সিসিটিভি ফুটেজসহ আলামত সংগ্রহ, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ, মাদ্রাসায় হামলা-লুটের পাল্টা অভিযোগেও তদন্ত চলছে
গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেম আহম্মদের জামিন নামঞ্জুর করেছেন আদালত; পুলিশ প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে জানালেও মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পাল্টা অভিযোগও তদন্ত করছে।
গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার ক্বারিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদের (৩০) জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
রোববার (২৫ অক্টোবর) গাজীপুরের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ওমর হায়দার শুনানি শেষে তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন আদালতের পরিদর্শক আহসানুল্লাহ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২২ অক্টোবর গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিশুটির জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্তে শনিবার টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান। তবে তদন্ত এখনো চলমান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
পুলিশ ও শিশুটির পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর বাড়ি ফিরে শিশুটি ভীত ও মনমরা হয়ে পড়ে। পরে মা-বাবার কাছে সে বিষয়টি জানায়।
শিশুটির মা মালিহা আক্তারের অভিযোগ, মেয়ের কাছ থেকে ঘটনা জানার পর তিনি মাদ্রাসার এক শিক্ষিকাকে বিষয়টি জানান এবং পরে মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপালকেও অভিযোগের কথা বলেন। তাঁর দাবি, অভিযোগ জানানোর পরও পরদিন অভিযুক্ত শিক্ষক ক্লাস নেন। এ সময় তিনি শিশুটির কাছে বাসার ঠিকানা জানতে চান এবং পরে তাঁদের বাসায়ও যান বলে অভিযোগ করেন।
মাদ্রাসায় হামলা-লুটের পাল্টা অভিযোগ
শিশুটিকে নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর, মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও টাকা লুটের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সামনে এসেছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, একদল লোক প্রতিষ্ঠানে ঢুকে শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর করে, কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায় এবং ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুট করে। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ পৃথক অভিযোগ করেছে।
তবে শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত ২২ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন; মব সৃষ্টি করা বা ভাঙচুর-লুটপাট করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। একই সঙ্গে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, চলছে আলোচনা
অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। শিশুর প্রতি নিপীড়নের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও জনপরিসরে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগ এবং মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ—উভয় বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
