ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আদালত অবমাননার অভিযোগে প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। মামলাটির কেন্দ্রে ছিল তার করা দুটি টুইট, যা ঘিরে প্রায় এক মাস ধরে গোটা ভারতে তীব্র বিতর্ক ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি ঘটেছিল করোনাভাইরাস মহামারির এক ভয়াবহ সময়ে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর আতঙ্কে বিপর্যস্ত ভারত তখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতির কারণে সুপ্রিম কোর্টও ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচারকার্য পরিচালনা করছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নানা মামলা তখন শুনানির অপেক্ষায় ছিল।
এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে আদালত অবমাননার মামলাটিকে সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে, প্রশান্ত ভূষণের ওই দুটি টুইটকে কেন্দ্র করে আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা গ্রহণের বিষয়টি জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ফলে মামলাটি কেবল আদালত অবমাননার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিচার বিভাগের সমালোচনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আদালতের মর্যাদা রক্ষার সীমারেখা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়।
প্রথম টুইটে প্রশান্ত ভূষণ লিখেছিলেন, “ভবিষ্যতে যখন ইতিহাসবিদেরা পেছন ফিরে তাকাবেন এবং দেখবেন, আনুষ্ঠানিক জরুরি অবস্থা জারি না থাকলেও গত ছয় বছরে ভারতে কীভাবে গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, তখন এই ধ্বংসযজ্ঞে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা, বিশেষত বিগত চারজন প্রধান বিচারপতির ভূমিকার দিকে তারা নিশ্চয়ই নজর দেবেন।”
দ্বিতীয় টুইটে তিনি লিখেছিলেন, “এমন এক সময়ে, যখন সুপ্রিম কোর্ট লকডাউন জারি রেখে নাগরিকদের বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে, তখন প্রধান বিচারপতি নাগপুরের রাজভবনে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেলে চড়েছেন, যার মালিক একজন বিজেপি নেতা। তাঁর মুখে মাস্ক ছিল না, মাথায়ও ছিল না হেলমেট।”
এই দুটি টুইটের মধ্য দিয়ে প্রশান্ত ভূষণ বিচার বিভাগের সমালোচনা করেছিলেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিচার বিভাগের ভূমিকা, জবাবদিহি এবং নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন। সমালোচনার ভাষা ও তীব্রতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু বিচার বিভাগের সমালোচনা করলেই যে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, এমন ধারণা কোনোভাবেই প্রশ্নাতীত হতে পারে না।
দুর্দশা আর মর্যাদা এক বিষয় নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, ব্যর্থতা কিংবা নৈতিক সংকটের দিকে আঙুল তোলা সেই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ধ্বংস করার সমার্থক নয়। বরং আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই একটি প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারে। প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যকে সেই আত্মসমালোচনার আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করা যেত। কিন্তু তাকে পুরস্কৃত করার পরিবর্তে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিল সেসময়।
পৃথিবীতে চলার পথ মূলত দুটি— একটি সত্যের, অন্যটি মিথ্যার। সত্যের পথ কখনোই মসৃণ নয়। সত্যকে এমনিতেই অর্জন করা যায় না; একের পর এক হোঁচট খেতে খেতে, অপমান ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হতে সত্যের পথে এগিয়ে যেতে হয়। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য অনেক সময় অপমান দিয়ে চুকাতে হয়; কিন্তু সেই অপমান সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করতে পারে না। প্রশান্ত ভূষণের অবস্থান আমাদের সেই চিরন্তন সত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
এ ঘটনার পর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের চারজন বিচারপতি প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন করে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নৈতিকতার মান ও পক্ষপাতিত্বসংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। বারতের বিচার বিভাগের ইতিহাসে ঘটনাটি ছিল বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ। বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ সংকট যখন বিচারপতিদের নিজেদের বক্তব্যেই প্রকাশ্যে এসেছিল, তখন প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহি ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে একই ধরনের স্বতঃপ্রণোদিত আদালত অবমাননার পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এ থেকে বিচার বিভাগের জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা এবং সমালোচনার প্রতি সহনশীলতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলা যায়। নিজেদের আচরণ ও সিদ্ধান্তের নৈতিক মূল্যায়ন করার দায়িত্ব বিচার বিভাগেরও রয়েছে। বিচারপতিরা আইনের ব্যাখ্যাকারী হলেও তারা আইনের ঊর্ধ্বে নন; তাদের আচরণও নৈতিক নিরীক্ষার আওতাভুক্ত।
বিচার বিভাগের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে বিচার বিভাগ অসন্তুষ্ট বা ক্রুদ্ধ হতে পারে না। কারণ, বিরাগ বা অনুরাগের বশবর্তী হয়ে রায় দেওয়া বিচারকদের জন্য নিষিদ্ধ। বিচারকের দায়িত্ব ব্যক্তিগত অসন্তোষের প্রতিকার করা নয়; বরং নিরপেক্ষতা, যুক্তি ও আইনের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ নানা রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন যখন বিচারাধীন ছিল, তখন আদালত অবমাননার মামলায় দ্রুত অগ্রসর হওয়া বিচার বিভাগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছিল। তবে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিজে থেকেই ক্রোধ বা অসন্তোষের প্রমাণ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা, ন্যায়সংগত অগ্রাধিকার এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটেছিল কি না।
আদালতের কর্তৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই কর্তৃত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ন্যায়বিচার ও বিবেকের স্বাধীনতা। সত্য উচ্চারণের অপরাধে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে সত্যের নৈতিক শক্তিকে পরাজিত করা যায় না; বরং প্রশ্নবিদ্ধ হয় কর্তৃত্বের নৈতিক ভিত্তি।
বিচার বিভাগের মর্যাদা কোনো বিমূর্ত অহংবোধের নাম নয়। এর ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা। যে প্রতিষ্ঠান সমালোচনার মুখোমুখি হতে অস্বীকার করে, সে প্রতিষ্ঠান নিজের দুর্বলতা সংশোধনের সুযোগও হারায়।
প্রশান্ত ভূষণের টুইট দুটির অন্তর্নিহিত বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল— যখন লকডাউনের কারণে নাগরিকদের বিচারপ্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছিল, তখন প্রধান বিচারপতির প্রকাশ্য আচরণও নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে। তার মোটরসাইকেলে চড়া, মাস্ক না পরা কিংবা হেলমেট ব্যবহার না করার বিষয়গুলোকে ভূষণ বিচার বিভাগের নৈতিক অবস্থান ও জনজবাবদিহির বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
প্রধান বিচারপতি কোনো অবস্থাতেই আইনের ঊর্ধ্বে নন। তার পদ যত উচ্চই হোক, ব্যক্তিগত আচরণও আইন ও নৈতিকতার সাধারণ মানদণ্ডে মূল্যায়নযোগ্য। পদমর্যাদা কাউকে আইনের প্রয়োগ থেকে অব্যাহতি দেয় না। বিচারপতিরাও অপার্থিব জগতের বাসিন্দা নন যে তাদের ক্ষেত্রে কোনো ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে না কিংবা কোনো আইনের প্রয়োগ হবে না।
মাস্কবিহীন চলাফেরা এবং হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালানোর মতো আচরণ পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধির ওপর নির্ভর করে জননিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত দায়িত্বের প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। জনজীবনের সংকটকালে একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ, নেতৃত্বের নৈতিকতা কেবল বক্তব্যে নয়, ব্যক্তিগত আচরণেও প্রকাশিত হয়।
জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই মানুষ নৈতিক আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা চালায় এবং নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিশীলিত করে। নিজের আচরণকেও নৈতিক নিরীক্ষার সামনে উপস্থাপন করতে হয়— এই সহজ সত্যটি অনেক সময় ক্ষমতার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা বিস্মৃত হন।
কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জবাবে সমালোচককে শাস্তি দেওয়া সেই প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত করে না। শাস্তির মাধ্যমে কারও নৈতিকতার স্তর উন্নীত করা যায় না। বরং নৈতিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভুল স্বীকার করার সাহস।
রাষ্ট্র যখন সমালোচনাকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, তখন তার মধ্যে নিপীড়নমূলক প্রবণতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আদালতের ক্ষেত্রেও সেই বিপদ এড়ানো জরুরি। বিচার বিভাগের ক্ষমতা মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার সুরক্ষার জন্য; সমালোচনার কণ্ঠ রুদ্ধ করার জন্য নয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি বড় অংশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার বহন করে। ব্রিটিশ শাসনামলে টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ১৮৩০-এর দশকে ভারতীয় আইন কমিশনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার সময়ে যুক্ত দুটি ঐতিহাসিক ক্ষেত্র হলো- দণ্ডবিধির সংকলন এবং ইংরেজি শিক্ষানীতি। ১৮৩৫ সালের শিক্ষানীতিতে তার ভূমিকা এবং ১৮৬০ সালের ভারতীয় দণ্ডবিধির খসড়া প্রণয়নে তার নেতৃত্ব উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা ও শাস্তিব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত; অন্যটি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দুই ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসন কেবল ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি, মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বিরোধী কণ্ঠকে নীরব করে দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং ভিন্নমত ও সমালোচনাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার সক্ষমতায় নিহিত। যে রাষ্ট্র নাগরিকের বিবেককে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
স্বাধীনতার পরও উপমহাদেশের বহু আইন, রীতি ও প্রশাসনিক প্রথা ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। তবে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত প্রতিটি আইন বা প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে নিপীড়নমূলক বলা যায় না; স্বাধীন রাষ্ট্রে এসব আইন ও প্রতিষ্ঠানের চরিত্র নির্ধারিত হয় তাদের প্রয়োগ, ব্যাখ্যা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে।
প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার বহনকারী কোনো আইন বা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির পরিপন্থি হয়ে উঠলে তাকে সংস্কার করা হবে কি না। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল শাসকের পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের নৈতিক রূপান্তর।
আদালত অবমাননাসংক্রান্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের কর্তৃত্ব ও বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা রক্ষা করা প্রয়োজন; কিন্তু সেই কর্তৃত্বের ব্যবহার যেন ন্যায়সংগত সমালোচনাকে দমন করার উপায়ে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
সমালোচনার অধিকার দিলে সংবিধানের মর্যাদা বাড়ে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। তাহলে বিচার বিভাগের সমালোচনা কেন তার মর্যাদা ধ্বংসের কারণ হবে? আদালত কোনো স্বর্গীয় প্রতিষ্ঠান নয় যে তার কোনো ন্যায়সংগত সমালোচনা করা যাবে না। বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার সর্বোত্তম উপায় সমালোচনাকে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং সমালোচনার জবাব দেওয়া যুক্তি, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে।
আদালত অবমাননার মামলায় রায় দেওয়ার সময় আইনগত প্রশ্নের পাশাপাশি বিবেক ও নৈতিকতার সঙ্গেও বিচারককে বোঝাপড়া করতে হয়। কারণ, আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; তা জনগণের চোখে বিচার বিভাগের নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন।
শাস্তি প্রদানকেই যদি নৈতিক কর্তব্যবোধের চূড়ান্ত প্রকাশ বলে মনে করা হয়, তবে ন্যায়বিচারের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য আড়াল হয়ে যায়। একটি ন্যায়সংগত কাজকে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে কর্তব্য সম্পাদনের দাবি করা কোনো নৈতিক আত্মতৃপ্তির বিষয় হতে পারে না।
কর্তৃত্বের বহিঃপ্রকাশ যত কঠোর হয়, তার অন্তর্নিহিত নৈতিক দৃঢ়তাও তত বেশি— এমন ধারণার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং যে কর্তৃত্ব যুক্তি ও ন্যায়ের ওপর নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তা অনেক সময় শাস্তি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে চায়।
প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিচার বিভাগের আত্মসমীক্ষার আহ্বান। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা যখন জরুরি অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি না থাকা সত্ত্বেও ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অবক্ষয় পর্যালোচনা করবেন, তখন তারা সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন। বিশেষত বিগত চারজন প্রধান বিচারপতির ভূমিকা তাদের অনুসন্ধানের বিষয় হবে কি না, সেই প্রশ্ন তিনি সামনে এনেছিলেন।
এই বক্তব্যের মধ্যে বিচার বিভাগের ভূমিকা ও মর্যাদা পুনর্বিবেচনার একটি আহ্বান নিহিত ছিল। জাতি যখন চরম দুর্ভাগ্য ও দুর্দশার মুখোমুখি, তখন গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য বিচার বিভাগ কী ভূমিকা পালন করেছে— এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা নাগরিকের অধিকার। সরকারের অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা ভয়ভীতির কাছে নতি স্বীকার করা বিচার বিভাগের কাম্য হতে পারে না।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো অন্যায়, অবিচার বা ধ্বংসযজ্ঞ নেই, যার পক্ষে রাষ্ট্রের কর্তব্য কিংবা বৃহত্তর স্বার্থের অজুহাত দাঁড় করানো হয়নি। কিন্তু রাষ্ট্রের নামে সংঘটিত হলেই কোনো কাজ ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। প্রজাতন্ত্রের জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও ন্যায়বিচারের যে আমানত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত থাকে, কোনো প্রতিষ্ঠানই সেই আমানত আত্মসাৎ করতে পারে না। আমানতের খেয়ানতকারীরাই শেষ পর্যন্ত জাতির আত্মমর্যাদা বিনষ্ট করে।
প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যের জবাবে শতাধিক পৃষ্ঠার রায় দিয়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা আদালতের আইনগত অবস্থান প্রকাশ করতে পারে; কিন্তু রায়ের দৈর্ঘ্য বা শাস্তির কঠোরতা নিজেরাই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়। নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা হলো— ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান নিজের সমালোচনা কতটা সহ্য করতে পারে এবং যুক্তিসংগত প্রশ্নের মুখোমুখি হলে কতটা আত্মসমালোচনায় সক্ষম হয়।
‘সদা সত্য কথা বলিবে’— এই নীতিবাক্য উচ্চারণের পর কেউ অসত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, এমন অভিযোগ তুলে তাকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণ করে কি না, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানুষের মর্যাদা তার বিবেক, যুক্তি ও নৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অযৌক্তিক অজুহাতের আশ্রয় নিয়ে কর্তৃত্বের মনোবৃত্তি থেকে মানুষকে অমর্যাদার আওতায় নিয়ে আসা কোনো কৃতিত্বের কাজ নয়।
প্রশান্ত ভূষণ তার বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্র, সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বিচার বিভাগের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল— এমনটাই তার অবস্থানের মূল তাৎপর্য। তার বক্তব্যকে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে ভারতে তীব্র বিতর্ক চলছিল।
কান্টের নীতিদর্শনে নৈতিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে। মানুষের স্বাধীনতা কেবল নিজের ইচ্ছা পূরণ করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যুক্তি ও নৈতিক বিধির ভিত্তিতে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও স্বাধীনতার অংশ। মানুষ যখন কেবল প্রবৃত্তি বা ব্যক্তিগত স্বার্থের অনুসরণ না করে নৈতিক কর্তব্যবোধের নির্দেশে কাজ করে, তখনই সে প্রকৃত অর্থে নৈতিক স্বাধীনতার পরিচয় দেয়।
সভ্যতার অন্যতম আবশ্যিক শর্ত হলো স্বাধীন মানুষ। আর স্বাধীন মানুষই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যে সমাজে মানুষ নিজের বিবেকের নির্দেশে সত্য উচ্চারণ করতে পারে না, সেখানে স্বাধীনতার ধারণা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
আদালতে ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে নিজের বিবেকের অবস্থান স্বীকার করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রশান্ত ভূষণ তার নৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমা চাইলে তিনি নিজের বিবেকের কাছে অসম্মানিত হবেন এবং তার মতে, তাতে সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
তার এই অবস্থানকে সমর্থন করা বা সমালোচনা করা— দুটিই সম্ভব। কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: ক্ষমা চাওয়া বা না-চাওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত কৌশলের প্রশ্ন নয়; কখনো কখনো তা ব্যক্তির নৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত থাকে। প্রশান্ত ভূষণের কাছে নিজের বিবেকের নির্দেশ অস্বীকার না করাটিই ছিল তার অবস্থানের মূল ভিত্তি।
মানুষ যখন নিজের নৈতিক কর্তব্যবোধের মধ্যে আত্মার প্রকাশ ও বিকাশ দেখতে পায়, তখন সে সাহসী হয়ে ওঠে। রাজদণ্ডের ভয়, সামাজিক নিন্দা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা তার বিবেকের অবস্থানকে সহজে পরাস্ত করতে পারে না। অন্যের অধিকার ও বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষার জন্য নিজের ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করার মধ্যেই নৈতিক সাহসের পরিচয় মেলে।
প্রশান্ত ভূষণের অবস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকার নাম নয়; বরং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার ক্ষমতাও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মর্যাদা শেষ পর্যন্ত মানুষের নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনো প্রতিষ্ঠানের পদমর্যাদা, ক্ষমতা কিংবা শাস্তি প্রদানের সামর্থ্য তার নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। ন্যায়পরায়ণতা, যুক্তিশীলতা, আত্মসমালোচনা ও মানবিকতার ভিত্তিতেই একটি প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত মর্যাদা অর্জন করে।
যেসব রাষ্ট্র আদর্শবাদ, ন্যায়পরায়ণতা ও যুক্তিশীলতাকে উপেক্ষা করে কর্তৃত্ববাদ ও নিপীড়নের দিকে অগ্রসর হয়, সেখানে প্রশান্ত ভূষণের মতো ব্যক্তিদের অবস্থান বিবেকের স্বাধীনতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের ভাবতে শেখায়— সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য কতটা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষায় নৈতিক সাহসের ভূমিকা কতখানি।
মানবতাবাদী দার্শনিক ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আলবার্ট সোয়াইটসার নৈতিকতাকে সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তার চিন্তার মূলে ছিল জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। তার দর্শনের আলোকে বলা যায়, বিশ্ব ও জীবনের অর্থ নিয়ে গভীর নৈতিক চিন্তা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে পারে। সেই জাগরণ অন্যায়, সহিংসতা ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি জোগায়।
বিচার বিভাগ যখন ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, বিচার বিভাগের অন্যতম দায়িত্ব হলো ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই জনগণের আস্থার ঊর্ধ্বে নয়; বরং জনগণের আস্থাই তার বৈধতা ও নৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস।
প্রখ্যাত দার্শনিক জ্যঁ-জাক রুশো তার দ্য সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট গ্রন্থের শুরুতে লিখেছিলেন, ‘ম্যান ইজ বর্ন ফ্রি, অ্যান্ড এভরিহোয়্যার হি ইজ ইন চেইনস’—অর্থাৎ, মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে, অথচ সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত। রুশোর এই বক্তব্য মানুষের স্বাধীনতা ও সামাজিক কর্তৃত্বের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। যে মানুষ নিজেকে অন্যের প্রভু মনে করে, সে নিজেও প্রভুত্বের কাঠামোর দাসে পরিণত হতে পারে।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব যখন নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষার পরিবর্তে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়ে পরিণত হয়, তখন সামাজিক চুক্তির নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একইভাবে, আদালতের কর্তৃত্ব যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে ন্যায়সংগত সমালোচনাকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন বিচার বিভাগের সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সুতরাং আদালত অবমাননা বনাম বিবেকের স্বাধীনতার বিতর্ক কেবল প্রশান্ত ভূষণের দুটি টুইট কিংবা একটি নির্দিষ্ট আদালতের রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও ব্যক্তির স্বাধীনতার সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও জবাবদিহির দ্বন্দ্ব, আইন ও নৈতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সত্য উচ্চারণের অধিকার।
বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার নামে যদি বিবেকের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা হয়, তবে সেই মর্যাদার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। আর সমালোচনার অধিকারকে স্বীকৃতি দিলে বিচার বিভাগ নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ পায়, সংবিধানের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।
রাষ্ট্র যত দ্রুত এই সত্য উপলব্ধি করতে পারবে, তত দ্রুত তার নৈতিক ও মানবিক রূপান্তরের পথ প্রশস্ত হবে। কারণ, স্বাধীনতা ছাড়া বিবেকের বিকাশ হয় না, নৈতিকতা ছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না, আর ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে উঠতে পারে না।
লেখক: শহীদুল্লাহ ফরায়জী
গীতিকার, ঢাকা বাংলাদেশ
