Published on
:
2 min read
সুশান্ত বণিক, আসানসোল
লেখাপড়া শিখে ভালো চাকরি পেতে হবে, অভাবের সংসারে আর্থিক দায়িত্ব সামলাতে বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে। এ মুহূর্তে এটাই একমাত্র লক্ষ্য আসানসোলের মহীশিলার বাসিন্দা দুই বোন সুদেষ্ণা ও তানিয়া সাহার। তাই লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে জিটি রোডের ধারে লক্ষ্মীপ্রতিমার পসরা সাজিয়ে বসেছেন দুই কন্যা। গত প্রায় আট বছর ধরে এ ভাবেই নানা দেবদেবীর মূর্তি বানিয়ে বিক্রি করছেন তাঁরা। তাঁদের কথায়, ‘স্বপ্নপূরণ না–হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।’
শনিবারের বারবেলা। রাত পোহালেই রবিবার লক্ষ্মীপুজো। আসানসোল বাজারে তাই থিকথিকে ভিড়। জিটি রোডের দু’পাশ জুড়ে ফুটপাথে লক্ষ্মীপ্রতিমার পসরা সাজিয়ে বসেছেন মৃৎশিল্পী ও প্রতিমা ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মধ্যেই রয়েছেন সুদেষ্ণা ও তানিয়া। দেখা গেল, ক্রেতাদের হাতে পছন্দ মতো প্রতিমা তুলে দিচ্ছেন সুদেষ্ণা। দিদির কাছ থেকে দাম জেনে নিয়ে ক্রেতার থেকে টাকা বুঝে নিচ্ছেন তানিয়া। এ ভাবেই চলছে বেচাকেনা। মেয়েদের সঙ্গে বাবা সুখেন সাহাও বিক্রিবাটার কাজ করছেন।
ভিড়ের চাপে মাথা তোলার ফুরসত নেই দু’বোনের। তারই ফাঁকে ফাঁকে উত্তর দিলেন নানা প্রশ্নের। সুদেষ্ণা জানালেন, তিনি সম্প্রতি সরকারি কলেজ থেকে নার্সিং পাশ করেছেন। এখন চাকরির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আরও জানালেন, তাঁদের বাবার ফাস্টফুডের একটি দোকান রয়েছে। দোকানের সামান্য আয়ে সংসার ও বোনের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। তার পরে বাবার কাছ থেকে আর টাকা নিতে চান না। বললেন, ‘আমি তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির খরচ নিজেই তুলে নিতে চাইছি।’ তবে এই কাজ তাঁর আজ নতুন নয়। প্রায় আট বছর ধরে বাবার সঙ্গে পথে বসে এ ভাবেই লক্ষ্মী, সরস্বতী, বিশ্বকর্মা, মনসার মূর্তি বিক্রি করে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করে চলেছেন তিনি।
দিদির পথই অনুসরণ করছে তানিয়াও। আসানসোলের একটি স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী তানিয়াও চায়, লেখাপড়ার খরচ সে নিজেই জোগাড় করবে। দিদির সঙ্গে সেও গির্জা মোড়ের ফুটপাথে লক্ষ্মীপ্রতিমা বিক্রি করছে। তানিয়া বলল, ‘পুলিশ বা সেনাবাহিনীর উচ্চপদে চাকরি করার ইচ্ছা আমার। এর জন্য উচ্চশিক্ষিত হওয়ার খরচ জোগানো বাবার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমিও তাই দিদির সঙ্গে প্রতিমা বিক্রিতে মন দিয়েছি।’ মা আসেননি? প্রশ্ন করতেই তানিয়া বলল, ‘সবাই মিলে চলে এলে ঘরদোরের কী হবে! ঘরের সব কিছু তো মা–ই দেখেন।’ মনে হলো, স্বামী ও দুই মেয়ে যখন রাস্তায় জীবন–যুদ্ধে ব্যস্ত, সুদেষ্ণা–তানিয়ার মা দুর্গা সাহা তখন যেন দুর্গার মতোই দশ হাতে সামলাচ্ছেন ঘর–সংসার।
কথা হলো দুই কন্যার বাবা সুখেন সাহার সঙ্গেও। তিনি বললেন, ‘ছাঁচ থেকে প্রতিমা তোলার পরে সেগুলি রং করে সাজ পরানো, সব কাজই দুই মেয়ে হাতে হাতে করে। ফলে বাইরের শিল্পীর সাহায্য নিতে হয় না বলে আয় কিছুটা বাড়ে। পাশাপাশি পুজোর সংখ্যা বাড়ায় প্রতিমার বিক্রিও কিছুটা বেড়েছে।’ অবশ্য আয়ের পথ প্রত্যাশা মতো প্রশস্ত হয়নি বলেই মত দুই বোনের। সুদেষ্ণা জানালেন, গত বছরে যে প্রতিমা ১০০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, ক্রেতারা এ বারও সেই দামেই প্রতিমা চাইছেন। অথচ গতবারের তুলনায় প্রতিমার সাজের খরচ এ বার অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে। সুদেষ্ণার কথায়, ‘কী করব বলুন? খদ্দের ধরে রাখতে আয়ের সঙ্গে সমঝোতা করতে হচ্ছে। প্রতিমা বিক্রি না–হলে তো পরের বছরের জন্য রেখে দেওয়া যায় না। তাও কিছু প্রতিমা থেকেই যায়। সেগুলি লোকসানের খাতায় চলে যায়।’
স্পষ্টতই প্রতিমা বিক্রির বাজার খুব অনুকূল নয়। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে এই লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর দুই বোন সুদেষ্ণা ও তানিয়া
