প্রশ্ন: কদিন পরে ঘরের মাঠে সাফ। এ মুহূর্তে যদিও ঘরোয়া লিগ নিয়ে ব্যস্ত, সর্বশেষ ম্যাচে গোলও পেয়েছেন। সাফের আগে এটা নিশ্চয়ই আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে?
জামাল ভূঁইয়া: গোল করা সব সময়ই পজিটিভ। সাফের আগে এটা আমার জন্য ভালো হয়েছে। এখন আরও একটা খেলা আছে লিগের (শুক্রবার), তারপরে সাফ। লিগের যে ম্যাচটা বাকি আছে, ওখানে আমার মনোযোগ। তারপরে সাফে মনোযোগ দেব।
প্রশ্ন: এখন ঘরোয়া লিগ নিয়ে ব্যস্ততা থাকলেও সাফের প্রসঙ্গ এখনই এসে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ২৩ বছরের শিরোপাখরা ঘোচাতে কতটা আশাবাদী?
জামাল: যে স্কোয়াড বর্তমানে আছে, আমাদের একটা সক্ষমতা আছে যে আমরা এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে পারি, মানে জিততে পারব...জিততে পারি। সামগ্রিকভাবে দলের মান ভালো। এক মাস আগে যে টুর্নামেন্ট খেলেছি (ফিফা আসিয়ান কাপ), সেটাতে কিছু ভুল ছিল, কিছু পজিটিভ দিকও ছিল। সেসব আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে, কোন জায়গায় আমাদের শক্তি, কোন জায়গায় আমাদের দুর্বলতা—এসব নিয়ে আলাপ করতে হবে। সাফে যেসব প্রতিপক্ষ—ভুটান, শ্রীলঙ্কাকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
প্রশ্ন: আসিয়ান কাপের কথা বললেন। বর্তমান দলের যে শক্তি, আপনি, হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, জায়ান আহমেদের মতো খেলোয়াড় এসেছেন। সেই দল ৯-১ গোলে হেরেছে। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যত পার্থক্যই থাক, এত বড় ব্যবধানে হারার কি দল এটা?
জামাল: শুধু আপনারা না, প্লেয়াররাও শকড ছিল। বিশেষ করে যখন হাফ টাইমে ছিলাম, তখন আমরা আলাপ করেছি যে আসলে কী হচ্ছে! সবাই শকড ছিল। কিন্তু এটা ফুটবল, এমনটা হতে পারে। ম্যাচের আগে আমরা তো ভাবিনি যে ৯ গোল খাব। দুর্ভাগ্য, হয়ে গেছে। আমাদের এখান থেকে শিখতে হবে এবং সামনে তাকাতে হবে। শুধু পেছনে দেখলে লাভ হবে না। উই হ্যাভ টু লুক ফরোয়ার্ড অ্যান্ড উই হ্যাভ টু বি পজিটিভ।
প্রশ্ন: সামনে তাকালেই সাফ চলে আসছে। এই টুর্নামেন্টে আপনাদের বড় শক্তির জায়গা হবে কী?
জামাল: শক্তির জায়গা আমরা হোম গ্রাউন্ডে খেলছি, এটাই সবচেয়ে বড় মোটিভেশন। আমার হোম ফ্যানদের সামনে খেলব, গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে। এটা বাড়তি অনুপ্রেরণা। সাফ আমাদের কাছে বিশ্বকাপের মতো। বিশেষ করে যারা এখানে খেলে। আমাদের এই টুর্নামেন্ট জিততে হবে।
প্রশ্ন: আর বড় চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে?
জামাল: চ্যালেঞ্জ তো...অবশ্যই চাপ থাকবে। কারণ, আমরা স্বাগতিক। বাংলাদেশে খেলা হচ্ছে। সবাই প্রত্যাশা করছে একটা পজিটিভ রেজাল্ট। আমরাও প্রত্যাশা করি। তবে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে।
প্রশ্ন: অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে দুজন কোচের অধীনে জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুই কোচের পার্থক্য যদি করতে বলি, টমাস ডুলি এবং হাভিয়ের কাবরেরার মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়?
জামাল: অবশ্যই পার্থক্য আছে। হাভিয়ের ভিন্ন ধরনের কোচ, অনেক বেশি ভোকাল। তবে টমাসের যে অভিজ্ঞতা আছে, তাঁর কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। তিনি ১৯৯৪, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ খেলেছেন, বুন্দেসলিগার ট্রফিও জিতেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা আছে। হাভিয়ার হয়তো এ রকম প্রোফাইলের খেলোয়াড় ছিলেন না। ওখানে একটা পার্থক্য আছে।
প্রশ্ন: কোচ পরিবর্তন হলেও আপনার ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে নানা আনুষ্ঠানিকতা দলের অধিনায়ক আপনি। কিন্তু মাঠে গেম টাইম পাচ্ছেন না সেভাবে। এটা অবশ্যই কোচের সিদ্ধান্ত। কিন্তু আপনার কাছে যদি খোলাখুলি জানতে চাই, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার লক্ষ্যটা কী?
জামাল: আমার তরফে একটা পজিটিভ নোট নিয়ে শেষ করতে চাই। যদি এবার সাফের শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে পারি, আমার ক্যারিয়ারের জন্য এটা অনেক বড় অর্জন হবে। ২০ বছর পরে হয়তো বলতে পারব, ২০২৬ সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। আমার ক্যারিয়ারের শেষটা মনে রাখার মতো করতে চাই। (আমি আমার ক্যারিয়ার শেষ করতে চাই অন আ পজিটিভ নোট)।
প্রশ্ন: অনেক সময় শোনা যায়, জামাল তাঁর সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন। এ প্রসঙ্গে আপনার যুক্তি কী হতে পারে?
জামাল: মানুষ অনেক কিছু বলতে পারে, এটা তাদের মতামত। সবাই নিজস্ব মতামত দেওয়ার অধিকার রাখে। আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমি কি খারাপ মানুষ ছিলাম? নাকি ভালো মানুষ ছিলাম? খেলোয়াড় হিসেবে অবশ্যই নিজের সেরাটা দিতে চাই। তবে একই সঙ্গে চাই, সবাই যেন আমাকে ভালো মানুষ হিসেবেও মনে রাখে, ভালো টিমমেট হিসেবে মনে রাখে।
প্রশ্ন: আপনি বাংলাদেশে বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের পথ দেখিয়েছেন। গত দুই বছরে হামজাসহ আরও দারুণ কিছু ফুটবলার যোগ হয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবলে। একসময় টিকে থাকার লড়াই করতে হয়েছে, এখন একাদশে সাতজনও প্রবাসী ফুটবলার খেলছেন। কেমন লাগে দেখতে?
জামাল: ১০ বছর আগে বলেছি যে আমার মতো আরও খেলোয়াড় চাই। একটু দেরি হয়েছে, তবে এখন তো আসছে। এটা দারুণ বিষয়। কারণ, বাইরে অনেক ভালো প্লেয়ার আছে। আরও আসবে ইনশা আল্লাহ। প্রবাসী খেলোয়াড়দের যে ইমপ্যাক্ট, এটা খুবই ইতিবাচক বিষয়। সম্প্রতি জিদান ইউসুফ এসেছে। তার একটা ভালো উঠে আসার গল্প আছে, তাই না? আমি মনে করি আরও প্লেয়ার আসবে। বাংলাদেশের জন্য এটা অনেক ভালো, একই সঙ্গে স্থানীয় লিগ ও স্থানীয় খেলোয়াড়ও তৈরি করতে হবে। স্থানীয় প্রতিভাদের দিকেও বিশেষ মনোযোগ রাখতে হবে। লোকাল ট্যালেন্টও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের (বংশোদ্ভূত) ও লোকাল ট্যালেন্ট—দুটোর মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে।
প্রশ্ন: দেশের বাইরে থেকে এখানে খেলতে এসে শুরুতে অনেক সমস্যা মোকাবিলা করেছেন। এখন যখন প্রবাসী ফুটবলাররা আসেন, তাঁরা সাধারণত কী ধরনের সমস্যায় পড়েন, আপনার কাছে সাধারণত কী বিষয়ে সহায়তা চান, জানতে চান?
জামাল: আমার সময় একটু ভিন্ন ছিল। এখনকার ফ্যাসিলিটিজ তখন আমরা পেতাম না। এখন ভালো মাঠ, ভালো থাকার ব্যবস্থা থাকে। আমার সময়ে তো আমরা লোকাল খাবার খেয়েছি, লোকাল মাঠেও খেলেছি। তখন একই স্ট্যান্ডার্ড ছিল না। এখন জাতীয় দলের জন্য ফ্যাসিলিটিজ অনেক বেড়েছে। অবশ্য বাংলাদেশে আর যুক্তরাজ্যে খেলা তো এক না। আবহাওয়াও ভিন্ন। হামজা (চৌধুরী) যখন প্রথমে বাংলাদেশে এসেছে, মনে হয় ভুটান গেমের আগে (গত বছরের জুনে), আমাকে জিজ্ঞেস করছে সব সময় এ রকম গরমই থাকে নাকি? আমি বলেছি হ্যাঁ, একটু সময় লাগবে, এরপর মানিয়ে নিতে পারবে। কিছু সমস্যা একই রকম, তবে মানিয়ে নেওয়া কঠিন নয়।
প্রশ্ন: বলছিলেন যে প্রবাসী ফুটবলার আর স্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকতে হবে। আপনি দুই ধরনের ফুটবলারদের সঙ্গেই খুব ভালোভাবে মেশেন। স্থানীয় ফাহিম-রাকিব-সোহেলদের সঙ্গে প্রবাসী শমিত-জায়ান-জিদানদের মধ্যে মূল পার্থক্য দেখেন কোথায়, স্কিল নাকি মানসিকতায়?
জামাল: পার্থক্য হচ্ছে মাইন্ডসেটে। লোকাল প্লেয়ার যারা আছে, সব সময় চেষ্টা করে। সব সময় সেরাটা দিতে চায়। তবে যারা বাইরে থাকে, তারা টপ ফ্যাসিলিটিজ পেয়ে থাকে। ওদের (প্রবাসী ফুটবলার) যে অভিজ্ঞতা আছে, সেটা তারা দলে কাজে লাগাতে পারে। ওরা পরামর্শ দিতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে পার্থক্যটা বড় না।
প্রশ্ন: একটা মজার প্রশ্ন দিয়ে শেষ করি, জাতীয় দলের হয়ে গোলের পর বা জেতার পর কার সেলিব্রেশন সবচেয়ে আপনার মজা লাগে?
জামাল: ম্যাচ জেতার পর একবার একটা ভিডিও দেখেছিলাম শমিত নাচছে (গত বছর ভারতকে হারানোর পর), ওইটা আমার খুব পছন্দ। রিয়েলি অনেক ভালো লেগেছিল।
প্রশ্ন: যদি এবার শিরোপা জিততে পারেন, হবে নাকি কোনো নৃত্য-উদ্যাপন?
জামাল: (হেসে) অবশ্যই হবে। একেক জয়ে একেক ধরনের সেলিব্রেশন হবে। কিন্তু তার আগে আমাদের ভালো খেলতে হবে, জিততে হবে। ভালো খেললে সবই হবে ইনশা আল্লাহ।
