ইসরায়েলের সংগীতশিল্পীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলার অন্যতম আয়োজন ‘ইসরায়েল মিউজিক শোকেস ফেস্টিভ্যালে’ চলতি বছর বিদেশি অতিথির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। আয়োজকদের মতে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সাংস্কৃতিক বয়কটেরই প্রতিফলন এটি। খবর টাইমস অব ইসরায়েলের।
প্রতি বছর জেরুজালেম ও তেল আবিবে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী, প্রযোজক এবং বিভিন্ন সংগীত উৎসবের পরিচালকেরা অংশ নেন। এবারের আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে ১৭ থেকে ২২ নভেম্বর। উৎসবটির ১৭তম আসরে আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বিদেশি অতিথির সংখ্যা কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জেরুজালেমের সংগীতকেন্দ্র ইয়েলো সাবমেরিনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং উৎসবটির অন্যতম পরিচালক আতচা বার বলেন, ‘পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। গত বছরও আমাদের পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু এখন সব শেষ। আমাদের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই।’
এবারের উৎসবে ইসরায়েলের মার্ক এলিয়াহু, ইয়ায়েল ডেকেলবাম, হা-জেভোট, মায়া বেলিৎসম্যান ও মাতান এফ্রাত, কাদোশ ব্রাদার্স, বিইএএটিএফওওটি, অ্যালান টিউন, ড্যানিয়েল জামির ও জোহার ফ্রেসকো, পোর্টম্যান-টি, ইয়িসগাভ দোতান, শামান শামান, বুগি বালাগান, মাসোক ও শালশসহ বেশ কয়েকজন শিল্পীর পরিবেশনা থাকার কথা রয়েছে।
ইয়েলো সাবমেরিনের আয়োজনে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক কূটনীতি বিভাগ, ইডেন কোম্পানি, জেরুজালেম পৌরসভার যুব কর্তৃপক্ষ, জেরুজালেম ফাউন্ডেশন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জেরুজালেম পৌরসভার সহযোগিতায় উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়।
নোগা এরেজ, লোলা মার্শ ও তাত্রানের মতো কয়েক শ শিল্পীর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি তৈরির পথ সুগম করেছে এ আয়োজন।
উৎসবটির শৈল্পিক পরিচালক হাদাস ভানুনু জানান, গত বছর বিদেশ থেকে ৬০ জন অতিথি এসেছিলেন। এবার আসবেন তাদের প্রায় অর্ধেক।
ভানুনু বলেন, ‘এ বছর কাজটা আরও কঠিন হয়ে গেছে। বিষয়টি একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং অবাক হওয়ার মতো নয়।’
গত বছরের উৎসবের জন্য অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানোর সময়ও গাজায় যুদ্ধ চলছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে চালানো হামলায় অপহৃত ২০ জন জীবিত জিম্মি তখনো গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে আটক ছিলেন। উৎসব শুরুর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
ভানুনু বলেন, ‘এ বছর মানুষ আমার সঙ্গে কথাও বলতে চায় না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসতেও আগ্রহী নয়। এমন প্রবণতা এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।’
বিদেশি অতিথি কমে যাওয়ার পেছনে অর্থসংকটও ভূমিকা রেখেছে। গত বছর থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশের অর্থায়ন কমিয়ে দেয়।
ভানুনু বলেন, ‘আমাদের বাজেট অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব। বাজেট কমে গেলে অতিথি আনার সক্ষমতাও কমে যায়।’
বার জানান, আগে উৎসবে আসা অতিথিরা নিজেদের বিমানভাড়ার খরচ নিজেরাই বহন করতেন। তবে গত তিন বছরে ইসরায়েলে যাতায়াতের বিমানভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আয়োজকেরা বুঝতে পারেন, এ খরচ কমাতে তাদের সহায়তা করা প্রয়োজন।
আগে উৎসবটির মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপের সংগীতশিল্প-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের নিয়ে আসা। গত বছরের মতো এবারও এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দিকে নজর দিচ্ছেন আয়োজকেরা। এসব অঞ্চলের দেশগুলোতে ইসরায়েলি শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি আগ্রহ দেখা গেছে।
তবে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন যোগাযোগ যখন ইসরায়েলি সংগীতশিল্পীদের ইহুদি উৎসব ও অনুষ্ঠানে পরিবেশনার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে চান, তখন বার ও ভানুনু তাতে খুব একটা আগ্রহী নন।
বার বলেন, ‘আমরা বিশ্বের কাছে ভালো সংগীত পৌঁছে দিতে চাই। এটি আন্তর্জাতিক সংগীত জ্যাজ, বিশ্বসংগীত এবং হিব্রু ও ইংরেজি ভাষার সংগীত। আমরা সেটিই তুলে ধরি। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ এই উৎসবে আসে। এটি অসাধারণ একটি আয়োজন। শিল্পীরা এখানে যোগাযোগ তৈরি করেন এবং পরে বিদেশে পরিবেশনার সুযোগ পান, শুধু ইহুদি সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানেই নয়।’
ভানুনু বলেন, উৎসবটি ইসরায়েলের ভাবমূর্তি তুলে ধরার কোনো প্রচারাভিযান নয়। তবে বিদেশি অতিথিরা দেশটিতে এসে এক সপ্তাহের নিবিড় কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ সময় তারা ইসরায়েলের এমন কিছু দিক দেখার সুযোগ পান, যা সাধারণত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে আসে না।
বাদ্যযন্ত্রনির্ভর পিয়ানো ত্রয়ী শালশের সদস্য গাদি স্টার্ন বলেন, ইসরায়েলিদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে এ উৎসব। তার মতে, ‘এ ধরনের মানুষের দেখা পাওয়া এখন বিরল।’
বিদেশে নিয়মিত পরিবেশনা চালিয়ে যাওয়া ইসরায়েলি ব্যান্ডগুলোর মধ্যে শালশ অন্যতম ব্যতিক্রম। গত তিন বছরে দলটি বিদেশে বছরে প্রায় ৩০টি করে পরিবেশনা করেছে, যা একসময় তাদের বুক করা অনুষ্ঠানের সংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
স্টার্ন বলেন, ‘বিদেশে গেলে আমরা ইসরায়েলের প্রতিনিধিত্ব করি না। আমরা ইসরায়েল থেকে আসা তিনজন সংগীতশিল্পী, কিন্তু আমরা দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছি না। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো সংগীত তৈরি করতে এবং মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু যখন কোনো জায়গা সেই সেতু গড়তেই চায় না, তখন কাজটা কঠিন হয়ে যায়।’
তিনি জানান, গত ১২ বছরে বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপে সংগীত পরিবেশনার সময় সবচেয়ে বেশি বিরূপ মনোভাবের মুখে পড়েছেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলো, স্পেন ও ইংল্যান্ডে। তবে লন্ডনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন।
ইউরোপ সফরে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় স্টার্নের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তবে ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে ২৭ অক্টোবর তিনি চার ঘণ্টার জন্য দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছেন।
উৎসবটির হিসাব-নিকাশে আসন্ন নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ভানুনু। এ নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভানুনু বলেন, ‘অতিথিদের সঙ্গে আমাদের অনেক কথা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক ইহুদির সঙ্গেও আমরা কথা বলি। তারা ইসরায়েলি সংগীতশিল্পীদের তেমন চেনেন না, কিন্তু সাহায্য করতে চান। একই সঙ্গে তারা বলেন, আমাদের নির্বাচনে কী ঘটে, তার ওপর পুরো পরিস্থিতি নির্ভর করবে।’
সূত্র : টাইমস অব ইসরায়েল
