প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক ঘটনা এল নিনো। এর প্রভাবে বিশ্বের কোথাও তীব্র গরম ও খরা, কোথাও বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ে। গত কয়েক মাসে এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর পাঁচটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব তুলে ধরা হলো।
ইন্দোনেশিয়ায় ২০১৫ সালের পর ভয়াবহ দাবানল
এল নিনোর বছরে ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া থাকে। এ বছর জানুয়ারি থেকে অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়েছে। আয়তনটি বৃহত্তর লন্ডনের প্রায় ছয় গুণ। গত বছর এল নিনোর প্রভাব না থাকলেও যত জমি পুড়েছিল, এবার তার দ্বিগুণের বেশি পুড়েছে। দাবানলের কারণে বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে।
আরও পড়ুন
সুমাত্রা ও কালিমান্তানের লাখ লাখ মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছে। শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে ৪০ হাজারের বেশি।
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তৎপরতা বেশি
এল নিনোর প্রভাবে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তৎপরতা সাধারণত বাড়ে। এ বছর সেখানে এরই মধ্যে ২২টি নামযুক্ত ঝড় তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ঘূর্ণিঝড়, যার ১০টি ছিল শক্তিশালী। মৌসুম শেষ হতে এখনো দুই মাস বাকি।
এল নিনোর কারণে সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয় এবং বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের গতির পার্থক্য কমে। এতে ঝড় দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে। এর উদাহরণ ঘূর্ণিঝড় পোলো। এর বাতাসের ঝাপটার গতি ঘণ্টায় ২৮৫ কিলোমিটারে পৌঁছেছিল।
একই সময়ে পোলো, ওডালিস ও নোলো নামে তিনটি ঘূর্ণিঝড় সক্রিয় ছিল। এক মাসের মধ্যে এমন ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটে। এর আগে সেপ্টেম্বরে লওয়েল, কারিনা ও মেরি নামে তিনটি ঘূর্ণিঝড় একই সময়ে সক্রিয় ছিল। ২০১৫ সালের পর এমন ঘটনা আর ঘটেনি।
আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কম
প্রশান্ত মহাসাগরের বিপরীত চিত্র আটলান্টিকে। এল নিনোর কারণে উত্তর আটলান্টিকে বাতাসের গতির পার্থক্য বাড়ে। এতে ঝড় দুর্বল হয় এবং নতুন ঘূর্ণিঝড় তৈরির পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়।
এ বছর আটলান্টিকে আটটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে হারিকেন হয়েছে মাত্র একটি। ইসাইয়াস নামের হারিকেনটি ফ্লোরিডার প্যানহ্যান্ডল ও আলাবামায় আঘাত হানে। উপগ্রহের মাধ্যমে ঝড় পর্যবেক্ষণ শুরুর পর, ১৯৬০-এর দশক থেকে এত দেরিতে প্রথম হারিকেন তৈরির ঘটনা এবারই ঘটেছে। সাধারণত এ সময়ের মধ্যে আটলান্টিকে ১০টি নামযুক্ত ঝড়, পাঁচটি হারিকেন ও দুটি শক্তিশালী হারিকেন তৈরি হয়।
ভারতে কমেছে মৌসুমি বৃষ্টি
ভারতে এ বছর মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে। মধ্য ভারতে বৃষ্টি প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে তা ২৬ শতাংশ কমেছে। এসব অঞ্চলে ব্যতিক্রমী খরা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ ভারতেও বৃষ্টিপাত কমেছে ২৪ শতাংশ।
কিছু অঞ্চলে দীর্ঘ বিরতির পর হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তবে ভারতের মৌসুমি বায়ুর ওপর একাধিক আবহাওয়া ব্যবস্থার প্রভাব থাকায় বৃষ্টির ঘাটতির একমাত্র কারণ এল নিনো নয় বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
পূর্ব চীন ও জাপানে শক্তিশালী টাইফুনের ঝুঁকি
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এ বছর ঝড়ের তৎপরতা বেশি। মাইসাক ও দুজুয়ানের মতো ঝড়ের কারণে পূর্ব চীন ও জাপানে বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ বছর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ১০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে। ১৯৬৬ সালের পর কোনো মৌসুমে এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি বাতাসের গতিপথে পরিবর্তন আনে। এতে ঘূর্ণিঝড় সাধারণত আরও পূর্বদিকে তৈরি হয়। ফলে ঝড়গুলো উষ্ণ সমুদ্রের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শক্তি সঞ্চয়ের বেশি সময় পায়। স্থলভাগে আঘাত হানার আগে এগুলো শক্তিশালী টাইফুনে পরিণত হতে পারে। এ বছর আরও টাইফুন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জাপান ও পূর্ব চীনে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। সূত্র: বিবিসি
