মাছের হাটের সেই চিরচেনা হাঁকডাক এখনো আছে। বিক্রেতাদের সামনে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের মাছ। কোনোটি জ্যান্ত, কোনোটি বরফে ঢাকা। রুই-কাতলা ও মৃগেলের পাশে আছে চিংড়িও। দেশি মাছের সঙ্গে দেখা মিলছে সামুদ্রিক মাছও। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতারা দেখছেন আর চলছে দর–কষাকষি। কেনা মাছ কেউ ব্যাগে ভরছেন, কেউ নিয়ে যাচ্ছেন কাটাতে। পটিয়ার ঐতিহ্যবাহী থানার হাটে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মাছ ব্যবসায়ীদের চলে এই ব্যস্ততা।
সজল দাসের দোকানে মাছ রাখার আয়োজন একটু আলাদা। পাশের পুকুরে জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে মাছ। দোকানে এক দফা বিক্রি শেষ হলে সেখান থেকে তোলা হয় আরেক দফা। পুকুর থেকে দোকান, তারপর ক্রেতার ব্যাগ—জ্যান্ত মাছের এই যাত্রা চলে হাটবারজুড়ে।
লোকমুখে প্রচলিত, ‘পটিয়ার যেখানে পানি, সেখানে মাছ।’ গ্রামে গ্রামে পুকুরে মাছ চাষের বিস্তার যেন সেই কথারই ছবি। থানার হাট সেই উৎপাদনের একটি ব্যস্ত বিক্রয়কেন্দ্র। তবে স্থানীয় মাছের পাশাপাশি বাইরের এলাকার ও সামুদ্রিক মাছও আসে। নানা উৎসের সরবরাহে জমে উঠেছে বড় এই মাছের বাজার।
পটিয়া পৌর এলাকায় রেলস্টেশনের পাশে বসে থানার হাট। প্রতি সোম ও শুক্রবার এখানে মাছের দোকান বসে ১০০টির বেশি। থানার হাট পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আনুমানিক হিসাবে, এক হাটবারেই এক কোটি টাকার বেশি মাছ বিক্রি হয়। শুধু মাছ কাটার কাজেই যুক্ত আছেন শতাধিক শ্রমিক।
নানা উৎসের মাছ এক হাটে
পটিয়ার জলাশয় ঘিরে বহু মানুষের জীবিকা। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখানে মৎস্যচাষি রয়েছেন ৩ হাজার ৪৩০ জন। মৎস্য খামার ১৭৬টি। খামারগুলোর মোট আয়তন ২৯৯ দশমিক ৫৫ হেক্টর। মাছ বড় করার পাশাপাশি পোনা উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। নার্সারি পুকুর ৮০১টি, মাছ চাষী ২০২ জন। সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি একটি করে।
মৎস্য কার্যালয়ের হিসাবে, পটিয়ায় বছরে মোট মাছ উৎপাদিত হয় ১০ হাজার ৯৭৭ টন। চাহিদা ১০ হাজার ৯৫০ টন। উদ্বৃত্ত থাকে ২৭ টন। এই স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে বাইরের সরবরাহ যুক্ত হয়ে থানার হাটের চাহিদা পূরণ হয়।
হাটে স্থানীয় দেশি প্রজাতির মাছ শিং, ট্যাংরা, পাবদা, কই, শোল, গজার ও টাকির পাশাপাশি মেলে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ নানা মাছ। সামুদ্রিক মাছ আসে চট্টগ্রাম নগরের ফিশারিঘাট থেকে। ট্রাকে পৌঁছানো সেই চালান ক্রেতাদের সামনে পছন্দের পরিসর আরও বাড়িয়ে দেয়। সজল দাস জানান, দেশি মাছের চাহিদা বেশি। গ্রামের অনেক বাঁধা ক্রেতা আছেন তাঁর। প্রতি হাটবারে এসে পছন্দের মাছ কিনে নিয়ে যান।
অন্যদিকে মো. মোবারকের দোকানে সামুদ্রিক মাছের সমাহার। সুরমা, লইট্টা, টুনা, লাক্ষা, কোরালসহ নানা মাছ রাখেন তিনি। মোবারক জানান, পটিয়ায় সামুদ্রিক মাছের চাহিদাও ভালো। দিনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেন তিনি। কোনো কোনো দিন বিক্রি ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বিয়ের মৌসুমে বাড়ে ব্যস্ততা
আবু তাহের প্রায় ৩৫ বছর ধরে থানার হাটে মাছ বিক্রি করেন। সামুদ্রিক ও দেশি—দুই ধরনের মাছই রাখেন। উৎসবের সময়ে হাটে ক্রেতার সমাগম ও বিক্রি বেশি হচ্ছে বলে জানান তিনি। আবু তাহের জানান, বিয়ের মৌসুমে ব্যস্ততা বেশি হয়। কোনো কোনো দিন দুই থেকে তিন লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেন। সংসারের সাপ্তাহিক বাজারের সঙ্গে অনুষ্ঠানের বড় কেনাকাটা যুক্ত হলে বিক্রিও বাড়ে।
এমন ছোট-বড় বিক্রি মিলিয়েই এক হাটবারের কোটি টাকার হিসাব। পৃথক বিক্রেতাদের বেচাকেনার তথ্য ধরে ব্যবসায়ী সমিতি আনুমানিক অঙ্কটি করেছে। এই মাছ কেনা, পরিবহন ও বিক্রির খরচ মেটানোর পর ব্যবসায়ীদের হাতে লাভ থাকে।
সমিতির অর্থ সম্পাদক মোরশেদুল আলম প্রথম আলোকে জানান, মাছের জন্য দক্ষিণ চট্টগ্রামে এই হাটের পরিচিতি রয়েছে। হাটের শুরু থেকেই নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। সময়ের সঙ্গে বৈচিত্র্য বেড়েছে। এখন মাছ বিক্রি ও কাটার কাজ ঘিরে বহু মানুষের রোজগার হচ্ছে।