বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রথমবারের মতো সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তব বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরো কাছাকাছি পৌঁছেছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারে।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এ সাফল্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয়। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মইনুল হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানের কাছে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স হস্তান্তর করেন।
নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষে পরবর্তী ধাপ: প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভ ব্যবস্থার পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ১৬ দশমিক ১ এমপিএ চাপ ও ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১২টি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও তা সমাধান করে পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। ফলাফল পর্যালোচনার পর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ পরবর্তী কার্যক্রমের অনুমোদন দেয়।
এখন গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠার পর তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে রেখে চুল্লির গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ প্রক্রিয়াসহ ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন লাগতে পারে।
পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো হবে। এরপর টারবাইন ও জেনারেটরের কার্যকারিতা যাচাই করে জাতীয় গ্রিডে সংযোগের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অপারেটিং সংস্থাকে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু ঠিকভাবে এগোলে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রিডে সংযোগের পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন সাত থেকে আট মাস চলতে পারে। তবে সময়সূচি নির্ভর করবে নিরাপত্তা যাচাই, কারিগরি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর।
দুটি ইউনিটে ২,৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা: রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত কেন্দ্রটির প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এতে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি বিদ্যুতের উৎস বহুমুখী করতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের পরমাণু বিভাজনে উৎপন্ন তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। কেন্দ্রটির পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও অনুমোদন সাপেক্ষে তা আরো ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি পরিবর্তনও করতে হবে; প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘ পরিকল্পনার পর বাস্তবায়ন: রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটম ১২৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে ৫০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। পরে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতায় বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছায়।
বিএনপির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও রূপপুর কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমান বিএনপি সরকার শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখার কথা বলেছে। একই সঙ্গে স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে সম্ভাবনা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বাসসকে বলেন, রূপপুর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় সুযোগ। প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে বলে তিনি জানান।
একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব বলেন, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করবে। নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ সক্ষমতা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
ব্যয় বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা: প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। মেয়াদ বাড়ানোর কারণে চুক্তি অনুযায়ী ব্যয় বাড়ার সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিতে ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
রূপপুরের পূর্ণ সুফল পেতে উৎপাদন শুরুর পাশাপাশি নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে কেন্দ্রটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখতে পারবে। সূত্র: বাসস
সানা/আপ্র/১২/১০/২০২৬
