জীবিকার তাগিদে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তারা। উদ্দেশ্য ছিল নাটোরের তাহেরপুর থেকে পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে নিজ এলাকায় ব্যবসা করা। সেই ব্যবসার আয়েই চলত তাদের সংসার, পূরণ হতো পরিবারের সদস্যদের চাহিদা। কিন্তু পণ্য কিনে আর বাড়ি ফেরা হলো না। পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলো শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পাঁচ ব্যবসায়ীর। তাদের আকস্মিক মৃত্যুতে পাঁচটি পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে স্বজনদের ভবিষ্যৎ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকার নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর (৪০), ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫), ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), ডুবিসায়বর এলাকার আরব আলী ফকিরের ছেলে সামাদ ফকির (৬৫) এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে শাহিন বেপারী (৩০)।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত পাঁচজনই দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজিরহাটসহ আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করতেন। মৌসুমি কৃষিপণ্য কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করাই ছিল তাদের ব্যবসার অন্যতম মাধ্যম। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তারা একসঙ্গে নাটোরের তাহেরপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সেখানে পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল কেনার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
নিহত জুয়েল মাদবর কাঁচামালের ব্যবসার পাশাপাশি কাজিরহাটে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির কাঁচামালের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শাহিন বেপারী হলুদ কেনাবেচা করতেন। অন্যদিকে, শালাল মোল্লা ও সোহাগ শিকদারও বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনাবেচা করতেন। ব্যবসার কাজে একসঙ্গে যাত্রা করা এই পাঁচজনের আর বাড়ি ফেরা হলো না।
নিহত শালাল মোল্লার বড় ভাইয়ের স্ত্রী নাছিমা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। তিনি বলেন, ‘ব্যবসার মালামাল কিনতে গতকাল নাটোরে যায় আমার দেবর। তার সঙ্গে ব্যবসার আরও কয়েকজন ছিলেন। আজ সকালে নাটোর থেকে এক দারোগা ফোন করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আমার দেবর মারা গেছেন। খবরটি শুনে আমরা ভেঙে পড়েছি। তার পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। ওরা এখন কীভাবে চলবে?’
পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্বজনেরা। শালাল মোল্লার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারের জীবিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
নিহত সোহাগ শিকদারের বাবা ইউনুস শিকদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে। দুই ছেলের মধ্যে সোহাগ বড়। পরিবারের সোহাগই একমাত্র উপার্জনকারী। আমি একসময় ছোটখাটো ব্যবসা করতাম। এখন কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। ওরা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ধনিয়াসহ মৌসুমি পণ্যের ব্যবসা করত।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যায় তারা একসঙ্গে পেঁয়াজ কেনার জন্য নাটোরে যায়। আজ সকাল ৮টার দিকে ওই এলাকার থানার ওসি ফোন করে দুর্ঘটনার খবর দেন। ছেলেকে হারিয়ে এখন আমরা কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
সোহাগের মৃত্যুতে পরিবারের আয়ের প্রধান অবলম্বনটি হারিয়ে গেছে। স্বজনদের আহাজারিতে শোকাবহ হয়ে উঠেছে পুরো পরিবার।
নিহত জুয়েল মাদবরের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর বলেন, ‘গত রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে যাবি? সে বলেছিল, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। এরপর সকালে ফোন পাই, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই।’
ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। স্বাভাবিক একটি ব্যবসায়িক সফর পরিবারের জন্য এমন শোকাবহ পরিণতি ডেকে আনবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি স্বজনেরা।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিহতদের বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের ভিড় জমতে শুরু করে। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে, মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহম্মেদ বলেন, ‘দুর্ঘটনার বিষয়টি জেনেছি। তবে এখনো নাটোরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। শুনেছি, নিহতদের পরিবারের লোকজন মরদেহ আনতে গেছেন। মরদেহ জাজিরায় নিয়ে আসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই মানুষকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। ব্যবসার প্রয়োজনে একসঙ্গে যাত্রা করা জাজিরার এই পাঁচ ব্যবসায়ীর জন্য সেই যাত্রাই হয়ে উঠল শেষ যাত্রা। তাদের মৃত্যুতে শুধু পাঁচটি পরিবারই উপার্জনক্ষম সদস্য হারায়নি, শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকার ব্যবসায়ী ও পরিচিতজনদের মধ্যেও। এখন স্বজনদের একটাই অপেক্ষা, প্রিয় মানুষগুলোর মরদেহ যেন দ্রুত বাড়িতে পৌঁছায়, শেষবারের মতো তাদের মুখটি দেখতে পারেন তারা।
