ঢাকার বাসায় জানালার পাশে দাঁড়ালে মাইসুন একটু আকাশ দেখতে পায়। বাকিটা উঁচু দালানের আড়ালে। বাবা-মায়ের সঙ্গে এই শহরেই তার বাস। একদিন বাবা আদিলুর রহমান বললেন, ‘চার দিনের ছুটিতে দাদার বাড়ি যাবে?’
মাইসুন লাফিয়ে উঠল। জামাকাপড়ের সঙ্গে ব্যাগে ঢোকাল রংপেনসিল আর আঁকার খাতা। গন্তব্য মেহেরপুরের গোপিনাথপুর।
তখন আশ্বিন মাস। গ্রামে পৌঁছে মাথার ওপর এত বড় আকাশ দেখে মাইসুনের মনে হলো, কেউ যেন জানালাটা অনেকখানি বড় করে দিয়েছে। ঢাকার গাড়ির হর্নের বদলে এখানে শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক।
চাচাতো ভাই রোশন তার হাত ধরল।
‘চল, তোকে একটা সাদা সমুদ্র দেখাব!’
মাইসুন অবাক। ‘এখানে আবার সমুদ্র কোথায়?’
রোশন শুধু হাসল।
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদী। নদীর পাড়ে পৌঁছে মাইসুনের চোখ বড় হয়ে গেল। যতদূর দেখা যায়, কাশফুল আর কাশফুল! বাতাস লাগতেই ফুলগুলো একসঙ্গে মাথা দোলাচ্ছে।
‘এই তোর সাদা সমুদ্র?’
‘হ্যাঁ! তবে এখানে ঢেউয়ের বদলে ফুল দোলে।’
মাইসুন হেসে কাশবনের পাশে দাঁড়াল। নীল আকাশে কয়েক টুকরো সাদা মেঘ। নদীর স্বচ্ছ জলে সেই মেঘের ছায়া। নিচে ছোট ছোট মাছ ছুটছে।
‘মাছগুলো মেঘের মধ্যে সাঁতার কাটছে!’ মাইসুন বলল।
বিকেলের দিকে মেঘ সরে গেল। দুজন উঁচুপাড়ের ঘাসে বসে মেঘমুক্ত আকাশ দেখল। হালকা রোদ গায়ে লাগছে। বাতাসে কাশফুলের মাথা তাদের দিকে ঝুঁকে আসছে, যেন গোপন কথা বলবে।
মাইসুন ফিসফিস করল, ‘ঢাকায় ফেরার সময় একটু শরৎ নিয়ে যাব।’
রোশন বলল, ‘নিবি কীসে?’
সেটা মাইসুনও জানে না।
রাতে দাদি তালের বড়া ভাজলেন। মিষ্টি গন্ধে মাইসুন রান্নাঘরের দরজায় হাজির।
দাদি বললেন, ‘হাত ধুয়ে আয়। গরম বড়ায় কিন্তু ফুঁ দিতে হবে।’
বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাকছিল। দুজন পাশাপাশি বসে বড়া খেল। একটা বড়া দেখতে একটু বাঁকা। রোশন সেটার নাম দিল ‘চাঁদের নৌকা’। মাইসুন বলল, ‘তাহলে আমি নৌকাটা খেয়ে ফেলছি!’
তাদের হাসিতে দাদিও হেসে উঠলেন।
পরদিন ভোরে রোশনের ডাকে মাইসুন উঠল। উঠানের শিউলিতলায় সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। কমলা বোঁটাগুলো যেন ছোট্ট ছোট্ট রোদের টুকরো। ফুলের সুবাসে ভোরের বাতাস মিষ্টি হয়ে আছে।
শিশিরভেজা ঘাসে পা দিতেই মাইসুন চমকে উঠল।
‘আরে, ঘাসগুলো আমাকে ভিজিয়ে দিল!’
দুজন ঝরে পড়া শিউলি কুড়িয়ে মালা গাঁথল। প্রথমে মাইসুনের মালায় ফুলগুলো উল্টোপাল্টা হচ্ছিল। রোশন দেখিয়ে দিল। শেষে নিজের গাঁথা মালা দাদির হাতে দিয়ে মাইসুন বলল, ‘তোমার চাঁদের নৌকার দাম!’
সকালে দাদা তাদের ফসলের মাঠে নিয়ে গেলেন। এক পাশে সবজির ছোট ছোট জমি। কোথাও গাছ বড় হয়েছে, কোথাও আগাম লাগানো চারা সবে মাথা তুলেছে। দাদা চিনিয়ে দিলেন শিমের লতা, টমেটো আর ক্যাপসিকামের চারা। একটু এগিয়ে দেখালেন মটরশুঁটি, বেগুন ও লাউগাছ। তারপর নিচু হয়ে নতুন আলুগাছের পাতা দেখালেন।
মাইসুন চারদিকে তাকাল। ‘আলু কোথায়? পাতার আড়ালে?’
দাদা হেসে বললেন, ‘আলু হবে মাটির নিচে।’
‘ও! লুকোচুরি খেলবে!’
‘এখন ওদের বড় হতে দিতে হবে। সব সবজি তো একই সময়ে তৈরি হয় না। অনেকগুলোর জন্য শীত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
মাইসুন খাতায় গাছ আঁকল। আলুগাছের নিচে মাটি এঁকে কয়েকটা গোল আলুও বসিয়ে দিল।
দাদা দেখে বললেন, ‘তোর খাতায় তো আগেই ফসল উঠে গেছে!’
এভাবেই দিনগুলো ছুটে চলল। কখনো নদীর পাড়, কখনো উঠানে খেলা, কখনো দাদির কাছে গল্প। তৃতীয় রাতে মাইসুন দাদির কাছে একটা খালি বিস্কুটের বাক্স চাইল।
‘কী রাখবি?’
‘শরৎ।’ দাদি তার কথা শুনে হাসলেন।
পরদিন নদীর পাড়ে গিয়ে সে বাক্সের ঢাকনা খুলে বাতাসে ধরল। তারপর চট করে বন্ধ করল।
রোশন জানতে চাইল, ‘ধরতে পেরেছিস?’
বাক্স খুলে দুজনই তাকাল। কিছুই নেই!
মাইসুনের মুখ ভার হলো। ‘বাতাসও রাখা যায় না!’
বাড়ি ফিরে আঁকার খাতা খুলতেই তার চোখ চকচক করে উঠল। সে ছোট ছোট কাগজে আঁকল ভৈরব নদী, কাশবন, শিউলির মালা আর তালের বড়া। একটা কাগজে লিখল, ‘ঝিঁঝিঁর ডাক’। আরেকটায়, ‘ভোরের ফুলের গন্ধ’।
রোশন আঁকল নিজেদের ছবি। হাতগুলো এত লম্বা হলো যে প্রায় নদী ছুঁয়ে ফেলল। ছবির নিচে লিখল, ‘আবার আসিস।’
সব কাগজ বাক্সে সাজিয়ে মাইসুন ঢাকনা বন্ধ করল।
ফেরার সময় বাবা ডাকলেন, ‘মাইসুন, এবার যেতে হবে।’
মাইসুন বাবার হাতটা ধরে বলল, ‘বাবা, আর একটা দিন থাকি না?’
দাদি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
বাবা মৃদু হেসে বললেন, ‘আবার আসব। কাল যে তোমার স্কুল।’
বাসস্ট্যান্ডে এসে তারা ঢাকার বাসে উঠল। রোশনও এসেছিল মাইসুনকে বিদায় দিতে। বাসটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। রোশন পথের ধারে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। মাইসুন জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাত নাড়তে থাকল। একসময় রোশন ছোট হতে হতে চোখের আড়ালে চলে গেল।
বাবা পাশে রাখা বাক্সটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শেষ পর্যন্ত শরৎ ধরতে পেরেছ?’
মাইসুন বাক্সটা দুহাতে তুলে বুকে চেপে ধরল। একটু হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, আমার চার দিনের শরৎ!’
ঢাকার বাসায় ফিরে জানালার পাশে বসে সে বাক্সটা আবার খুলল। ভেতরের ছবিগুলো দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ভেতরে ভৈরব নদী, কাশফুল, শিউলির মালা, তালের বড়া আর রোশনের আঁকা ছবিÑসবই আছে। শুধু সত্যিকারের শরৎটা নেই।
মাইসুন কিছুক্ষণ ভেবে রংপেনসিল তুলে নিল। তারপর বাক্সের ঢাকনায় বড় বড় অক্ষরে লিখলÑ
‘এক বাক্স শরৎ’
লেখক : সহকারী সচিব, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা
