পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণ, পূজার ঘণ্টা, ঢাকের তাল, ধূপ আর ফুলের অঞ্জলিতে দেবী দুর্গাকে বিদায়। ছয় দিনের পূজোর আনন্দ শেষে বিজয়া দশমী।
বিজয়া দশমী‘র বিকেলে নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরশহরের বিভিন্ন মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করেন এবং দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা।
পরবির্ততে, দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ আর সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন ভক্তরা। আনন্দের আড়ালে বিদায়ের বিষাদ। আবার এক বছর পর দেবীর আগমনের প্রত্যাশা। সব মিলিয়ে মন্দিরজুড়ে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। এসময় বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপ-ফুল, বেলপাতাসহ বিভিন্ন উপাচারে দেবীর চরণে শেষবারের মতো অর্ঘ্য নিবেদন করেন তাঁরা। প্রার্থনায় উঠে আসে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সবার সুস্থতা ও দেশের শান্তি-সমৃদ্ধির কামনা।
দেবীর দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিজয়া দশমীর শাস্ত্রীয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পরে সুমেশ্বরী নদীর ঘাটে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় দেবীকে বরণ ও সিঁদুর খেলার আয়োজন। এ সময় ভক্তরা দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, হাসি আর চোখের কোণে জমে থাকা জলÑসব মিলিয়ে বিদায়ের মুহূর্তে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ে মন্দির প্রাঙ্গণে।
দেবীর বিদায়ে মন খারাপ হলেও উৎসবের আনন্দে শামিল হন দুর্গাপুর উকিল পাড়ার এলাকার অদিতি সরকার সিঁথি। তিনি বলেন, মা চলে গেছেন, তাই মনটা একটু খারাপ। তবু আমরা এটাকে উদ্যাপন করছি। আসছে বছর আবার হবে, এই প্রত্যাশা। মায়ের কাছে আমার চাওয়া, সবাই যেন সুস্থ থাকে, দেশের ভালো কিছু হয়, পরিবারের সবাই ভালো থাকুক, এই প্রার্থনা করি।
মন্দির-মণ্ডপেও চলছে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। ছয় দিনের পূজা-অর্চনা শেষে প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর ক্ষণ ঘনিয়ে আসায় ভক্তদের মনে বাজছে বিষাদের সুর। দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন, সিঁদুর দিয়ে বরণ ও আশীর্বাদ প্রার্থনায় ব্যস্ত ভক্তরা।
অন্যদিকে লালপেড়ে শাড়ি পরা নারীরা একে অপরের কপালে ও মুখে সিঁদুর মাখিয়ে মেতে উঠছেন সিঁদুর খেলায়। ঢাকের বাদ্য,শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠছে মন্দির প্রাঙ্গণ। একদিকে সিঁদুর খেলার আনন্দ,অন্যদিকে দেবীকে বিদায় জানানোর বিষাদ। আনন্দ-বেদনার মিশেলে চলছে বিজয়া দশমী।
উপজেলা পূজা উৎযাপন ফ্রন্ট এর আহবায়ক শুভেন্দু সরকার পিন্টু বলেন, আজ দশমী পূজা হয়েছে। পূজার পরে সবাই অঞ্জলি দিয়েছে। অঞ্জলির পরে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এরপর পূজারিরা সুমেশ্বরী নদীর ঘাটে ঘট বিসর্জন দিয়েছেন। এবার কোন প্রকার অ-প্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি। শান্তিপুর্ন ভাবে শারদীয় শেষ করতে পেরেছি।
এনিয়ে তরুণ ক্লাবে সভাপতি ধনেশ পত্রনবীশ বলেন, প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তমী তিথিতে দেবীর চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে প্রতিমায় দেবীর উপস্থিতি আহ্বান করা হয়। আর দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিমার পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। সিঁদুর খেলা আনন্দ-উৎসবের অংশ। নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় সিঁদুর বিনিময় করেন। সব মিলিয়ে সুন্দর ভাবে দুর্গাপুজা শেষ হয়েছে। আমি ধন্যবাদ দেই উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা ও পৌর বিএনপি‘র নেতাকর্মীদের।
বিভিন্ন মন্দিরে বরণ ও সিঁদুর খেলার আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুর্গাপুরের বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা নিয়ে দশভুজা মন্দিরে নেয়া হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে প্রতিমা নেয়া হয় সুমেশ্বরী ঘাটে। পরবর্তিতে সোমেশ্বরী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
উপজেলা পূজা কমিটির সভাপতি এডভোকেট মানেশ চন্দ্র সাহা বলেন, আমি প্রথমেই ধন্যবাদ দিতে চাই মাননীয় ডেপটি স্পিকার মহোদয় কে যিনি এতো সুন্দর নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করেছেন।
সেইসাথে ধন্যবাদ দিতে চাই, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা ও পৌর বিএনপি‘র নেতাকর্মীদের যারা পুজো চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন ভাবে আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। এবার কোন প্রকার অ-প্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপুর্ন ভাবে শারদীয় উৎসব শেষ করতে পেরেছি। সেজন্য সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। এ বছর ৫৯টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন হয়েছে।
দেশ ও জাতীর কল্যানে মায়ের কাছে প্রার্থনা, সবাই যেন সুস্থ থাকে, দেশের ভালো কিছু হয়, পরিবারের সবাই ভালো থাকুক, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভ্রাতৃত্ত্বের বন্ধন অটুট থাকুক এই কামনা করছি।
