ভোরে ঘুম ভাঙতেই টের পেলে, পাশের ঘরে রুটি সেঁকা হচ্ছে। গন্ধটা নাকে আসতেই পেটে খিদে মোচড় দিয়ে উঠল। ঢাকায় যেমন, দামেস্কেও তেমন। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় প্রতিবারের খাবারেই রুটি থাকে। অতিথি এলে টেবিলে সবার আগে আসে রুটি, বাকি খাবার পরে। চলো, পরিচিত হই সেখানকার কয়েকটি জনপ্রিয় রুটির সঙ্গে। কোনটা কোথাকার, কীভাবে বানানো হয় আর খাওয়াই–বা কীভাবে।
শুরু করি পিটা দিয়ে। আরবিতে এর নাম খুবজ। গোল, চ্যাপটা, ভেতরটা ফাঁপা, অনেকটা পকেটের মতো। এমন হওয়ার কারণটা সহজ। বেলে নেওয়া লেচি খুব গরম ওভেনে ঢোকালে ভেতরের পানি বাষ্প হয়ে যায়। সেই বাষ্পের চাপে রুটি বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। ওভেন থেকে বের করার পর রুটি আবার চুপসে যায়, কিন্তু ভেতরের ফাঁকা জায়গাটা থেকে যায়। সেই পকেটে ভরে দেওয়া যায় ফালাফেল, কাবাব কিংবা সবজি। আমাদের পুরভরা পিঠার সঙ্গে খানিকটা মিল আছে। স্কুলের টিফিনবক্স থেকে রাস্তার খাবারের দোকান, সব জায়গাতেই পিটার দেখা মেলে।
মিসরে রুটিকে বলা হয় এইশ। আরবি ভাষায় এইশ শব্দের অর্থ জীবন। রুটিকে যারা জীবন বলে ডাকে, তাদের কাছে এর গুরুত্ব কতটা, তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। মিসরের সবচেয়ে পরিচিত রুটিগুলোর একটি এইশ বালাদি। আস্ত গমের আটায় তৈরি বলে এর রং কিছুটা বাদামি, স্বাদেও থাকে হালকা মিষ্টির আভাস। কায়রোর পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট রুটির দোকান আছে। ভোর হলেই সেসব দোকানে লম্বা লাইন পড়ে। বহু বছর ধরে সরকার এই রুটিতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে, যাতে কম আয়ের মানুষও সাশ্রয়ী দামে রুটি কিনতে পারে। রুটির দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলেই তাই মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ১৯৭৭ সালে রুটির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে মিসরে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল। দেশটিতে রুটির দাম তাই শুধু খাবারের বিষয় নয়, রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। সকালে এইশ বালাদির সঙ্গে খাওয়া হয় ফুল মেদামেস। এটি সেদ্ধ ফাভা বিনের পদ, যাতে মেশানো হয় তেল ও লেবুর রস। সস্তায় পেট ভরানোর দারুণ উপায়!

লাভাশ আবার অন্য রকম। খুব পাতলা, নরম আর লম্বাটে এই রুটি আর্মেনিয়া, ইরান, তুরস্কসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়। ২০১৪ সালে আর্মেনিয়ার লাভাশ তৈরির ঐতিহ্য ইউনেসকোর মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। ঐতিহ্যগতভাবে এই রুটি তৈরিতে নারীরা দল বেঁধে কাজ করেন। লেচি হাতে টেনে টেনে পাতলা করা হয়। তারপর তা মাটির গভীর চুলার ভেতরের দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় রুটি। অনেকে এর মধ্যে পনির ও সবজি রেখে গুটিয়ে খান। চাইলে স্যান্ডউইচের মতো করেও খেতে পারো।
ইরানের সাঙ্গাকের গল্পটা একটু আলাদা। ফারসি ভাষায় সাঙ্গাক শব্দের অর্থ ছোট পাথর। নামটা এসেছে রুটি তৈরির পদ্ধতি থেকে। গরম নুড়িপাথরের ওপর সেঁকা হয় এই রুটি। ফলে এর গায়ে তৈরি হয় ছোট ছোট গর্ত। আকারে বেশ বড় ও লম্বাটে সাঙ্গাক সাধারণত পনির, তাজা শাকপাতা আর পুদিনার সঙ্গে খাওয়া হয়। গরম সাঙ্গাক ছিঁড়ে মুখে দেওয়ার স্বাদটা কেমন হতে পারে, এবার কল্পনা করে নাও!
ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের অনেক বাড়িতে একসময় মাটির বিশেষ চুলায় রুটি বানানোর প্রচলন ছিল। এই চুলার নাম তান্নুর। দেখতে অনেকটা বড় কলসির মতো। এর ভেতরে কাঠ বা কয়লা জ্বালিয়ে চুলা গরম করা হয়। তারপর বেলে নেওয়া লেচি চুলার ভেতরের দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর রুটি ফুলে ওঠে এবং দেয়াল থেকে নিজেই আলগা হয়ে আসে। আগুনের ধোঁয়াটে গন্ধও মিশে যায় রুটিতে। ফিলিস্তিনে এ ধরনের চুলায় তৈরি রুটিকে অনেক সময় তাবুন বলা হয়। বিখ্যাত ফিলিস্তিনি খাবার মুসাখান তৈরি হয় এই রুটি দিয়ে। বড় একটি তাবুন রুটির ওপর সাজানো হয় সুমাক মসলা, পেঁয়াজ ও জলপাই তেলে রান্না করা মুরগির মাংস। মুরগির তেল আর রস শুষে নেয় রুটি। তারপর সবাই মিলে হাতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। এক থালায় অনেকের ভাগ বসানো। ভোজের আনন্দ তো সেখানেই!
ইরাকের সামুনও বেশ পরিচিত। কোনাকুনি হীরার মতো দেখতে এই রুটি ভেতরে তুলতুলে নরম, বাইরে কিছুটা মচমচে। এর মধ্যে কাবাব ও কাঁচা পেঁয়াজ ভরে খাওয়া হয়। রাস্তার খাবার হিসেবে সামুন বেশ জনপ্রিয়।

লেবাননে সকাল শুরু হতে পারে মানাকিশ দিয়ে। রুটির ওপর মসলার মিশ্রণ মাখিয়ে সেঁকে তৈরি করা হয় এটি। দেখতে অনেকটা পিৎজার মতো। এর জনপ্রিয় একটি ধরন জাতার মানাকিশ। জাতার হলো বিভিন্ন মসলা ও উপাদানের মিশ্রণ, যাতে সাধারণত থাকে শুকনা থাইম, তিল ও সুমাক। জলপাই তেলের সঙ্গে মিশিয়ে এই মসলা রুটির ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওভেনে ঢুকতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সুগন্ধ। কেউ কেউ এর ওপর পনির দেন, কেউ আবার কিমা মাংস। বেইরুটের রাস্তায় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গরম মানাকিশ খাওয়ার দৃশ্য খুবই পরিচিত। স্কুলে যাওয়ার আগেও অনেক ছেলেমেয়ে এই রুটি খেয়ে নেয়। আমাদের দেশে সকালের নাশতায় যেমন পরোটা আর ডিমভাজি চলে, লেবাননে তেমনই জনপ্রিয় মানাকিশ।
তুরস্কে গেলে রুটির জগতে আরও কিছু নতুন স্বাদ পাবে। ইস্তাম্বুলের রাস্তায় ঠেলাগাড়িতে বিক্রি হয় সিমিত। তিলে মোড়ানো গোল আংটির মতো দেখতে এই রুটির বাইরের অংশ মচমচে, ভেতরটা নরম। এক হাতে সিমিত, অন্য হাতে চায়ের গ্লাস নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া তুরস্কের পরিচিত দৃশ্য। আবার রমজান মাসে বেকারিগুলোতে পাওয়া যায় পিদে রুটি। ফোলা ও নরম এই রুটির ওপর আঙুল দিয়ে কাটা থাকে নকশা। ইফতারের টেবিলে এর উপস্থিতি বেশ সাধারণ। তবে নৌকার মতো আকৃতির আরেকটি খাবারও আছে, যাকে পিদে বলা হয়। তাতে মাংস বা পনির দিয়ে তৈরি পুর থাকে। নাম এক হলেও দুটি খাবার এক নয়।
এত রকম রুটি তৈরি হলো কীভাবে? উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে বহু হাজার বছর আগে। পৃথিবীতে গম চাষের প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর কয়েকটি পাওয়া গেছে এই অঞ্চলে। মেসোপটেমিয়া থেকে লেভান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত উর্বর অর্ধচন্দ্রাকার ভূমি ছিল গম চাষের উপযোগী। হাজার হাজার বছর ধরে এখানকার মানুষ গম ফলিয়েছে, আটা তৈরি করেছে, আর সেই আটা দিয়ে সেঁকেছে রুটি। একেক এলাকার আবহাওয়া, জ্বালানি, চুলা ও খাদ্যাভ্যাস একেক রকম। সময়ের সঙ্গে সেসব পার্থক্যই রুটির আকার, স্বাদ ও তৈরির পদ্ধতিতে এনেছে বৈচিত্র্য। তাই মধ্যপ্রাচ্যের রুটিগুলো শুধু খাবার নয়, প্রতিটি অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও অংশ।