা করতে পিছিয়ে গেলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি শাস্তির বিধান আরও কার্যকর করার বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।
চাঁদাবাজির অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা যেন সামান্য শাস্তি পেয়ে কিংবা জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়াতে না পারেন, সে বিষয়েও আইনি সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোবাইল কোর্টে লঘু শাস্তির পরিবর্তে কঠোর সাজা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
১৪৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর
এদিকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থার তথ্য সংসদীয় কমিটিতে তুলে ধরেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘটনায় সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসর দেওয়া হয়েছে। অন্য পরিদর্শকদের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘পলায়নের অভিযোগে’ বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে অথবা চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলছে।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্য আটজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি, সিআর ও আইসিটি মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের দিন থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিআইজি পদমর্যাদার দুজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
ধর্ষণ ও মাদকের মামলা বেড়েছে
সংসদীয় কমিটির বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসের অপরাধসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ধর্ষণ, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, সিঁধেল চুরি ও সাধারণ চুরির ঘটনায় মামলা বেড়েছে। অন্যদিকে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা কমেছে। পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
তবে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র উঠে এসেছে। এ বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।
বৈঠকে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা কমিটিকে জানানো হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির একজন নারী সংসদ সদস্য দলীয় প্রধানের নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন।
মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
রাজধানীতে সাম্প্রতিক অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম ও অগ্রগতি তুলে ধরেন।
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ এবং কমিটির অন্যান্য সদস্য অংশ নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় আসক্ত করার অভিযোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ১৩ আগস্টের বৈঠকে মাদকের বিস্তার নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, বেকারত্বের কারণে যুবসমাজের মধ্যে মাদকাসক্তি বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়াশোনার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় অভ্যস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মাদক প্রতিরোধে কার্যকর নীতি গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের সচেতন করতে উদ্বুদ্ধকরণমূলক কর্মসূচি চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এমএ
