সমগ্র জীবের কল্যাণসাধনই সব ধর্মের মূল বাণী। কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণসাধন নয়–এই চেতনা ধারণ করেই জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের এবং সব জীবের মঙ্গল কামনায় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় উদ্যাপন করে শারদীয় দুর্গোৎসব, আরাধনা করে দেবী দুর্গার।
বাংলায় প্রথম শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয় ইংরেজি ১৪৮০ সালে, এই বাংলাদেশেই। রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ আশ্বিন মাসের মহাষষ্ঠী তিথিতে এই পূজার সূচনা করেন। শাস্ত্রীয় নিয়মে দুর্গাপূজার মূল সময় হলো বসন্তকাল, যা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে লঙ্কা জয়ের আগের অকালবোধনের কাহিনি অনুসরণ করে রাজা কংস নারায়ণ এই শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনা করেন। ভিন্নমত থাকলেও মোটাদাগে শারদীয় পূজার এই মতটাই স্বীকৃত।
শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আনন্দময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। আশ্বিন বা কার্তিক মাসের শরৎকালীন নীল আকাশ, শিউলি ফুলের গন্ধ আর কাশবনের দোলা জানান দেয় দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন বার্তা। শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলেই একে বলে ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’। মূলত মহালয়ার পুণ্যতিথি থেকে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে এবং ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে মূল উৎসব।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, স্বর্গের দেবতাদের অত্যাচারী অসুররাজ মহিষাসুরের হাত থেকে রক্ষা করতে মহাশক্তি দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়েছিল। দেবী দুর্গা ১০ হাতে ১০টি অস্ত্র নিয়ে মহিষাসুরকে বধ করেন এবং স্বর্গে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। তাই তিনি ‘মহিষাসুরমর্দিণী’। বসন্তকালে রাজা সুরথ প্রথম এই পূজার প্রচলন করেছিলেন, যা ‘বাসন্তী পূজা’ নামে পরিচিত। তবে রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, লঙ্কার রাজা রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে অকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। রামচন্দ্রের এই অসময়ের পূজাকে শাস্ত্রে ‘অকালবোধন’ বলা হয়। বর্তমান যুগে এই শারদীয় উৎসবই বাঙালির প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে।
শাস্ত্রমতে, সব বিপদ থেকে যিনি জীবকে রক্ষা করেন, জগতের কল্যাণ সাধন করেন ও মানুষের দুঃখকষ্ট দূর করেন, তিনিই হচ্ছেন দেবী দুর্গা। শারদীয়ার আবহগুলো দেখলে বা এর অনুষঙ্গের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এর পরতে পরতে আবহমান বাংলা এবং বাঙালির রূপ। বাংলার বাইরে হিন্দু-অধ্যুষিত অন্য কোনো দেশে বা এলাকায় দুর্গা এভাবে বন্দিত হন না। বাংলায় দুর্গার ধারণাই ভিন্ন। এখানে তিনি অসুররূপী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নারী শক্তির প্রতীক। তার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয় নারীর জাগরণ। তিনি দুর্গা দশভুজা। যেমন দশভুজা ঘরে ঘরে বাংলার মায়েরা। তারা অদৃশ্য ‘দশ হাতে’ সংসার সামলান। দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার বা উপাসনার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনোৎসব। ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে সব স্তরের মানুষ এই উৎসবে শামিল হয়।
উৎসবমুখরতার মধ্য দিয়ে সব ধরনের হীনতা, সংকীর্ণতা ও ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন করে এবং আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহণ করে। সবাই মিলিত হয় অভিন্ন মোহনায়, অভিন্ন চেতনায়। পূজার ধর্মীয় অংশটুকু হিন্দুদের; কিন্তু মেলা, উৎসব ও আপ্যায়নে অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে শারদীয় দুর্গাপূজা পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে, পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায়, পরিণত হয় অন্যতম জাতীয় উৎসবে। ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে এ উৎসব পরিণত হয় সম্প্রীতিময় আনন্দযজ্ঞে। পূজা থেকে উৎসবে রূপান্তরের এই যে প্রক্রিয়া, এটি বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক সত্তার চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, ঈদে মিলাদুন্নবী, জন্মাষ্টমী, শারদীয় দুর্গোৎসব, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠান কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উদ্যাপিত হয়। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সব মানুষের মঙ্গল কামনাই এই উৎসবের মূল প্রেরণা।
