ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের পাকশিমুল এলাকায় গ্রামবাসী টেঁটা নিয়ে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত বছরের নভেম্বর মাসে শেষদিকে তোলা। ছবি: সংগৃহীত
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলবদ্ধ সংঘর্ষ, ঘরবাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো সহিংস ঘটনায় প্রায়ই খবরের শিরোনাম হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। যুগ যুগ ধরে চলা এসব সহিংসতায় ব্যবহার করা হয় স্থানীয়ভাবে তৈরি টেঁটা, বল্লম ও ফলার মতো দেশীয় মারণাস্ত্র। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে টেঁটার ব্যবহার বেশি হওয়ায় এসব সংঘর্ষ স্থানীয়ভাবে ‘টেঁটাযুদ্ধ’ নামে পরিচিত। তবে তুচ্ছ ঘটনার পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোষ্ঠীগত বিরোধেই বেশি দাঙ্গা বাধে। আর দাঙ্গা চলাকালে প্রতিপক্ষের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগও চালানো হয়।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় নদীর চর ও জমির দখল নিয়ে সংঘর্ষের যে প্রবণতা ছিল, তা কয়েক দশক ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিছু এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য জেলার নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে লাগা দাঙ্গাগুলোতে রায়পুরা থেকে লোক ভাড়া করে আনে বিবদমান গোষ্ঠীগুলো। সম্প্রতি ওই দুই উপজেলার দাঙ্গায় দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও দেখা গেছে। এ ছাড়া রাতের বেলা হওয়া সংঘর্ষগুলোতে টর্চলাইট জ্বালিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হয়।
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, জেলার সরাইল, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, আশুগঞ্জ, নাসিরনগর ও বিজয়নগর উপজেলা সবচেয়ে বেশি দাঙ্গাপ্রবণ। আইন প্রয়োগ করেও সংঘর্ষপ্রবণ এলাকাগুলোতে সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে জেলায় অন্তত সাড়ে তিন হাজার দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১৫ জন। আর আহতের সংখ্যা কয়েক হাজার।
তবে পুলিশের তদন্তে বছরের পর বছর ধরে টেঁটাযুদ্ধ চলতে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে গ্রাম্য সর্দারদের আর্থিক লোভের বিষয়টি উঠে এসেছে।
পুলিশ ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু গ্রাম্য সর্দারের বিরুদ্ধে বিবদমান পক্ষগুলোর বিরোধ জিইয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে। মারামারি করা দুই পক্ষকেই প্রশ্রয় দেন তারা। প্রতিটি দাঙ্গার ঘটনাতেই উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি মামলা করে। এরপর মামলা পরিচালনার খরচের কথা বলে দুই পক্ষের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়। আর এ অর্থের একটি অংশ কিছু সর্দারের কাছে যায়।
আরও পড়ুন
কারা সর্দার গ্রামের প্রত্যেক গোষ্ঠীতেই এক বা একাধিক সর্দার থাকেন। সামাজিক বা গোষ্ঠীগত বিরোধ মীমাংসায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সর্দার হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। তাদের হাতেই থাকে পুরো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ। এ ক্ষেত্রে গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলক শিক্ষিত কেউ এবং গ্রামের স্কুলশিক্ষক ও রাজনৈতিক দলের নেতাকেও সর্দার নির্বাচন করা হয়। আর এলাকায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখা এবং আর্থিক সুবিধা গ্রহণই থাকে সর্দারদের মূল লক্ষ্য।
সরাইল উপজেলার বড়ইচারা গ্রামের বাসিন্দা মো. মনসুর আলী বলেন, দাঙ্গা নির্মূল না হওয়ার প্রধান কারণ গ্রাম্য সর্দারদের অর্থের লোভ। তারাই বিরোধ জিইয়ে রাখেন টাকা উপার্জনের জন্য। প্রতিটি দাঙ্গার ঘটনায় পুলিশ ও আইনজীবীর খরচের কথা বলে দুই পক্ষের কাছ থেকে চাঁদা তোলেন তারা। বেশির ভাগ সর্দারেরই নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস নেই। তারা চাঁদার টাকা দিয়েই চলেন। ফলে দাঙ্গা নির্মূলে সবার আগে সর্দারদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
সরাইল উপজেলা সদরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি পান থেকে চুন খসে পড়লেই সরাইলে দাঙ্গা বাধে। তুচ্ছ সব ঘটনায় নারী-পুরুষ মিলে দাঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। এগুলোর জন্য গ্রাম্য সর্দারদের পাশাপাশি অসাধু কিছু পুলিশ সদস্য দায়ী। এক গ্রামে মারামারি হয়, আর আসামি করা হয় অন্য গ্রামের লোকজনকে। গ্রাম্য সর্দাররা অসাধু পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মিলে মামলা-বাণিজ্য করেন। টাকার বিনিময়ে মামলা থেকে আসামির নাম কাটেন আবার যোগ করেন। এগুলো বন্ধ করতে হবে। পুলিশকে আরও কঠোর হতে হবে। মামলায় অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
যেসব স্থানে টেঁটাযুদ্ধ বেশি হয়
সরাইল উপজেলার বড়ইচারা, পাকশিমুল, অরুয়াইল, টিঘর, কালিকচ্ছ, ধামাউড়া, চুন্টা, কুট্টাপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রতিবছরই দাঙ্গা বাধে। অধিকাংশ দাঙ্গারই সূত্রপাত হয় আধিপত্য বিস্তার ও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধে।
নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ, চাতলপাড়, চাপরতলা, বুড়িশ্বর, আশুরাইল, গোয়ালনগর, শ্রীঘর, ভলাকুট, খাগালিয়া, ঘুজিয়াখাই, ধরমণ্ডল ও আতুকুঁড়ার মতো প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে প্রতিবছরই একাধিক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে।
আশুগঞ্জের চরচারতলা, যাত্রাপুর, দুর্গাপুর, তল্লা, বাহাদুরপুর ও তারুয়া গ্রামও দাঙ্গাপ্রবণ। নবীনগর উপজেলার লক্ষ্মীপুর, নূরজাহানপুর, বীরগাঁও, চরলাপাং, থানাকান্দি, গৌরনগর, সাহেবনগর এবং যশাতুয়া গ্রামে প্রতিবছর ছোট-বড় দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। অনেক সময় থেমে থেমে দুই-তিন দিন ধরে চলে ওই সব এলাকার দাঙ্গা। এ ছাড়া বাঞ্ছারামপুরের ‘শান্তিপুরসহ কয়েকটি গ্রাম দাঙ্গাপ্রবণ।
ভাড়াটে দাঙ্গাবাজ
জেলার নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ভাড়ায় দাঙ্গাবাজ আনা হয় পার্শ্ববর্তী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে। মূলত মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরেই নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার অবস্থান। সম্প্রতি বাঞ্ছারামপুর উপজেলার কয়েকটি দাঙ্গায় বিবদমান গোষ্ঠীগুলো রায়পুরা থেকে ভাড়া করে লোক আনে দাঙ্গার জন্য। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ভোররাতে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। এতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি ব্যবহার হয় আগ্নেয়াস্ত্র। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান জুয়েল মিয়া (২৫) নামে এক যুবক। তার বাড়ি রায়পুরা উপজেলার নিলোখা ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামে। এ ছাড়া গত ৩ অক্টোবর নবীনগর উপজেলার চরলাপাং গ্রামে পূর্ববিরোধের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ জানায়, এক পক্ষ নরসিংদীর রায়পুরা থেকে লোক ভাড়া করে আনে সংঘর্ষের জন্য।
দাঙ্গার অস্ত্র তৈরি হয় কামারের দোকানে
দাঙ্গার জন্য কামারের দোকানে তৈরি করা হয় দেশীয় অস্ত্র। কামারের কাছ থেকে টেঁটা, বল্লম ও ফলা বানিয়ে তা স্থাপন করা হয় চিকন আকৃতির বাঁশের মাথার অংশে। এ জন্য বাঁশও কেনা হয় স্থানীয় বাজারগুলো থেকেই। কামারের দোকানে অনেকটা গোপনীয়ভাবে বেচাকেনা হয় এসব দেশীয় অস্ত্র। যদিও মাঝেমধ্যে পুলিশের অভিযানে জব্দ করা হয় দেশীয় অস্ত্র।
দাঙ্গার আড়ালে সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া মানেই দাঙ্গা–এমন ধারণা তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। দাঙ্গার নেতিবাচকতায় চাপা পড়ছে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, মলয়া সংগীতের জনক মহর্ষি মনমোহন দত্ত, কালজয়ী ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, কবি আল মাহমুদ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত, ভাষাসংগ্রামী শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও অলি আহাদের মতো বহু র্কীতিমানের জন্ম সমৃদ্ধ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসকে।
সংস্কৃতির নানা শাখায়ও আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বতন্ত্র পরিচয়। মঞ্চে কবিতা আর গান দর্শক-শ্রোতাদের নিয়ে যায় ভিন্ন এক জগতে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র সরোদের সুর আর মহর্ষি মনমোহন দত্তের মলয়া সংগীত আজও মুগ্ধ করে সংগীতপ্রেমীদের। এ ছাড়া নবীনগরের বিপিন পালের হাত ধরে এই অঞ্চলে পুতুল নাচ পেয়েছে নতুন মাত্রা।
জিআই স্বীকৃতি পাওয়া ছানামুখী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন। এ ছাড়া সরাইলের হাসলি মোরগ ও গ্রে-হাউন্ড কুকুরও এ অঞ্চলের পরিচিত ঐতিহ্যের অংশ। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তিতাস গ্যাসফিল্ড, আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জ সার কারখানা, আশুগঞ্জ নৌবন্দর ও আখাউড়া স্থলবন্দর।
খেলাঘর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নীহার রঞ্জন সরকার বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলায় দাঙ্গা বাধে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দাঙ্গাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এতে করে সারা দেশে ভুল বার্তা যাচ্ছে যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মানেই দাঙ্গা, এখানকার মানুষজন খারাপ। অথচ আমাদের অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য রয়েছে। এগুলোকে হীন উদ্দেশ্যে আড়াল করে শুধু নেতিবাচক খবরগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’
দাঙ্গা বন্ধে সংস্কৃতি চর্চা বাড়ানোর তাগিদ
দাঙ্গা বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন। এ জন্য দাঙ্গাপ্রবণ এলাকার মানুষজনকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, গ্রাম্য কিছু সর্দার আছেন, যারা নিজেদের স্বার্থে বিরোধ বাধিয়ে রাখেন। কারণ দাঙ্গা হলেই তাদের পকেট ভারী হয়। আর যখন কোনো দাঙ্গা হয়, তখন প্রবাসীরাও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। এই অর্থ লেনদেন বন্ধ হলে দাঙ্গাও অনেকটা নিয়ন্ত্রণ হতো। সহিংসতার পথ থেকে মানুষকে ফেরাতে সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসান ও অর্থ) মো. আরাফাতুল ইসলাম বলেন, দাঙ্গা বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মানস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ দাঙ্গার কারণে মানুষ আর্থসামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ জন্য আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি দাঙ্গাপ্রবণ এলাকাগুলোতে সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় অস্ত্রের অবৈধ বেচাকেনা, মজুত ও সংরক্ষণ বন্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। দাঙ্গা বন্ধে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
