৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ব্যাবসায়িক লেনদেন ও দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যাবসায়িক পাওনা নিষ্পত্তিতে আলোচনার পরিবর্তে মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নথি পর্যালোচনা ছাড়া এসব দাবির সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
পারফেক্ট প্যাক লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের সাবেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের সঙ্গে একসময় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল আল মোস্তফার। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তার প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এসব বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরিবর্তে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হক গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) জাহিদুল ইসলাম বিদ্যুৎ অভিযোগ করেন, মোবাইল ফোনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার একটি ছবি দেখিয়ে ডিবি পরিচয়ে লোকজন তাকে গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং হেনস্তা করে। তার অভিযোগ, ঘটনাটির মাধ্যমে তাকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সত্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
হক গ্রুপের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আল মোস্তফা গ্রুপের স্বত্বাধিকারী এবং পারফেক্ট ফুড, এলিন ফুড, মক্কা মাল্টিলেয়ার ও হক ফুডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এসব বিরোধের জেরে মামলা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে তার অভিযোগ।
ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত পাওনার পরিমাণের তুলনায় মামলায় দাবিকৃত অর্থ অনেক বেশি দেখানো হয়েছে। একটি চেককে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা দায়েরের অভিযোগও করেছেন তারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় দুই কোটি টাকা পাওনা থাকার দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিরোধে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত দাবিসংবলিত একাধিক মামলা করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থের পরিমাণ, মামলার সংখ্যা এবং একই চেকের ভিত্তিতে একাধিক মামলা দায়েরের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মামলার আরজি, চেকের বিবরণ, হিসাবপত্র ও আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করা জরুরি। ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা জানান, ব্যাবসায়িক দেনা-পাওনা নিষ্পত্তির জন্য তারা একাধিকবার ই-মেইল ও চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের দাবি, এসব উদ্যোগে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। এর পরিবর্তে মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং পুলিশি পদক্ষেপের আশঙ্কা দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
হক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় দ-বিধির ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় দায়ের করা একটি মামলাকে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক বলে দাবি করেছেন। তবে মামলাটির অভিযোগ, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, ব্যাবসায়িক লেনদেনের বিরোধ থাকলে চুক্তি, হিসাবপত্র ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তা নিষ্পত্তি করা উচিত। একই সঙ্গে কোনো পক্ষ মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে হয়রানি করলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট সব মামলার আইনগত ভিত্তি যাচাই, দাবিকৃত অর্থের হিসাব পরীক্ষা এবং ব্যাবসায়িক বিরোধের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চুক্তি, হিসাবপত্র, চেক, ই-মেইল, আইনি নোটিশ এবং আদালতের নথি পর্যালোচনার পাশাপাশি অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, প্রকৃত পাওনা থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, হয়রানি কিংবা বেআইনি চাপ সৃষ্টির অভিযোগ থাকলে সেসব বিষয়ও যথাযথভাবে যাচাই করা দরকার। অভিযোগের বিষয়ে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।