জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো, দুর্নীতি ও জনসেবার ঘাটতির প্রতিবাদে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে জ্বালানির দাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শিক্ষা খাতে অর্থায়ন নিয়ে আন্দোলন তীব্র আকার নিয়েছে। ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও
আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপের বাইরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও তুরস্কেও বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ।
এসব বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, আবাসন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া, শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবায় অর্থায়ন নিয়ে অসন্তোষ। কোনো কোনো দেশে এসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবির সঙ্গে দুর্নীতি, বেকারত্ব, বৈষম্য, নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সরকারের নীতির বিরোধিতাও যুক্ত হয়েছে।
ইতালির মিলানে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবার একটি মিছিল থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থবির মজুরি, মূল্যস্ফীতি এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে মানুষের ক্রমবর্ধমান অসুবিধা নিয়েও সেখানে ক্ষোভ রয়েছে।
মিছিলের একপর্যায়ে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের দিকে রাস্তার পাথরখণ্ড ও অন্যান্য বস্তু ছুড়তে থাকেন। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের একটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। বার্তা সংস্থা লাপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। ফ্রান্সের তুলনায় ইতালির বিক্ষোভের পরিসর ছোট হলেও সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।
বেলজিয়ামে পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফি বাড়ানোর বিরোধিতা থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে।
গতকাল ব্রাসেলস ও লিয়েজ শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।
বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য সংগঠিত ও বারবার ঘটানো সরাসরি সহিংসতা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাকারী’ বলেও আখ্যা দেন।
পর্তুগালে আবাসনব্যয়, জীবনযাত্রার খরচ ও কম মজুরির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন। রাজধানী লিসবনসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম এবং ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।
শনিবার রাজধানী লিসবনের রসিও চত্বরে কয়েকশ মানুষ সমবেত হন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের একাংশ রাতভর সেখানে অবস্থানের ঘোষণা দেন। ৪৬ বছর বয়সী সমাজকর্মী এলেনা কোস্তা বলেন, কর দিয়ে দেশ সচল রাখা মানুষের অধিকার আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসনের অধিকার হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বল পরিবেশ, উচ্চ টিউশন ফি, আর্থিক সহায়তার অভাব এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে এতে দুর্নীতি, বেকারত্ব, আয়বৈষম্য ও ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানের মতো বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।
গতকাল রবিবার টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বিক্ষোভ করেন হাজারো মানুষ। রাজধানী তিরানায় দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে কয়েকশ বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। পরে পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
শহরের কেন্দ্রস্থলের দোকান এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দরজা-জানালায় ধাতব শাটার লাগানো হয়। বিক্ষোভকারীরা যাতে সড়কের পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছুড়তে না পারেন, সেজন্য নগরকর্মীরা সেগুলো সরিয়ে নেন।
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করছে বিরোধী দলগুলো। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সদ্য গঠিত ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। বিরোধী দলগুলোর সমর্থন নিয়ে গোষ্ঠীটি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ও জনপদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধী ‘নো কিংস’ নেটওয়ার্কের উদ্যোগে সমাবেশ হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোট দিতে মানুষকে উৎসাহিত করা এসব কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
আয়োজকরা কর্মসূচিগুলোকে নির্দলীয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি নিয়ে অসন্তুষ্ট মানুষের প্রায় দুই বছরের বিক্ষোভ ও মিছিলের ধারাবাহিকতাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যও রয়েছে এসব আয়োজনের পেছনে।
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে চলতি সপ্তাহের শুরুতে উচ্চশিক্ষায় সরকারি ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের সরকার বাজেট কাটছাঁটের নীতি অনুসরণ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় খাতে ব্যয় কমানোর প্রতিবাদে হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মী, ট্রেড ইউনিয়নকর্মী ও বিরোধী দলের কর্মী পার্লামেন্টের বাইরে সমবেত হন।
তুরস্কে গত মাসে মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং অপর্যাপ্ত পেনশনের প্রতিবাদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করে। রাজধানী আঙ্কারায় সাংবিধানিক আদালতের বাইরে সমবেত হয়ে পেনশনভোগীরা মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা এবং পরিবারের মৌলিক ব্যয় মেটানোর সাংবিধানিক অধিকারের দাবি জানান।
বিক্ষোভ চলাকালে ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আলি সেকেরোগলু নিজের আর্থিক সংকট এবং তার দুই বেকার ছেলের কথা তুলে ধরেন। তুরস্কের জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে এবং ‘টাকার জন্য নয়, আমাদের সম্মানের জন্য’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে তিনি নিজের সার্ভিস অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এসব আন্দোলনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবির পার্থক্য থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা এবং সরকারি সেবায় অর্থায়নের প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে। ফ্রান্সে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ইতালি ও পর্তুগালে ক্রয়ক্ষমতা, মজুরি ও আবাসনব্যয় আন্দোলনের অন্যতম বিষয়। বেলজিয়ামে সরকারি ব্যয় সংকোচন ও উচ্চশিক্ষার ফি নিয়ে প্রতিবাদ ছড়িয়েছে। আলবেনিয়ায় শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটের সঙ্গে দুর্নীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ যুক্ত হয়েছে।
