কারও হাতে পদ্মফুল, কারও হাতে ফলমূল ও পূজার উপকরণ। কেউ বুদ্ধমূর্তির সামনে ফুল নিবেদন করছেন, কেউ আবার প্রার্থনার মধ্য দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছেন প্রদীপ। রোববার সকাল থেকেই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। দিনভর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় রঙিন ফানুস ওড়ানোর অপেক্ষায় রয়েছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে নগরের শতবর্ষী নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারসহ বিভিন্ন বিহারে ভোর থেকেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের এলাকা থেকে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সের মানুষ এতে অংশ নেন।
সকালে নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই নতুন পোশাকে বিহার প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন পুণ্যার্থীরা। তাঁদের হাতে ছিল প্রদীপের থালা, গাঁদা ও পদ্মফুল এবং নানা ধরনের ফলমূল। বুদ্ধমূর্তি ও বোধিবৃক্ষের চরণতলে ফুল নিবেদন এবং প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পরে ভিক্ষুদের কাছ থেকে পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করেন ভক্তরা। দিনব্যাপী বিহারের বিভিন্ন কক্ষে ধর্মীয় দেশনা ও বিশ্বশান্তি কামনায় সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন রয়েছে।
বিহারে আসা পুণ্যার্থী তৃপ্তি বড়ুয়া বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ারও দিন। প্রতিবছর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিহারে আসি। প্রার্থনা করি, পৃথিবী থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হোক, সবার জীবন শান্তিময় হোক।’
আরেক ভক্ত দেবাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুস ওড়ানো দেখে আসছি। সত্যি বলতে, পুরো একটি বছর আমরা এই বিশেষ দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। সন্ধ্যায় যখন একসঙ্গে অনেক ফানুস আকাশে ওড়ে, তখন অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে। এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ।’
ফানুস ঘিরে কয়েক মাসের প্রস্তুতি
দিনভর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় প্রবারণা পূর্ণিমার অন্যতম আকর্ষণ ফানুস উৎসব শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ আয়োজন ঘিরে নন্দনকানন বৌদ্ধবিহার ও আশপাশের এলাকায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
প্রচলিত ফানুসের পাশাপাশি হাতি, ময়ূর, মাছ, বালিশ ও মটকার আদলে নানা কারুকার্যময় ফানুস তৈরি করেছেন বিভিন্ন ধর্মীয় ও তরুণ সংগঠনের সদস্যরা। এসব ফানুসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বুদ্ধের অহিংসার বাণী, ছবি এবং মানবকল্যাণের বার্তা।
আয়োজকেরা জানান, এক দিনের এ আয়োজনের প্রস্তুতি চলে কয়েক মাস ধরে। ফানুস তৈরি, বাঁশের কাঠামো নির্মাণ, কাগজ লাগানো, রং করা ও মোম প্রস্তুত—সব কাজেই অংশ নেন সংগঠনের সদস্যরা। এবার ৩০টির বেশি ফানুস তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন আকৃতির আরও ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, উৎসবে প্রায় ৭০টি সংগঠন অংশ নিতে পারে।
আয়োজকদের একজন বলেন, ‘আমরা শুধু ফানুস ওড়াই না, এর মাধ্যমে সবার কল্যাণ কামনা করি। প্রতিটি ফানুসের মধ্য দিয়ে বুদ্ধের অহিংসা, শান্তি ও মৈত্রীর বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই মিলে এ উৎসব উদ্যাপন করি।’
আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমার বার্তা
তিন মাসের বর্ষাবাস পালন শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আত্মশুদ্ধি, সংযম ও পারস্পরিক ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্যাপন করেন। অতীতের ভুল স্বীকার করে অন্যের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করাই এ উৎসবের মূল দর্শন।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রবারণার সন্ধ্যায় ওড়ানো ফানুস আকাশে থাকা বুদ্ধের ‘কেশধাতু চৈত্য’ বা স্মারক চিহ্নের উদ্দেশে ভক্তদের শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে নিবেদন করা হয়।
বৌদ্ধবিহার সূত্রে জানা যায়, প্রবারণা উপলক্ষে পুণ্যার্থীরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা জীবহত্যা, চুরি, মিথ্যাচারসহ অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার শপথ নেন। এ ছাড়া সংঘদান, বুদ্ধপূজা ও পিণ্ডদানের মতো ধর্মীয় আয়োজনও থাকে। হিংসা, বিদ্বেষ ও সংঘাতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা এ উৎসবের অন্যতম বার্তা।
নন্দনকানন ছাড়াও নগরের ঐতিহাসিক কাতালগঞ্জ নবপণ্ডিত বিহার, পাথরঘাটা জেতবন শান্তিকুঞ্জ বিহার, চান্দগাঁও সার্বজনীন বৌদ্ধবিহার ও মোগলটুলী শাক্যমুণি বৌদ্ধবিহারে প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত হচ্ছে।
নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে চেরাগী পাহাড় ও মোমিন রোড এলাকায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম সামাল দেওয়া এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাদাপোশাকের পুলিশসহ অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহেদুল কবির ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে ফানুস উৎসবে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। এ কারণে নিরাপত্তা ও নজরদারির ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হয়নি। সাদাপোশাকের পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সব সময় সতর্ক রয়েছে। তাই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা দেখছি না।’
এসি/আপ্র/২৫/১০/২০২৬
