কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে টেকনাফ জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকতের পাশ ঘেঁষে নির্মিত হয়েছে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিনড্রাইভ সড়ক। উখিয়ার ইনানী এলাকায় এই সড়কসংলগ্ন ইসিএভুক্ত (পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা) সৈকতের প্রায় ৮০০ মিটার দীর্ঘ অংশ দখল করে ‘প্রাইভেট বিচ’ বা ব্যক্তিগত সৈকত দাবি করে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘বেলাভূমি ভিলা অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
বুধবার (২২ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, রিসোর্টের সামনে সৈকতের বালিয়াড়িতে যেতে নিজেদের অতিথিদের জন্য দুটি পথ তৈরি করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে কিছু মাছ ধরার ট্রলার সাজিয়ে রেখে জায়গাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাম্পান বিচ’।
প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে ‘আওয়ার প্রাইভেট বিচ, আওয়ার স্কেপ’ শিরোনামে স্থানটির ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রমোশনাল ভিডিওতে ‘জাস্ট মালিহা থিং’ নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর স্থানটিকে বেলাভূমির ‘প্রাইভেট বিচ’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেই ভিডিও রিসোর্টের পেজেও শেয়ার করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রথমে সেখানে ‘স্যালমন রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি খাবারের দোকান খোলা হয়। পরে রেস্টুরেন্টের পেছনে রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়। গত দুই বছর ধরে তারা সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করছে। শুধু ‘প্রাইভেট বিচ’ নাম দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণই নয়, বিচ ক্যাম্পিংয়ের কথা বলে বালিয়াড়িতে তাঁবু টাঙিয়ে তা ভাড়াও দেয় প্রতিষ্ঠানটি বলে জানা গেছে।
ইনানী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম বলেন, সৈকতকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে বেলাভূমি কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়রা তাদের সামনের অংশে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না। রিসোর্টের নিরাপত্তাকর্মীরা বারণ করেন। অংশটিকে তারা আয়ের উৎস বানিয়ে ফেলেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করে সংকটাপন্ন এলাকাকে নিজেদের বলে চালিয়ে দিয়ে যারা অভিনব কায়দায় বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ হাসান আল মারুফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সৈকত স্রষ্টাপ্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, রাষ্ট্র এই সম্পদের মালিক। এটিকে কারও প্রাইভেট বিচ বা ব্যক্তিগত বলে প্রচার করার অর্থ হলো ভোক্তাসাধারণের সঙ্গে সুকৌশলে প্রতারণা করা। এমন বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তথ্য অনুযায়ী, মেরিনড্রাইভের দুই পাশে অন্তত ২৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে তারকামানের প্রতিষ্ঠানসহ মাত্র ১১টির অনুমোদন আছে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা যাচাই করে বেলাভূমি ভিলা অ্যান্ড রিসোর্টের নাম পাওয়া যায়নি।
কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, মেরিনড্রাইভে যেসব অনুমোদনহীন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, সেগুলো ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সতর্কীকরণ নোটিশ পাঠানোসহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রম চলমান আছে।
পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম চালানো এবং ইসিএভুক্ত এলাকায় আইনের বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে স্থাপনা নির্মাণের তথ্য পেলে নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
সংস্থাটির কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আইন না মানায় গত এক বছরে কক্সবাজারের ৫৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁকে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৮ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, নিয়ম না মেনে ইসিএভুক্ত এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ এবং সৈকত দখলে নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা এসব ক্ষেত্রে জরিমানা ও মামলা করে থাকি। বিধিলঙ্ঘন দেখলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হলিডে ট্যুরিজম লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ‘বেলাভূমি ভিলা অ্যান্ড রিসোর্ট’। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আরিফুল ইসলাম আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি মাত্র কিছুদিন হলো এখানে যোগ দিয়েছি। আমাদের অতিথিদের কেউ কেউ সামনের সৈকতকে ভিডিওতে ‘প্রাইভেট বিচ’ বলেন। সেটি তাদের ব্যাপার।
মালিক কারা এবং অনুমোদন আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কক্সবাজারের কিছু ব্যবসায়ী মিলে রিসোর্টটি গড়ে তুলেছেন। আমরা অনুমোদনের যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে আবেদন করেছি।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ অক্টোবর বেলাভূমি রিসোর্ট থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটাপথের দূরত্বে অবস্থিত একই রকম আরেকটি প্রতিষ্ঠান টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটক প্রাণ হারান। একই দিনে উখিয়া থানায় টুপটুপের মালিক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে।
ইফতিয়াজ নুর নিশান/আরএআর
