ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সমঝোতা এখনও অধরা। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। কাতারের মাধ্যমে পাঠানো ওই প্রস্তাবে ইরান জানিয়েছে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা হলে ষষ্ঠ দিনে প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে আলোচনা শুরু হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাবটি এখনও বহাল রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন সব শর্তে সম্মত না হওয়ায় আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে না।
এদিকে সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এবং ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাদের অগ্রযাত্রা ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদি ভূখণ্ডে একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দেশটির ন্যাশনাল গার্ডের দুই কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে রিয়াদের আশপাশে আরও কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে জোটটি। হুথিদের হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বহুতল ভবনের কার্যালয়গুলোতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা
রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে মিশর। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির অনুরোধে মিশরের পার্লামেন্টে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জরুরি অধিবেশন হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচিকে অনুমোদন দিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে কোনো ভুল হিসাব না করার হুশিয়ারি দিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সাত দিনের প্রস্তাব
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো তেহরানের সাত দিনের প্রস্তাব এখনও কার্যকর রয়েছে। রবিবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বৈঠকে অংশ নেওয়ার সময় তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
আরাঘচির বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে কিছু মতামত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান সেগুলো পর্যালোচনা করছে। তবে ওয়াশিংটন ইরানের সব শর্ত মেনে নিতে আন্তরিক কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্তগুলো বাস্তবায়ন করলে ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা থমকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র সাতটি শর্তের সব কটির বিষয়ে সন্তোষজনক সাড়া দেয়নি বলে তেহরানের অভিযোগ।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরান প্রস্তাবটি দেয়। পরে তেহরান জানায়, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এর জবাব পাওয়া গেছে। তবে শর্তগুলোর বিষয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য এখনও দূর হয়নি।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে।
বাগদাদে ওআইসির বৈঠকে আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন, হুমকি, হত্যাকাণ্ড এবং অর্থনৈতিক যুদ্ধের অভিযোগ করেন। তার দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ উপেক্ষা করেছে।
ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ঐক্য এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানান আরাঘচি। ইয়েমেন সংকটের সমাধানে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সামরিক উত্তেজনা, জবরদস্তি কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বাদ দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, আগ্রাসী দেশগুলোর বাড়াবাড়ির কাছে তেহরান মাথা নত করবে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের যোগ্যতা পর্যালোচনাসংক্রান্ত এক বৈঠকে তিনি বলেন, অন্য দেশের ভূখণ্ডের প্রতি ইরানের কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। একইভাবে ইরানের ভূখণ্ডের প্রতিও অন্যদের লোলুপ দৃষ্টি সহ্য করা হবে না।
ইরানের পার্লামেন্ট দেশটির নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচিকে অনুমোদন দিয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর কেতাবচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন আবার কোনো ভুল হিসাব করলে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে বিস্ময়কর ও ব্যাপক। এর ফলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে যে পরিণতি তৈরি হবে, তার দায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কেতাবচির দাবি, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও উন্নত ও আধুনিক করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিপক্ষের মূল্যায়ন ও হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন এসেছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা, সীমিত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সম্পদ এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশটির তেল উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন সক্ষমতা ২০২৪ সালের আগস্টে ৩৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৭ লাখ ১৫ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং উত্তেজনা কমিয়ে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে আরাঘচি টেলিগ্রামে জানিয়েছেন।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সহায়তা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের হুথিবিরোধী জোটের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিদের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইরানের সহায়তায় হুথিদের হামলার সক্ষমতা আরও উন্নত হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইরানের সহায়তায় হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলোতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা। গত সপ্তাহে রিয়াদে ১৩ জন নিহত হওয়ার হামলাটিও এর মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, হুথিরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেয়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট রবিবার জানিয়েছে, ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদি আরবের নজরান এলাকায় একটি এএইচ-৬আই গোয়েন্দা হেলিকপ্টার কারিগরি ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে হেলিকপ্টারটির দুই পাইলট নিহত হন। সৌদি প্রেস এজেন্সির বরাতে জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি এ তথ্য জানান।
জুলাইয়ে কয়েক বছর ধরে চলা অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইয়েমেনের সংঘাত আবার শুরু হয়। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলোতে হুথিদের অগ্রগতির পর সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জোটটি রিয়াদের আশপাশে আরও কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে। তবে এসব ড্রোন কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল বা সেগুলোর লক্ষ্য কী ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে মিশরের প্রেসিডেন্সি। শনিবার মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেন, রিয়াদ সহায়তা চাইলে সৌদি আরবকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় যে কোনো ব্যবস্থা নেবে তার দেশ।
সিসির অনুরোধে রবিবার বিকালে মিশরের পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন বসার কথা রয়েছে। সেখানে সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
