সোনা ও ডায়মন্ড অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে প্রায় ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা মানি মানিলন্ডারিং (অর্থপাচার) করার অভিযোগে করা মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার আগরওয়ালার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের আদালত এই আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন এতথ্য নিশ্চিত করেন।
এর আগে, আসামিকে আদালতে হাজির করে তিনদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। মামলা সংক্রান্তে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, পর্যালোচনা এবং মানিলন্ডারিং এর সত্যতা নিরূপণের আসামির তিনদিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ড) নিয়ে মামলার ঘটনা সংক্রান্তে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
আসামি পক্ষের আইনজীবী আনোয়ারুল কবীর বাবুল, আব্দুল আল মনসুর রিপন, সানাউল ইসলাম টিপু, জাহাঙ্গীর আলম, মোমিনুল ইসলামসহ অনেকেই রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এর বিরোধিতা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন শুনানিতে বলেন, আসামি সোনা ও ডায়মন্ড কার কাছ থেকে ক্রয় করেছেন, তার তথ্য সিআইডির কাছে নেই। আসামি এই বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। চোরাচালানের মধ্যে আসামি অর্থ পাচার করেছেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন অর্থ দিয়ে জুলাই আন্দোলনকে দমানোর জন্য সহযোগী করেছেন। তিনি একটি জুলাই হত্যা মামলার আসামি। মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামির তিন দিনের রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা শুনানিতে বলেন, মামলার ফরওয়ার্ডিংয়ের মাধ্যমে বলা হচ্ছে বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে। অথচ চোরাচালানের অভিযোগ আনা হয়েছে। স্বর্ণ ও ডায়মন্ড বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাস্টমারদের কাছ থেকে এসব পণ্য কিনেছে। এসব পণ্য পুরোনো হলে তা পরিবর্তনের বিধান রয়েছে। প্রতিটি পণ্যের তথ্য রেজিস্টারে উল্লেখ থাকে, যা কাস্টমস, ভ্যাট ও এক্সাইজ কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। আসামি প্রতিটি নথি তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দিয়েছি। বছর ভিত্তিক হিসাবও দিয়েছি, কে কত টাকা দিয়েছেন, তার হিসাবও রয়েছে। কিন্তু কত টাকার গরমিল পাওয়া গেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। যদি তথ্য উদ্ঘাটনের কোনো বিষয় থাকে, তাহলে আসামি কারাগারে থেকেও তদন্তে সহায়তা করতে পারবেন।
শুনানিতে আরও বলা হয়, রিমান্ড আবেদন মামলার এজাহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আসামির অসুস্থতা, বয়োজ্যেষ্ঠতা ও আগামীকাল বিজয়া দশমীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামিনের প্রার্থনা করেন তারা।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির একদিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে, গত ১৯ অক্টোবর রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুলশান এভিনিউতে অবস্থিত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও কার্যালয়ে এই অপরাধ সংঘটিত হয়। সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ব্যাংক হিসাব, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়- দিলীপ কুমার আগরওয়ালার প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড বৈধভাবে এলসির মাধ্যমে বিদেশ থেকে ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকার স্বর্ণবার, স্বর্ণালংকার, লুজ ডায়মন্ড ও অলংকার আমদানি করে।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় বাজার থেকে মোট ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও ডায়মন্ড ক্রয়, বিনিময় বা রূপান্তর করেছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, স্থানীয় বাজার থেকে কেনা বিপুল অঙ্কের এই (৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা) স্বর্ণ ও ডায়মন্ড কার কাছ থেকে বা কোন উৎস থেকে ক্রয় করা হয়েছে, তার পক্ষে কোনো বৈধ নথিপত্র সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআইডি নিশ্চিত হয়েছে যে, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডকে ব্যবহার করে দিলীপ কুমার আগরওয়ালা দীর্ঘদিন ধরে চোরাকারবারের মাধ্যমে অবৈধ স্বর্ণ ও ডায়মন্ড ক্রয়-বিক্রয় করে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকা উপার্জন করেছেন। ওই ঘটনায় গত বছরের ১৭ নভেম্বরে রাজধানীর গুলশান থানায় সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শেখ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
এর আগে, সোনা ও হীরা চোরাচালান, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেছিল তৎকালীন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। ওই দিন মধ্যরাতে রাজধানীর গুলশানে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের কার্যালয় ঘিরে দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে তাকে হেফাজতে নিয়েছিল সংস্থাটি।
পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রাজধানীর বাড্ডায় হৃদয় আহমেদ নামে এক কিশোর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই হত্যা মামলায় তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে পুলিশ। পরবর্তীতে তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
