শনিবার (১০ অক্টোবর) হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন। এটি এমন এক আঞ্চলিক সংঘাতের এক উল্লেখযোগ্য মোড়, যা কেবল তীব্রতরই হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর, এটিই ছিল কোনো উপসাগরীয় দেশের ওপর সবচেয়ে মারাত্মক আক্রমণ।
সৌদি আরবের মতো একটি দেশ, যেখানে এ ধরনের প্রাণহানির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, সেখানকার এই উচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা অবাক করার মতো। আর এই ঘটনা রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের দিকে এগোতে পারে।
গত এক বছর ধরে, উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীলতার এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে যা সামরিক নয় এবং যার কোনো পেছনের দিকে ফেরার সুযোগ নেই। গাজা বা ইরানের ধ্বংসযজ্ঞের তুলনায় এখানকার প্রাণহানি হয়তো কম মনে হতে পারে, তাই বলে একে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে শান্তি ও নিরাপত্তার যে ধারাবাহিক অবনতি ঘটেছে, তা এই অঞ্চলের নেতাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয়ভাবে সবকিছু বদলে দিয়েছে।
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও অকল্পীয় ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এক বছর আগে। ইরান তখন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কাতারে অবস্থিত মার্কিন একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। দোহার আকাশ কাঁপিয়ে ও চারদিকে স্প্রিন্টার ছড়িয়ে দিয়ে ঘটা সেই ঘটনা কাতারিদের জন্য বড় এক ধাক্কা ছিল, কারণ তারা সবসময় ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে। তবে সেবার একটি বিষয় পরিষ্কার ছিল- দুই পক্ষের পূর্বসতর্কতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে ইরান মূলত নিজেদের মান বাঁচানোর জন্যই ওই প্রতীকী হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এরপরে, ২০২৫ সালের শেষের দিকে কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ইসরায়েল দোহায় হামলা চালায়। তাদের টার্গের ছিল হামাস নেতারা এবং ওই হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি ও এক কাতারি নাগরিক নিহত হন। সেটিই ছিল দীর্ঘদিনের এক নিয়ম ও বিশ্বাসের সমাপ্তির সূচনা- যে উপসাগরীয় অঞ্চলের জীবন ও সার্বভৌমত্বের এক পবিত্রতা আছে, যা ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতার মাধ্যমে সুরক্ষিত।
এরপর এলো ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধ, যা উপসাগরীয় অঞ্চলকে পুরোপুরি এই সংঘাতে জড়িয়ে ফেলল। ইরান মনে করে, এই হামলার পেছনে উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক, সামরিক ও লজিস্টিক সমর্থন রয়েছে; আর সেই ক্ষোভের জবাব দিতে তেহরান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানে হামলা চালায়। ইরান সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে- এমন সব পরিকাঠামো, যার ওপর এসব দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। লাগাতার বিমানবন্দর ও আকাশসীমা বন্ধ থাকা, মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ থাকা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যাওয়ায় দেশগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
উপগসাগরীয় শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত আসে অন্য জায়গায়। এই দেশগুলো এতদিন নিজেদের পর্যটন, ব্যবসা, খেলাধুলা এবং বিনোদনের এক চমৎকার বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। ফর্মুলা ওয়ান, গলফ ও বক্সিং টুর্নামেন্টের মতো বড় বড় আয়োজন নিশ্চিত করতে তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে; অথচ সস্তার কিছু ড্রোন এসব অর্জনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
এর ফলস্বরূপ দেখা দিয়েছে এক অন্তদ্বন্দ্ব ও বিভক্তি, যা সুপ্ত থাকা শত্রুগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের শুরু হয়, যখন শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশি অধিকার পাওয়ার দাবিতে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। তাদের হটাতে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট নির্মম সামরিক অভিযান শুরু করে, যা এক দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। এতে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ যায় এবং দেশটিতে চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়। অবশেষে ২০২২ সালে হুথি এবং সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিক সরকারের মধ্যে ইয়েমেন কার্যত দুভাগ হয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধের তীব্রতা কমে আসে এবং সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ নতুন করে রাজনৈতিক সুযোগ ও সমীকরণ তৈরি করায় ইয়েমেনে হুথিরা আরো আগ্রাসী হয়ে ওঠে। যেমন- হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইয়েমেন উপকূলের দিকে ভিড় জমাতে শুরু করে, আর এই সুযোগে হুথিরা লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাব আল-মান্দাব প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন করে এলাকা দখল করতে শুরু করে। যুদ্ধের পাঁচ মাসের মাথায় পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়; সৌদি আরব হুথিদের ওপর বিমান হামলা তীব্র করে এবং সৌদি-সমর্থিত সরকার একটি ইরানি বিমানকে সানায় নামতে বাধা দিতে নিজেদের দেশের বিমানবন্দর নিজেই বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়।
এই ঘটনাগুলোকে কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন বা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। হুথিরা ইরানের মদদপুষ্ট হলেও তারা নিছক কারো পুতুল নয়; তাদের নিজস্ব উচ্চাশা এবং গভীর আঞ্চলিক শত্রুতা রয়েছে- বিশেষ করে সৌদি রাজপরিবারের প্রতি। হুথিরা সৌদিদের এমন এক অহংকারী ও দাপুটে প্রভু বলে মনে করে, যার কাছে তারা কখনোই মাথা নত করবে না। এক জ্যেষ্ঠ হুথি কর্মকর্তা স্পষ্টই বলেন, শনিবারের এই হামলা চালানো হয়েছে ‘যাতে বিশ্ব বুঝতে পারে’ যে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে সৌদিদের হামলার শিকার হচ্ছে এবং রিয়াদ ইয়েমেনিদের জীবনকে কতটা সস্তা মনে করে।
অন্য একটি দিক থেকে দেখলে, অঞ্চলে যা ঘটছে তা মূলত ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া গাজা, লেবানন ও ইরানি সংকটেরই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। ট্রাম্প যখন পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে তার কাছে উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তার চেয়ে নিজের ‘ইরান মিশন’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন এই অঞ্চলের নড়বড়ে নিরাপত্তার শেষ খুঁটিও ভেঙে পড়ে। মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর অন্ধ আস্থার সীমাবদ্ধতা আজ বন্ধু ও শত্রু- উভয় পক্ষই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামরিক সাহায্য দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। কারণ হিসেবে বলা হয়, হুথিরা আমেরিকার সঙ্গে বৈঠক করে আশ্বাস দিয়েছে যে তারা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না, কেবল সৌদি জাহাজেই হামলা চালাবে। ফলে সৌদি আরবের সামনে এখন এক কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ অপেক্ষা করছে। হুথিরা অত্যন্ত নাছোড়বান্দা এবং যেকোনো মূল্যে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা রাখে; কিন্তু সৌদি আরব পুরোপুরি যুদ্ধের পথে না গিয়ে এই দীর্ঘ লড়াই সামাল দিতে পারবে না। ২০১৫ সালের অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ ঝরবে, অথচ চূড়ান্ত কোনো ভালো ফলাফল আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল এখন এক মারাত্মক বিপদের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প এই যুদ্ধ থামাতে পারছেন না, গাজার ক্ষত শুকোচ্ছে না, আর লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন চলছেই। অন্যদিকে হুথিদের এই নতুন উত্থান গোটা অঞ্চলকে হতভম্ব করে দিয়েছে। একদিকে পুরোনো মিত্ররা আর কোনো ভরসা জোগাতে পারছে না, অন্যদিকে নতুন শত্রুদের মোকাবেলা করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল আজ অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকছে।
লেখক: নাসরিন মালিক হলেন দ্য গার্ডিয়ানের একজন কলামিস্ট।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: মনিরুল হক ফিরোজ
