বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপে চোখ লাগিয়ে ফোকাস ঠিকঠাক করে নিল মেজর লরেন্স হল।
‘ইন্টারেস্টিং!’ আপনমনে বলে উঠল সে।
নমুনা রাখার পাত্রগুলোকে এড়িয়ে ল্যাব টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছে লেফটেন্যান্ট ফ্রেন্ডলি। মেজরের কথা শুনে সে বলল, ‘ঠিকই বলেছেন। তিন সপ্তাহ হলো এই গ্রহে এসেছি আমরা, এখন পর্যন্ত একটাও ক্ষতিকর জীবাণু বা জীব পাইনি। সত্যি ইন্টারেস্টিং।’ বড় করে শ্বাস ফেলল সে। ‘কী এক জায়গা! রোগজীবাণু নেই, মশা-মাছি-উকুন নেই, ইঁদুর নেই...’
‘হুইস্কিও নেই, আমোদ-প্রমোদের জায়গাও নেই,’ মুচকি হেসে সোজা হয়ে দাঁড়াল মেজর হল। ‘অবাক জায়গা। এবারের নমুনাটায় অন্তত একটা হলেও রোগজীবাণু পাব বলে আশা করেছিলাম, কিন্তু পেলাম না।’
‘পাবেন কী করে? গ্রহটায় ক্ষতিকর কিচ্ছু নেই। আমার তো সন্দেহ হচ্ছে, এটা ইডেনের সেই স্বর্গোদ্যান কি না।’
ল্যাবরেটরির জানালার দিকে এগিয়ে গেল হল, মুগ্ধ চোখে তাকাল বাইরে। অস্বীকার করার উপায় নেই, দৃশ্যটা অপূর্ব। সবুজ বনানী আর উঁচু-নিচু পাহাড়ের সমারোহ ঘটেছে যেন। পাহাড়ের সবুজ ঢালকে রাঙিয়ে তুলেছে রংবেরঙের হাজারো ফুল; রয়েছে জলপ্রপাত, নানা রকম ফলের গাছ, মাইলের পর মাইলজুড়ে বুনো ফুলের জঙ্গল, নীল পানির হ্রদ, আরও কত–কী। এই অপূর্ব প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্যই কাজ করে চলেছে ওরা। ছয় মাস আগে আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহ; যে স্কাউট শিপ গ্রহটাকে খুঁজে পেয়েছে, তারাই গ্রহের সৌন্দর্য দেখে নাম রেখেছে—প্ল্যানেট ব্লু।
‘অপূর্ব,’ বলল সে। ‘ইচ্ছা করছে এখানেই বাকি জীবন থেকে যাই।’
‘তুলনা করতে গেলে পৃথিবীকে একেবারে নিঃস্ব বলতে হয়।’ প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল ফ্রেন্ডলি। পরক্ষণে আবার ঢুকিয়ে ফেলল ওটা। ‘সত্যি বলতে কি, জায়গাটা আমার ওপর একটা অন্য ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সিগারেট খেতে পারছি না। ধরাতে গেলেই অপরাধবোধে ভুগি। পরিবেশটা এত নির্মল...এত পবিত্র যে সিগারেটের ধোঁয়া বা ছাই ফেলে নষ্ট করতে ইচ্ছা হয় না। পিকনিক করতে আসা লোকের মতো আচরণ করতে পারি না।’
‘ও রকম লোকের আমদানি হতে বেশি দেরি নেই,’ বলল হল। মাইক্রোস্কোপের কাছে ফিরে গেল সে। ‘আরও কয়েকটা নমুনা পরীক্ষা করে দেখি। বলা যায় না, ক্ষতিকর কোনো জীবাণু পেয়েও যেতে পারি।’
‘চেষ্টা চালিয়ে যান।’ উঠে দাঁড়াল ফ্রেন্ডলি। ‘পরে এসে খোঁজ নেব, কিছু পেলেন কি না। আমাকে যেতে হচ্ছে। কাউন্সিল রুমে সভা ডাকা হয়েছে, জানেন নিশ্চয়ই? কলোনিস্টদের প্রথম দলটাকে আসার অনুমতি দিয়ে ফেলবে বোধ হয়।’
‘কলোনিস্ট না, পিকনিকার্স।’
হাসল ফ্রেন্ডলি। ‘হ্যাঁ, তা-ও বলতে পারেন।’
‘ও রকম লোকের আমদানি হতে বেশি দেরি নেই,’ বলল হল। মাইক্রোস্কোপের কাছে ফিরে গেল সে। ‘আরও কয়েকটা নমুনা পরীক্ষা করে দেখি। বলা যায় না, ক্ষতিকর কোনো জীবাণু পেয়েও যেতে পারি।’
দরজা টেনে চলে গেল সে। করিডরে মিলিয়ে গেল তার পদশব্দ। ল্যাবরেটরিতে একা হয়ে গেল হল।
কিছুক্ষণ আপন চিন্তায় বিভোর হয়ে রইল সে, তারপর মাইক্রোস্কোপের তলা থেকে সরিয়ে নিল আগের স্লাইডটা। নতুন একটা স্লাইড নির্বাচন করল পরীক্ষা করার জন্য, সেটা আলোর দিকে তুলে পরখ করে নিল।
ল্যাবরেটরির ভেতরটা উষ্ণ, নিস্তব্ধ। জানালা দিয়ে ঢুকছে রোদ, পড়ছে মেঝের ওপর। বাইরে বাতাসে নড়ছে সারি সারি গাছের পাতা। ঘুম ঘুম ভাব হলো হলের।
‘পিকনিকারের দল!’ ক্ষুব্ধ গলায় বলল সে। নতুন স্লাইডটা ঠেলে দিল মাইক্রোস্কোপের নিচে। ‘এখানে এসেই তাণ্ডব বাধিয়ে দেবে। গাছ কাটবে, ফুল ছিঁড়বে, পানি দূষিত করবে, আগুন লাগিয়ে দেবে ঘাসে। নষ্ট করে দেবে এই সুন্দর পরিবেশ...’
কথা থেমে গেল তার, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে নয়। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, মাইক্রোস্কোপের আইপিস দুটো আচমকা প্রসারিত হয়েছে...পেঁচিয়ে ধরেছে তার গলা! শ্বাসনালিতে প্রচণ্ড চাপ পড়ল, হাঁসফাঁস করে উঠল সে, দম আটকে ওকে খুন করতে চাইছে যন্ত্রটা। টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে, কিন্তু খুনে যন্ত্রটা হার মানতে নারাজ, সাপের মতো কিলবিল করে আইপিস দুটো আবার ছুটে এল গলা লক্ষ্য করে।
টেবিল থেকে তুলে মাইক্রোস্কোপটা মেঝেতে আছড়ে ফেলল হল। লাফ দিয়ে সরে গেল দূরে। মাইক্রোস্কোপটা হার মানবে না, হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে এল, জড়িয়ে ধরতে চাইল পা। লাথি মেরে ওটাকে দূরে সরিয়ে দিল সে, হাতে বের করে আনল ব্লাস্টার পিস্তল।
নাছোড়বান্দা যন্ত্র...অ্যাডজাস্টমেন্টের নব দুটিকে চাকার মতো ব্যবহার করে এখনো এগিয়ে আসছে। দেরি করল না হল, টিপে দিল ব্লাস্টারের ট্রিগার। ধাতব ধুলার একটা মেঘ তৈরি করে ধূলিসাৎ হয়ে গেল যন্ত্রটা।
‘ঈশ্বর!’ কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পড়ল হল। ডলতে শুরু করল গলা। ‘কীভাবে সম্ভব! মানে কী এর!’
ঠাসাঠাসি অবস্থা কাউন্সিল রুমে। প্ল্যানেট ব্লু ইউনিটের সব অফিসার হাজির হয়েছে মিটিংয়ে। দেয়ালে ঝোলানো বিশাল ম্যাপের একটা অংশে প্লাস্টিকের পয়েন্টার দিয়ে টোকা দিল কমান্ডার স্টেলা মরিসন।
‘এই দীর্ঘ সমতল এলাকাটা শহর তৈরির জন্য আদর্শ,’ বলল সে। ‘কাছাকাছি পানির উত্স আছে, আবহাওয়াও চমত্কার। বিভিন্ন খনিজ পদার্থেরও মজুত আছে এখানটায়। কলোনিস্টরা বিভিন্ন ধরনের কারখানা চালু করতে পারবে। কোনো কিছু আমদানি করার প্রয়োজন হবে না। আর এই যে...’ আরেকটা জায়গা নির্দেশ করল সে, ‘এখানে রয়েছে পুরো গ্রহের সবচেয়ে বড় অরণ্য। কলোনিস্টদের মাথায় যদি ঘিলু থাকে, তাহলে রক্ষা করবে জঙ্গলটা। না করলেও আমাদের কিছু করার নেই।’
ঠাসাঠাসি অবস্থা কাউন্সিল রুমে। প্ল্যানেট ব্লু ইউনিটের সব অফিসার হাজির হয়েছে মিটিংয়ে। দেয়ালে ঝোলানো বিশাল ম্যাপের একটা অংশে প্লাস্টিকের পয়েন্টার দিয়ে টোকা দিল কমান্ডার স্টেলা মরিসন।
নীরবতা নেমে এল কামরায়। ঘুরে সবার মুখের ওপর চোখ বোলাল কমান্ডার।
‘আমি জানি, তোমরা কী ভাবছ। অনেকেই চাইছ না ইমিগ্রেশন অথরিটিকে আমরা সবুজসংকেত দিই। সুন্দর এই গ্রহ যেমন আছে, তেমনই রেখে দিতে চাইছ, যাতে ভবিষ্যতে নিজেরা কোনো দিন এসে বাসা বাঁধতে পারো। আমারও যে লোভ হচ্ছে না, এ কথা বলব না; কিন্তু অমন কিছু করতে গেলে সবাই ভীষণ ঝামেলায় পড়ে যাব। আমরা কেউ এখানকার মালিক নই। আমাদের পাঠানো হয়েছে একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে। কাজ শেষ হলেই ছুটতে হবে আরেক জায়গায়। কাজও তো প্রায় শেষই। বাকি শুধু সবুজসংকেত পাঠানো। তাই সবাই নিজের মালসামান গোছাতে শুরু করলেই ভালো করবে।’
‘ব্যাকটেরিয়া-সংক্রান্ত ল্যাব রিপোর্টটা কি পাওয়া গেছে?’ জানতে চাইল ভাইস কমান্ডার উড।
‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে যদ্দুর জেনেছি...এখন পর্যন্ত ক্ষতিকর কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি। তাই মনে হচ্ছে, ইমিগ্রেশন অথরিটিকে খবরটা জানিয়ে দেওয়াই ভালো। আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটা শিপ পাঠিয়ে দিক। ওটায় করে কলোনিস্টদের প্রথম দলটাও চলে আসতে পারবে। খামাখা দেরি করার...’
কথা শেষ করতে পারল না স্টেলা। ঝট করে খুলে গেল কামরার দরজা। সবার মাথা ঘুরে গেল ওদিকে। নিচু গলায় শুরু হলো গুঞ্জন।
‘মেজর হল!’ কড়া গলায় বলল স্টেলা। ‘তুমি কি জানো না, মিটিং চলাকালে এখানে কারও ঢোকা নিষেধ?’
তার কথা হলের কানে গেছে বলে মনে হলো না। দরজার নব ধরে মাতালের মতো দুলছে সে। ভিড়ের মধ্যে চঞ্চল চোখ বুলিয়ে খুঁজে বের করল লেফটেন্যান্ট ফ্রেন্ডলিকে।
‘এদিকে এসো,’ তাকে ডাকল হল।
‘আমাকে বলছেন?’ বিব্রত দেখাল ফ্রেন্ডলিকে।
‘মেজর হল, মানে কী এসবের?’ ভাইস কমান্ডার উড ধমকে উঠল। ‘মদ-টদ খেয়ে এসেছ নাকি...’ বলতে বলতেই থমকে গেল। হলের হাতে ধরা ব্লাস্টার পিস্তলটা দেখতে পেয়েছে। গলায় মধু ঢেলে এবার জানতে চাইল, ‘কোনো সমস্যা, মেজর?’
অস্ত্রটা ফ্রেন্ডলিরও চোখে পড়েছে। তাড়াতাড়ি উঠে সে হলের কাঁধে হাত রাখল। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে? আপনি এমন করছেন কেন?’

‘ল্যাবে চলো,’ সংক্ষেপে বলল হল।
‘কিছু কি পেয়েছেন?’ তার রুক্ষ চেহারা জরিপ করল ফ্রেন্ডলি। ‘খুলেই বলুন না।’
‘চলো তো!’ টান দিয়ে ফ্রেন্ডলিকে করিডরে বের করে আনল হল। নিয়ে গেল ল্যাবরেটরিতে।
‘কী হয়েছে বলবেন তো!’ ফ্রেন্ডলি কিছু বুঝতে পারছে না।
‘আমার মাইক্রোস্কোপ।’
‘কী হয়েছে মাইক্রোস্কোপের?’ ল্যাবের ভেতরে চোখ বোলাল ফ্রেন্ডলি। ‘কই, দেখছি না তো।’
‘নেই ওটা।’
‘নেই মানে? কোথায় গেল?’
‘ব্লাস্টারের গুলিতে উড়িয়ে দিয়েছি।’
‘আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,’ ফ্রেন্ডলি বিভ্রান্ত। ‘কেন গুলি করতে গেলেন?’
ইতস্তত করল হল। কথাটা কীভাবে বলবে, ঠিক বুঝতে পারছে না। ঠিক তখনই কী যেন দেখতে পেল ফ্রেন্ডলি। ঝুঁকে ল্যাব টেবিলের নিচের তাক থেকে বের করে আনল একটা কালো রঙের বাক্স। ডালা খুলতেই দেখা গেল, ওটার ভেতরে শোভা পাচ্ছে হলের মাইক্রোস্কোপটা। বাক্স থেকে বের করে ওটাকে টেবিলের ওপর রাখল ফ্রেন্ডলি।
ইতস্তত করল হল। কথাটা কীভাবে বলবে, ঠিক বুঝতে পারছে না। ঠিক তখনই কী যেন দেখতে পেল ফ্রেন্ডলি। ঝুঁকে ল্যাব টেবিলের নিচের তাক থেকে বের করে আনল একটা কালো রঙের বাক্স।
‘আপনি কি এতক্ষণ ঠাট্টা করলেন আমার সঙ্গে?’ বলল সে। ‘কোথায় ধ্বংস করেছেন...এই তো আপনার মাইক্রোস্কোপ। সব সময় যেখানে রাখেন, সেখান থেকেই বের করলাম। আসলে কী হয়েছে, সেটা বলুন। কিছু আবিষ্কার করে বসেছেন বুঝি? মারাত্মক বা বিষাক্ত কোনো ব্যাকটেরিয়া?’
জবাব দিতে পারল না হল। বিহ্বল ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। খুঁটিয়ে দেখল মাইক্রোস্কোপটা। ওরটাই বটে। অ্যাডজাস্টমেন্টের নবের ওপর পরিচিত খোঁচার দাগ দেখতে পাচ্ছে। একটা স্টেজ ক্লিপও বাঁকা। ওটায় আঙুল বোলাল সে।
পাঁচ মিনিটও হয়নি, মাইক্রোস্কোপটা ওকে খুন করতে যাচ্ছিল। নিজ হাতে ওটাকে ধুলায় মিলিয়ে দিয়েছিল সে। অথচ...
‘আপনার হাবভাব আমার ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছে না,’ উদ্বিগ্ন গলায় বলল ফ্রেন্ডলি। ‘একটা সাইক-টেস্ট করিয়ে নেবেন নাকি? ভালো হয় তাহলে।’
‘ঠিকই বলেছ তুমি, সেটাই করা দরকার,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল হল। ‘আমি বোধ হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।’
গুঞ্জন তুলে কাজ করছে মানসিক পরীক্ষার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটা, সব তথ্য-উপাত্ত একত্র করছে, বিশ্লেষণ করছে। একসময় লাল বাতিটা নিভে গিয়ে সবুজ বাতি জ্বলে উঠল।
‘কী পেলে?’ জানতে চাইল হল।
‘গুরুতর গোলমাল,’ স্পিকারে শোনা গেল যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। ‘অস্থিতিশীলতার মাত্রা দশের ওপরে।’
‘বিপজ্জনক?’
‘হ্যাঁ, আট হলেই বিপজ্জনক। দশ তো খুবই অস্বাভাবিক, বিশেষ করে তোমার বুদ্ধিমত্তার একজন মানুষের জন্য। চারের আশপাশে থাকলে স্বাভাবিক বলা যেত।’
ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল হল। ‘আমি জানি।’
‘আমাকে যদি আরও কিছু তথ্য দাও...’
চোয়াল শক্ত হলো হলের। ‘আর কিছু বলা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।’
‘সাইক-টেস্টের সময় কোনো তথ্য গোপন করা বেআইনি,’ জানিয়ে দিল যন্ত্র। ‘কারণ, অসম্পূর্ণ বা মিথ্যা তথ্য আমার সিদ্ধান্তকে ভুল পথে চালিত করে।’
‘বললাম তো, আর কিছু জানানো সম্ভব নয়।’ হল উঠে দাঁড়াল। ‘আমার ভেতরে কি তুমি উচ্চ মাত্রার
অস্থিতিশীলতা পেয়েছ?’
‘উচ্চ মাত্রার মানসিক বিশৃঙ্খলা লক্ষ করা গেছে। কিন্তু এর অর্থ কী বা ঠিক কী কারণে হচ্ছে, তা বলা যাচ্ছে না।’
‘ধন্যবাদ।’ সুইচ টিপে যন্ত্রটা বন্ধ করে দিল হল। ফিরে এল নিজের কোয়ার্টারে। মাথা ঘোরাচ্ছে ওর। সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? কিছু একটাকে গুলি করেছে ও, তাতে সন্দেহ নেই। ল্যাবের বাতাস পরীক্ষা করে দেখেছে, তাতে ভাসমান ধাতব কণা পেয়েছে, বিশেষ করে যেখানটায় মাইক্রোস্কোপটা ধ্বংস হয়েছিল, সেখানে।
কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই অবিশ্বাস্য। মাইক্রোস্কোপের মতো একটা জড় জিনিস জ্যান্ত হয়ে উঠতে পারে না। আর ফ্রেন্ডলি ওটাকে অক্ষত অবস্থায় বাক্স থেকে বের করলই-বা কীভাবে?
‘আপনার হাবভাব আমার ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছে না,’ উদ্বিগ্ন গলায় বলল ফ্রেন্ডলি। ‘একটা সাইক-টেস্ট করিয়ে নেবেন নাকি? ভালো হয় তাহলে।’
ইউনিফর্ম খুলে শাওয়ারে গিয়ে ঢুকল হল। ঈষদুষ্ণ পানিতে ভিজতে ভিজতে ধ্যানমগ্ন হয়ে গেল। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও—যন্ত্রের পরীক্ষা তা-ই বলছে। কথা হলো, যা কিছু দেখছে, তা কি এই মানসিক বিপর্যয়ের কারণে, নাকি অদ্ভুত ঘটনাগুলোর কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ও? ল্যাবরেটরির ঘটনাটা ফ্রেন্ডলিকে বলতে গিয়েও বলতে পারেনি। এমন আজগুবি কথা কে বিশ্বাস করবে?
গোসল শেষ হলে শাওয়ারের কল বন্ধ করে র৵াক থেকে তোয়ালে নিতে গেল হল। সঙ্গে সঙ্গে ঘটল আরেক অদ্ভুত ঘটনা। সাপের মতো ছোবল দিল তোয়ালেটা, পেঁচিয়ে ধরল হাত। এমন এক হেঁচকা টান দিল, সোজা দেয়ালের ওপর আছড়ে পড়ল সে। টের পেল, হাত ছেড়ে তোয়ালেটা এবার তার নাক–মুখ পেঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করছে।
ছাড়া পাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করল হল, আচমকা আলগা হয়ে গেল বাঁধন। ছিটকে গিয়ে এবার উল্টো দিকের দেয়ালে গিয়ে পড়ল সে, মাথা ঠুকে গেল। দেয়ালে পিছলে শাওয়ারের মেঝেতে পড়ে গেল বেচারা। মাথার পেছনে তীব্র ব্যথা...চোখে তারা দেখছে।
আচ্ছন্নের মতো কিছুক্ষণ পড়ে রইল হল। ধাতস্থ হওয়ার পর তাকাল র৵াকের দিকে। খুনে তোয়ালেটা স্থির হয়ে আছে বাকিগুলোর মতো। পাশাপাশি ঝুলছে তিনটে তোয়ালে—একইভাবে, অনড়। তবে কি পুরোটাই ওর কল্পনা?
কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল সে, মাথার পেছনটা ঘষল। সাবধানে তোয়ালেগুলোকে এড়িয়ে বেরিয়ে এল শাওয়ার থেকে। কামরায় ঢুকে ডিসপেনসার থেকে নতুন আরেকটা তোয়ালে নিল, হাতের মধ্যে নেড়েচেড়ে দেখে নিল ওটা। তারপর মুছে ফেলল ভেজা শরীর। শুরু করল কাপড় পরতে।
তখনই দেখা দিল নতুন বিপদ। জ্যান্ত হয়ে উঠল ওর বেল্টটা। এমনভাবে কোমর পেঁচিয়ে ধরল, যেন গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে হাড়গোড়। বেল্টটা যথেষ্ট শক্ত, লোহার পাত লাগানো ওতে। হাঁসফাঁস করে উঠল হল, গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। টান দিয়ে বেল্টটা খুলে ছুড়ে ফেলল দূরে। সাপের মতো আবার ছুটে এল ওটা, চাবুকের মতো আঘাত করতে শুরু করল তাকে। কোনোমতে ব্লাস্টার পিস্তলের কাছে পৌঁছাল হল।
সঙ্গে সঙ্গে পিটটান দিল বেল্ট। কিন্তু ওটাকে পালাতে দিল না সে, ব্লাস্টারের এক গুলিতে ধ্বংস করে দিল।
হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ারে বসল হল। পরক্ষণে আঁতকে উঠল। চেয়ারের হাতা দুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে ওকে। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। টানা ছয়বার গুলি করতে হলো চেয়ারটাকে ধ্বংস করতে।
হতভম্বের মতো কামরার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল হল। অর্ধনগ্ন অবস্থায়। হাপরের মতো ওঠানামা করছে বুক।
‘কী ঘটছে এসব!’ ফিসফিসাল সে। ‘আমি কি সত্যি পাগল হয়ে গেছি?’
তাড়াতাড়ি পোশাক পরে নিল হল, বেরিয়ে পড়ল কামরা থেকে। লিফটে চেপে উঠে এল বিল্ডিংয়ের একদম ওপরতলায়।
স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ফটক পার হওয়ার সময় সতর্কতামূলক ঘণ্টি বাজল। কমান্ডারের অফিসে ঢুকতেই মুখ তুলে তাকাল স্টেলা।
‘তুমি অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছ কেন?’ কৈফিয়ত তলবের ভঙ্গিতে জানতে চাইল সে।
হাতে ধরা ব্লাস্টারটার দিকে তাকাল হল। অস্ত্রটা নামিয়ে রাখল ডেস্কে। ‘দুঃখিত, কমান্ডার।’
‘তোমার সমস্যাটা কী? টেস্টিং মেশিন থেকে রিপোর্ট এসেছে আমার কাছে—তোমার মধ্যে নাকি উচ্চ মাত্রার মানসিক বিশৃঙ্খলা লক্ষ করা গেছে।’ শান্ত চোখে হলকে জরিপ করল কমান্ডার। ‘আমি তোমার পুরোনো বন্ধু, লরেন্স। কী হয়েছে, তা অন্তত আমাকে খুলে বলো।’
হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ারে বসল হল। পরক্ষণে আঁতকে উঠল। চেয়ারের হাতা দুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে ওকে। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। টানা ছয়বার গুলি করতে হলো চেয়ারটাকে ধ্বংস করতে।
বড় করে শ্বাস নিল হল। বলল, ‘স্টেলা, কয়েক ঘণ্টা আগে ল্যাবের একটা মাইক্রোস্কোপ আমার গলা টিপে ধরেছিল।’
স্টেলার নীল চোখজোড়া যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। ‘কী বললে?’
‘শুধু তা-ই নয়। একটু আগে, আমি যখন গোসল সেরে বেরোচ্ছিলাম, একটা তোয়ালে আমাকে আক্রমণ করে বসল। কোনোমতে ফাঁকি দিয়েছি ওটাকে। কাপড় পরার সময় আমার বেল্টটা...’
আর শোনার প্রয়োজন মনে করল না স্টেলা। চেয়ার ছেড়ে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। কড়া গলায় ডাকল, ‘গার্ড!’
‘দাঁড়াও, স্টেলা!’ মরিয়া কণ্ঠে বলল হল। ‘আমার কথাটা তো শোনো। একবিন্দু মিথ্যা বলছি না। ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। চার-চারবার হামলা হয়েছে আমার ওপর। আর তা করেছে সাধারণ ব্যবহার্য জিনিস। হঠাৎই জ্যান্ত হয়ে উঠেছে ওগুলো। হতে পারে এই গ্রহে আমরা যা খুঁজছি, এগুলো তারই নমুনা। হয়তো...’
‘তাই বলে আমাকে এটা বিশ্বাস করতে হবে যে একটা মাইক্রোস্কোপ তোমাকে খুন করতে চেয়েছে?’
‘বললাম তো, হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল ওটা, আমার গলা পেঁচিয়ে ধরেছিল।’
দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল কামরায়। অবশেষে স্টেলা জিজ্ঞেস করল, ‘এই ঘটনা তুমি ছাড়া আর কেউ দেখেছে?’
‘না।’
‘তুমি তখন কী করলে?’
‘ব্লাস্টার দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছি ওটাকে।’
‘টুকরাগুলো কী করেছ?’
‘কিচ্ছু না। কারণ, ছিলই না কোনো টুকরা। আরও অবাক ব্যাপার কি জানো, পরে মাইক্রোস্কোপের বাক্সের ভেতরেই আবার অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কার করেছি ওটাকে।’
‘হুম,’ মাথা ঝাঁকাল স্টেলা। দুজন নিরাপত্তারক্ষী এসে ঢুকেছে তার ডাক শুনে, তাদের দিকে তাকাল। ‘মেজর হলকে ক্যাপ্টেন টেলরের কাছে নিয়ে যাও। আটকে রাখতে বলবে। মেজরকে চিকিত্সার জন্য ফেরত পাঠাতে হবে পৃথিবীতে।’

এগিয়ে এসে হলের হাতে ম্যাগনেটিক হাতকড়া লাগিয়ে দিল রক্ষীরা।
‘আ...আমাকে গ্রেপ্তার করছ?’ হল হতভম্ব।
‘দুঃখিত, মেজর,’ বলল স্টেলা। ‘খুব অবিশ্বাস্য একটা গল্প শোনাচ্ছ তুমি। যতক্ষণ না সেটা সত্যি বলে প্রমাণিত হচ্ছে, আমাকে ধরে নিতে হবে মানসিক বিকার ঘটেছে তোমার। আর বিকারগ্রস্ত একজন মানুষকে আমি ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে দিতে পারি না। কী থেকে কী করে ফেলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
হলকে নিয়ে দরজার দিকে এগোল রক্ষীরা। বাধা দিল না সে। মাথা ঘোরাচ্ছে তার। কে জানে, স্টেলার কথাই হয়তো ঠিক। সত্যিই হয়তো বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে সে।
বন্দীকে নিয়ে ক্যাপ্টেন টেলরের অফিসের সামনে পৌঁছাল রক্ষীরা। বাজার টিপল একজন।
‘পরিচয়?’ জানতে চাইল রোবোটিক দরজা।
নিজের নাম-পদবি জানাল রক্ষী। তারপর বলল, ‘কমান্ডার মরিসনের হুকুমে এসেছি। ক্যাপ্টেন টেলরের হাতে একজন রোগীকে তুলে দিতে হবে।’
একটু যেন ইতস্তত করল দরজা। ‘ক্যাপ্টেন এখন ব্যস্ত।’
‘কিন্তু এটা একটা ইমার্জেন্সি।’
আবারও দ্বিধা করল রোবট। ‘কমান্ডার পাঠিয়েছেন তোমাদের?’
‘হ্যাঁ। খোলো!’
‘বেশ, তাহলে ঢুকতে পারো।’ তালা খোলার আওয়াজ হলো, রোবট হার মেনেছে।
দরজার পাল্লা ঠেলে মেজরকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল দুই রক্ষী, পরক্ষণে থমকে গেল।
মেঝেতে পড়ে আছে ক্যাপ্টেন টেলর—নীল হয়ে গেছে মুখ, চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। শুধু মাথা আর পা বেরিয়ে আছে তার, শরীরের বাকি অংশ পেঁচিয়ে আছে একটা কার্পেটে। বেচারাকে চেপে ধরেছে সেই কার্পেট, ক্রমে ছোট হয়ে আসছে কুণ্ডলী, যেন পিষে ফেলতে চাইছে দেহটাকে।
‘কিচ্ছু না। কারণ, ছিলই না কোনো টুকরা। আরও অবাক ব্যাপার কি জানো, পরে মাইক্রোস্কোপের বাক্সের ভেতরেই আবার অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কার করেছি ওটাকে।’
দুই লাফে ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে পৌঁছাল হল, টানতে শুরু করল কার্পেটের একটা প্রান্ত। ঘাড় ফিরিয়ে গর্জে উঠল, ‘হাত লাগাও! জলদি!’
তিনজনে মিলে শুরু করল টানাটানি। কিন্তু ছুটতে চায় না কার্পেট।
‘বাঁচাও!’ কোনোমতে বলল টেলর।
‘চেষ্টা করছি,’ বলল হল। পাগলের মতো কার্পেটের কিনার ধরে টানছে সে আর দুই রক্ষী। হঠাৎ ছুটে এল ওটা। তাল হারিয়ে পেছন দিকে পড়ে গেল ওরা। কার্পেটটা পতাকার মতো পতপত করতে করতে ছুট লাগাল দরজার দিকে। কিন্তু রুম থেকে বেরোনোর আগেই ব্লাস্টার দিয়ে ওটাকে গুলি করল এক রক্ষী। ধুলায় মিলিয়ে গেল খুনে কার্পেট।
উঠে পড়ল হল। দেয়ালের কাছে গিয়ে ভিডিও স্ক্রিনে কমান্ডারের নম্বর ডায়াল করল। একমুহূর্ত পরই পর্দায় ভেসে উঠল স্টেলার চেহারা।
‘দেখো কাণ্ড।’ সরে গিয়ে ক্যামেরায় টেলরকে দেখতে দিল হল। এখনো মেঝেতে পড়ে আছে সে। দুই রক্ষী হাঁটু গেড়ে বসে আছে পাশে। তাদের হাতে উদ্যত ব্লাস্টার।
‘কী হয়েছে ক্যাপ্টেন টেলরের?’ বিস্মিত গলায় জানতে চাইল স্টেলা।
‘হামলার শিকার হয়েছে। আর হামলাটা করেছে একটা কার্পেট। তোমার ওই দুই গার্ড সাক্ষী।’ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল হলের। ‘এবার কাকে পাগল বলবে?’
‘আমি এক্ষুনি রক্ষীদের একটা টিম পাঠাচ্ছি ওখানে,’ বলল স্টেলা। ‘কিন্তু কীভাবে...’
‘ওসব নিয়ে পরে মাথা ঘামানো যাবে। রক্ষীদের বলে দিও, অস্ত্র যেন সব সময় তৈরি থাকে। অন্যদেরও সতর্ক করা দরকার।’
কয়েক ঘণ্টা পর।
কমান্ডার মরিসনের ডেস্কে একে একে চারটা জিনিস নামিয়ে রাখল হল। একটা মাইক্রোস্কোপ, একটা তোয়ালে, একটা কোমরের বেল্ট আর একটা লাল-নীল রঙের কার্পেট।
সভয়ে পিছিয়ে গেল স্টেলা। ‘মেজর, তুমি কি নিশ্চিত, এগুলো...’
‘সম্পূর্ণ নিরাপদ—অন্তত এ মুহূর্তে,’ বলল হল। ‘সেটাই সবচেয়ে অবাক ব্যাপার। তোয়ালেটার কথাই ধরো, কয়েক ঘণ্টা আগে এটাই খুন করতে যাচ্ছিল আমাকে...আমি নিজে গুলি করে বাতাসে মিলিয়ে দিয়েছিলাম ওটাকে। কিন্তু এখন আবার ভোজবাজির মতো ফিরে এসেছে। সব সময় যেমন থাকে, সে অবস্থাতেই। প্রাণহীন, কারও ক্ষতি করতে অক্ষম।’
কার্পেটটার ওপরে হাত বোলাল ক্যাপ্টেন টেলর, হলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। বলল, ‘কার্পেটটা আমার। পৃথিবী থেকে নিয়ে এসেছি। আমার স্ত্রী উপহার দিয়েছিল। আ...আমি ভাবতেই পারিনি...’
‘তোমার কার্পেটটাকেও ভস্ম করে দেওয়া হয়েছিল, টেলর,’ বলল হল।
‘তাহলে অক্ষত অবস্থায় আবার পাওয়া গেল কীভাবে?’
কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর হল বলল, ‘এর একটাই ব্যাখ্যা। এই কার্পেট বা তোয়ালে আক্রমণ করেনি আমাদের। করেছে অন্য কিছু, যেগুলো দেখতে ঠিক এই জিনিসগুলোর মতো।’
‘তুমি শিওর?’ জিজ্ঞেস করল স্টেলা।
‘জিনিসগুলোর ওপর যত ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব, সব করেছি আমরা। অস্বাভাবিক কিছু পাইনি। প্রতিটি অণু-পরমাণু ঠিক আছে। আর যা-ই ঘটুক, এগুলো জ্যান্ত হয়ে ওঠেনি।’
‘তাহলে কিসে হামলা করল আমাদের ওপর?’ হতভম্ব গলায় বলল টেলর।
কার্পেটটার ওপরে হাত বোলাল ক্যাপ্টেন টেলর, হলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। বলল, ‘কার্পেটটা আমার। পৃথিবী থেকে নিয়ে এসেছি। আমার স্ত্রী উপহার দিয়েছিল। আ...আমি ভাবতেই পারিনি...’
গ্লাভসের খোঁজে ড্রেসারের ড্রয়ার হাতড়াচ্ছে লেফটেন্যান্ট ডডস। তাড়াহুড়া করছে সে। জরুরি সমাবেশ ডাকা হয়েছে, সেখানে যেতে হবে এক্ষুনি।
‘রাখলাম কোথায়?’ বিড়বিড় করল সে। পরমুহূর্তে চমকে উঠল। ‘একি!’
বিছানার ওপর পাশাপাশি পড়ে আছে দুই জোড়া গ্লাভস—হুবহু এক!
মাথা চুলকাল ডডস। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না। এক জোড়াই গ্লাভস ওর, অন্য জোড়াটা এল কোত্থেকে? ওয়েসলি ফেলে যায়নি তো? গত রাতে তাস খেলার জন্য এসেছিল সে।
ভিডিও স্ক্রিন সচল হয়ে উঠল। শোনা গেল বার্তা: ‘অ্যাটেনশন, অল পারসোনেল। আর কিছুক্ষণের ভেতরেই শুরু হবে জরুরি সমাবেশ। সবাইকে এখনই তাতে যোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।’
‘বুঝেছি বুঝেছি, বারবার বলতে হবে না!’ বিরক্তি প্রকাশ করল ডডস। ছোঁ মেরে বিছানা থেকে তুলে নিল এক জোড়া গ্লাভস—ওটা ওয়েসলির হলেও কিছু যায়-আসে না। ঝটপট পরে ফেলল দুই হাতে।
তখনই গ্লাভস দুটোর মধ্যে নড়াচড়া অনুভব করল সে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার ডান হাতটা নেমে গেল নিচে, মুঠো করে ধরল পিস্তলের বাঁট, বের করে আনল হোলস্টার থেকে। বিস্মিত চোখে অস্ত্রের নলটা নিজের বুকের দিকে ঘুরে যেতে দেখল।
‘অ্যাই, হচ্ছেটা কী!’ ধমকে উঠল ডডস।
পরমুহূর্তে তার আঙুল নড়ে উঠল, চেপে দিল ট্রিগার। বিস্ফোরণের মতো একটা আওয়াজ হলো। ডডসের বুকের অর্ধেকটা গায়েব হয়ে গেল সেই সঙ্গে। দেহের বাকি অংশটা আছড়ে পড়ল মেঝেতে। বেচারার প্রাণহীন মুখটায় তখনো ফুটে রয়েছে অপার বিস্ময়।
ইমার্জেন্সি অ্যালার্মের আওয়াজ শুনেই মূল ভবনের দিকে ছুট লাগিয়েছে করপোরাল টেনার। ভবনের ফটকে পৌঁছে ধাতব পাত লাগানো বুটজোড়া খুলে ফেলতে হলো। এরপরই ভুরু কুঁচকে গেল তার। দরজার সামনে হুবহু দুটি সেফটি ম্যাট বিছানো।
কাঁধ ঝাঁকাল সে। দুটি থাকলেই–বা কী? একটা ম্যাটের ওপর গিয়ে দাঁড়াল। ম্যাটের সারফেস থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলো তার পায়ের ওপর দিয়ে—বাইরে থেকে যদি কোনো ক্ষতিকর জীবাণু লেগে থাকে ত্বকে, তা পরিষ্কার করা হচ্ছে। শিরশিরে অনুভূতিটা থেমে গেলে বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়ল সে।
‘বুঝেছি বুঝেছি, বারবার বলতে হবে না!’ বিরক্তি প্রকাশ করল ডডস। ছোঁ মেরে বিছানা থেকে তুলে নিল এক জোড়া গ্লাভস—ওটা ওয়েসলির হলেও কিছু যায়-আসে না। ঝটপট পরে ফেলল দুই হাতে।
খানিক পর সেখানে হাজির হলো লেফটেন্যান্ট ফুলটন। বুট খুলে দ্বিতীয় ম্যাটটার ওপর উঠে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে ভাঁজ হয়ে গেল ম্যাটটা, চেপে ধরল তার পা।
‘আরে! হচ্ছেটা কী!’ বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল ফুলটন। ‘ছাড়ো বলছি!’
টান দিয়ে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করল সে, একবিন্দু আলগা হলো না ম্যাটের বাঁধন। হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করল, কিন্তু নিজের পায়ে কি আর গুলি করা যায়?
‘অ্যাই! কে আছ? বাঁচাও!’ চেঁচিয়ে উঠল ফুলটন।
দুজন সৈনিক দৌড়ে এল।
‘কী হয়েছে, লেফটেন্যান্ট?’
‘দেখতে পাচ্ছ না? হতচ্ছাড়া ম্যাটটা জড়িয়ে গেছে পায়ে। জলদি ছাড়াও ওটাকে।’
হাসতে শুরু করল দুই সৈনিক।
‘মশকরা করছি না আমি,’ বলল ফুলটন, আচমকা রক্ত সরে গেছে তার মুখ থেকে। ‘আমার পা ভেঙে ফেলছে...’
চিত্কার শুরু করল সে। এতক্ষণে হুঁশ হলো সৈনিকদের। ঝুঁকে ম্যাটের কিনার ধরে টানাটানি শুরু করল তারা।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ফুলটন, গড়াগড়ি দিতে থাকল চেঁচাতে চেঁচাতে। বহু কষ্টে ম্যাটের একটা পাশ খুলে আনল সৈনিকেরা, তবে ততক্ষণে লেফটেন্যান্টের দুই পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভর্তা হয়ে গেছে, থেঁতলানো মাংসের ভেতর থেকে উঁকি দিতে শুরু করেছে গুঁড়া গুঁড়া হাড়।
‘আমরা এখন জানি,’ গম্ভীর গলায় বলল হল, ‘এরা একধরনের জীব।’
করপোরাল টেনারের দিকে ফিরল স্টেলা। ‘বিল্ডিংয়ে ঢোকার সময় তুমি দুটি ম্যাট দেখেছিলে?’
‘জি, কমান্ডার। ওগুলোর একটার ওপরে দাঁড়িয়েই পা জীবাণুমুক্ত করেছি আমি, তারপর ঢুকেছি ভেতরে।’
‘কপাল ভালো তোমার, ঠিকটায় পা দিয়েছিলে। বেচারা ফুলটন...’
‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে,’ বলল হল। ‘খেয়াল রাখতে হবে, কোনো জিনিসের ডুপ্লিকেট চোখে পড়ে কি না। এই জীবটা যা-ই হোক না কেন, যেকোনো জিনিসের রূপ ধারণ করতে পারে। সোজা কথায়, অনুরূপী।’
‘অনুরূপী?’ শঙ্কিত চোখে নিজের ডেস্কের দিকে তাকাল স্টেলা, একই ধরনের দুটো ফুলদানি সাজিয়ে রাখা। ‘এদের চেনা যাবে কী করে? এখানে অনেক কিছুই জোড়ায় জোড়ায় রাখা। জোড়ার কথা বাদ দাও, কত কিছুই তো সারি সারি অবস্থায় আছে। সেসবের ভেতরে গিয়ে যদি লুকায়, চিনব কী করে?’
‘হ্যাঁ, সমস্যাটা জটিল,’ স্বীকার করল হল। ‘চোখের দেখায় নকলের সঙ্গে আসলের কোনো তফাত করা যায় না। ল্যাবে মাইক্রোস্কোপটাকে দেখে আমি কিচ্ছু বুঝিনি, একদম আসলটার মতো ছিল ওটা।’
বহু কষ্টে ম্যাটের একটা পাশ খুলে আনল সৈনিকেরা, তবে ততক্ষণে লেফটেন্যান্টের দুই পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভর্তা হয়ে গেছে, থেঁতলানো মাংসের ভেতর থেকে উঁকি দিতে শুরু করেছে গুঁড়া গুঁড়া হাড়।
ফুলদানি দুটোর দিকে ইশারা করল স্টেলা। ‘এগুলোর মধ্যে লুকিয়ে নেই তো?’
‘আগে কি দুটো ফুলদানি ছিল না এখানে?’
‘কী জানি। মনে করতে পারছি না।’
‘এটা আরেক সমস্যা। সারাক্ষণ তো আর চারপাশের জিনিস গুনি না আমরা। ওই যে আমার রুমে একটা বাড়তি চেয়ার দেখা দিয়েছে, সেটা বুঝতেই পারিনি। ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছিলাম।’
ভিডিও স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল। দেখা গেল ভাইস কমান্ডার উডের চেহারা। ‘আরেকজন ভিকটিম পাওয়া গেছে, স্টেলা।’
‘কে?’
‘লেফটেন্যান্ট ডডস। ব্লাস্টারের গুলিতে শরীরের অর্ধেকটা উড়ে গেছে তার।’
‘এ নিয়ে তিনজন,’ হতাশায় মাথা দোলাল স্টেলা।
‘আমাদের প্রতিপক্ষ যদি জীব হয়ে থাকে, তাকে নিশ্চয়ই হত্যা করা যাবে,’ বলল হল। ‘কয়েকটাকে তো ইতিমধ্যে খতম করেছি আমরা। আরও কতগুলো আছে, কে জানে। কী ধরনের জীব, সেটাই তো জানি না। হয়তো কোনো শেষ নেই এদের। প্রোটোপ্লাজমের মতো...অসীমভাবে বিভাজ্য।’
‘বকবকানি থামাবে?’ বিরক্ত গলায় বলল স্টেলা। ‘এখন কী করা যায়, সেটা বলো।’
‘কী বলব? আমরা ফাঁদে পড়ে গেছি। আমাদের বাঁচা–মরা সম্পূর্ণভাবে ওদের হাতে। প্রাণঘাতী জীব খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম না? এরাই সেটা। এখন বুঝতে পারছি, গ্রহের বাকি সবকিছু এমন নিরীহ কেন। এই ভয়ংকর অনুরূপীদের সামনে কিছুই টিকতে পারে না। বিপজ্জনক বহু জীব আর প্রাণী দেখেছি জীবনে, কিন্তু এতটা দেখিনি।’
‘এদের তো খতম করা যাবে। তুমি নিজেই তা বলেছ। তার মানে আমাদের একটা সুযোগ আছে।’
‘যদি ওদের খুঁজে বের করা যায় আরকি।’ কামরার ভেতরে নজর বোলাল হল। দরজার পাশে দুটো কোট ঝুলছে। রুমে যখন ঢুকল, তখনো কি দুটোই ছিল? মনে পড়ছে না।
কপালে হাত ঘষল সে। ‘জীবাণুনাশকের মতো কোনো বিষ বা গ্যাস দরকার আমাদের, যাতে ঝাঁকে ঝাঁকে এদের ধ্বংস করতে পারি। কখন হামলা চালাবে, সে অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। স্প্রে–জাতীয় কিছু হলে ভালো হয়। মঙ্গল গ্রহে আমরা এভাবে বিষাক্ত পোকার পাল মেরেছিলাম।’

তার কথা যেন কানে গেল না স্টেলার। একদৃষ্টে আরেক দিকে তাকিয়ে আছে সে।
হলও ওদিকে তাকাল। ‘কী দেখছ, বলো তো?’
‘কোনায় দুটো ব্রিফকেস রাখা, দেখেছ?’ বলল স্টেলা।
‘আগে কি একটা ছিল?’
‘জানি না।’ হতাশায় মাথা দোলাল স্টেলা। ‘মাথাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে বোধ হয়। সবকিছুকেই সন্দেহ করছি।’
‘কড়া একটা ড্রিঙ্ক দরকার তোমার। নার্ভ শান্ত হবে।’
‘হয়তো ঠিকই বলেছ। কিন্তু...’
‘কিন্তু কী?’
‘ড্রিঙ্ক করতে হলে তো গ্লাস ধরতে হবে। এ মুহূর্তে কিচ্ছু ধরতে চাই না আমি।’ কোমরে গোঁজা ব্লাস্টারে হাত বোলাল স্টেলা। ‘বরং এটা দিয়ে সবকিছু উড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করছে।’
‘আতঙ্কিত হয়ে আছ তো, এমন অবস্থায় এ ধরনের চিন্তা আসা স্বাভাবিক। শত্রুরা একে একে হত্যা করছে আমাদের, আতঙ্কিত না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক।’
হেডফোনে জরুরি ডাক পেয়ে কাজকর্ম শিকেয় উঠল ক্যাপ্টেন আঙ্গারের। গ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে বেরিয়েছিল, ডাক শুনে যে কয়টা স্পেসিমেন পেয়েছে, তা-ই দুই হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি ছুট লাগাল।
গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেই থমকে দাঁড়াল সে। গাড়িটা আরও দূরে পার্ক করেছিল, যত দূর মনে পড়ে। তাহলে এখানে এল কীভাবে? তীক্ষ্ণ চোখে খুঁটিয়ে দেখল সে। গাড়িটা তারই। অনেকটা ত্রিভুজের মতো আকৃতি, নীল রং করা, খাঁজকাটা চাকাগুলো বসে আছে নরম মাটির গায়ে। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
‘ড্রিঙ্ক করতে হলে তো গ্লাস ধরতে হবে। এ মুহূর্তে কিচ্ছু ধরতে চাই না আমি।’ কোমরে গোঁজা ব্লাস্টারে হাত বোলাল স্টেলা। ‘বরং এটা দিয়ে সবকিছু উড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করছে।’
নিজেই হয়তো ভুল করছে ভেবে কাঁধ ঝাঁকাল আঙ্গার। এগিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের স্টোরেজ কম্পার্টমেন্ট খুলল, তাতে নামিয়ে রাখল স্পেসিমেনগুলো। এরপর গিয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। দরজা টেনে বন্ধ করে টিপে দিল সুইচ।
অবাক ব্যাপার, চালু হলো না ইঞ্জিন। কোনো সমস্যা? কন্ট্রোল প্যানেল চেক করতে শুরু করল, আর তখনই চোখ পড়ল উইন্ডশিল্ডের ওপারে। চমকে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। কয়েক শ গজ দূরে, গাছপালার ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে নীল রঙের আরেকটা গাড়ি। যেটায় ও বসে আছে, হুবহু একই। এতক্ষণে মনে পড়ল, ওখানেই নিজের গাড়ি পার্ক করেছিল সে।
তবে কার গাড়িতে এসে উঠল? ইউনিটের অন্য কোনো সদস্য? তার মতো সে-ও হয়তো নমুনা সংগ্রহের জন্য এসেছে। তাহলে দেখা হলো না কেন? এসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে, ভাবল সে। ভুল গাড়িতে উঠেছে, নেমে যাওয়া দরকার, তাই হাতল চেপে খুলতে চাইল দরজা।
লাভ হলো না। একচুল নড়ল না দরজা; বরং চেপে এল তার দিকে। হতভম্ব হয়ে আঙ্গার লক্ষ করল, শুধু দরজা নয়, গাড়ির ড্যাশবোর্ড, ছাদ, সিট, মেঝে...সব সংকুচিত হতে শুরু করেছে। এখন আর নিরেট নয় ওগুলো, তরলে পরিণত হচ্ছে...থিকথিকে, ঘন তরল। তার মধ্যে আটকা পড়ল সে। হাত-পা ছুড়ে মুক্ত হতে চাইল, পারল না। থিকথিকে তরলটা পুরোপুরি জড়িয়ে ধরল তাকে।
এবার শুরু হলো তীব্র যন্ত্রণা। যেন পুড়ে যাচ্ছে তার পুরো শরীর, গলে যাচ্ছে! ভয়ংকর সত্যটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পেল আঙ্গার—থিকথিকে তরলটা সাধারণ কোনো তরল নয়, প্রচণ্ড শক্তিশালী কোনো অ্যাসিড। পাকস্থলীর ভেতরে যেভাবে খাবার পরিপাক হয়, সেভাবে পরিপাক হয়ে যাচ্ছে সে।
আতঙ্কে, যন্ত্রণায় চিত্কার করে উঠল আঙ্গার, কিন্তু থিকথিকে অ্যাসিডের আবরণ পেরিয়ে সে চিত্কার পৌঁছাল না বাইরে।
‘অ্যাই, এদিকে তাকিয়ো না,’ চেঁচিয়ে বলল গেইল টমাস।
‘কেন?’ হাসিমুখে জানতে চাইল করপোরাল হেনড্রিক্স, সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে গেল তার দিকে। ‘তাকাব
না কেন?’
‘কারণ, আমি এখন পানি থেকে উঠব।’
সূর্যের আলো সরাসরি পড়ছে হ্রদের বুকে, সোনারঙা রোদ ঝিলমিল করছে পানির গায়ে। চারদিক ঘিরে রেখেছে শেওলায় ঢাকা বড় বড় গাছ, মাথাগুলো উঠে গেছে আকাশের পানে। মনে হচ্ছে যেন ঝোপঝাড় আর লতাপাতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অতিকায় অসংখ্য স্তম্ভ।
পানি ছেড়ে তীরে উঠে গেল গেইল, গা থেকে পানি ঝরাল, চোখের ওপর থেকে সরাল ভেজা চুল। চারপাশের অরণ্য একেবারে নিস্তব্ধ, হ্রদের পানিতে ঢেউয়ের আওয়াজ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। ইউনিট ক্যাম্প থেকে বহুদূরে রয়েছে ওরা।
‘কখন তাকাতে পারব?’ জানতে চাইল হেনড্রিক্স। চোখ বন্ধ করে পানিতে ভাসছে সে।
‘শিগগিরই।’ লম্বা লম্বা পা ফেলে গাছপালার আড়ালে চলে এল গেইল, ওখানেই রেখে গেছে ওর ইউনিফর্ম। ভেজা শরীরে রোদের উষ্ণতা অনুভব করল সে, ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে তুলে নিল টিউনিক আর প্যান্ট। সেগুলোর গায়ে মরা পাতা আর ধুলা লেগে আছে; ঝেড়ে নিল একটু। তারপর পরতে শুরু করল।
এখন আর নিরেট নয় ওগুলো, তরলে পরিণত হচ্ছে...থিকথিকে, ঘন তরল। তার মধ্যে আটকা পড়ল সে। হাত-পা ছুড়ে মুক্ত হতে চাইল, পারল না। থিকথিকে তরলটা পুরোপুরি জড়িয়ে ধরল তাকে।
পানিতে তখনো ভাসছে হেনড্রিক্স। বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্থির হয়ে উঠল। গলা চড়িয়ে জানতে চাইল, ‘হয়নি তোমার?’
জবাব নেই।
চোখ খুলে ফেলল হেনড্রিক্স। তাকাল চারদিকে। গেইলকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও।
‘গেইল?’ ডাকল সে।
নীরবতা।
‘গেইল!’
সাড়া নেই।
হাত-পা ছুড়ে তীরের দিকে এগিয়ে গেল হেনড্রিক্স। হাঁচড়ে–পাঁচড়ে উঠে পড়ল পানি থেকে। তীরের কাছেই নিজের ইউনিফর্ম রেখেছে, দৌড়ে গেল সেখানে। তুলে নিল ব্লাস্টার।
‘গে-ই-ই-ই-ল!’ গলা ফাটিয়ে আবারও ডাক ছাড়ল সে।
নিথর হয়ে আছে অরণ্য। কোনো শব্দ নেই। হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল হেনড্রিক্স। ফ্যালফ্যাল করে চোখ বোলাচ্ছে চারপাশে। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার পরও খানিক পর ভয়ের একটা শীতল অনুভূতি গ্রাস করল তাকে।
‘গেইল, কোথায় তুমি? গেইল!’ চেঁচাতে চেঁচাতে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।
জবাবে নৈঃশব্দ্য ছাড়া আর কিছুই পেল না।
উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার চরমে পৌঁছে গেছে স্টেলা। ‘কিছু করা দরকার আমাদের,’ বলল সে। ‘এভাবে তো বসে থাকা যায় না। এখন পর্যন্ত ত্রিশটা হামলার রিপোর্ট পেয়েছি। আমাদের দশজনকে হারিয়েছি।’
ল্যাবে দাঁড়িয়ে আছে সে। এক পাশে কাজ করছে হল। মুখ তুলে বলল, ‘শত্রুর পরিচয় মোটামুটি আন্দাজ করতে পারছি। আমার পরীক্ষা বলছে, অনুরূপীরা একধরনের প্রোটোপ্লাজম। একটা কোষ থেকেই লক্ষকোটি কোষ তৈরি করতে পারে।’ একটা স্প্রে ট্যাংক তুলল সে। ‘ছোট্ট একটা পরীক্ষা চালানো যাক। তাহলে ওদের ব্যাপারে আরও পরিষ্কার ধারণা পাব।’
‘ট্যাংকের ভেতরে কী?’ জানতে চাইল স্টেলা।
‘আর্সেনিক আর হাইড্রোজেনের মিশ্রণ। আর্সাইন গ্যাস বলে একে।’
‘এই গ্যাস কী কাজে লাগবে?’
মাথায় হেলমেট পরে নিল হল। হেলমেটের ভেতরে লাগানো মাইক্রোফোনের সাহায্যে বলল, ‘পুরো ল্যাবে গ্যাসটা ছড়িয়ে দেব আমি। যদি ভুল না করে থাকি, এখানেই ওদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।’
‘এখানে কেন?’
‘কারণ, গ্রহ থেকে সংগ্রহ করা সব নমুনা সবার আগে এই ল্যাবে আনা হয়। সম্ভবত কোনো নমুনার পিঠে চড়েই ওরা অনুপ্রবেশ করেছে আমাদের ক্যাম্পে, তারপর ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে।’
মাথায় হেলমেট পরে নিল হল। হেলমেটের ভেতরে লাগানো মাইক্রোফোনের সাহায্যে বলল, ‘পুরো ল্যাবে গ্যাসটা ছড়িয়ে দেব আমি। যদি ভুল না করে থাকি, এখানেই ওদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।’
নিজের হেলমেট পরে নিল স্টেলা। চারজন গার্ড রয়েছে তার সঙ্গে, তারাও পরল।
‘আর্সাইন তো মনে হয় মানুষের জন্য প্রাণঘাতী, তাই না?’ জানতে চাইল স্টেলা। কণ্ঠে শঙ্কা।
মাথা ঝাঁকাল হল। ‘হ্যাঁ। তবে আমরা সতর্ক থাকব। খুব বেশি গ্যাস ছাড়ব না।’ নব ঘুরিয়ে হেলমেটের ভেতরে অক্সিজেনের প্রবাহ ঠিক করে নিল সে।
‘তোমার এই পরীক্ষা থেকে কী প্রমাণিত হবে?’ জানতে চাইল স্টেলা।
‘আর কিছু না হোক, ওদের অনুপ্রবেশটা কোন মাত্রার, মানে ছোট্ট একটা জায়গায় কতগুলো অনুরূপী থাকতে পারে, তা বোঝা যাবে। ওদের ক্ষমতা সম্পর্কেও জানব। আমরা যতটা ভাবছি, বিষয়টা তার চেয়ে অনেক গুরুতর হতে পারে।’
‘কীভাবে?’
‘প্ল্যানেট ব্লুতে এক শ মানুষ নিয়ে নেমেছি আমরা। কী আর হবে আমাদের...বড়জোর খুন হয়ে যাব ওদের হাতে। সেটা বিশাল কোনো ব্যাপার নয়। মহাকাশ অভিযানে এসে এ রকম অনেক ইউনিট আগেও বহুবার হারিয়ে গেছে। অচেনা গ্রহে নামলে বিপদ ঘটতেই পারে।’
‘তাহলে সমস্যা গুরুতর বলছ কেন?’
‘অনুরূপীদের কথা ভাবছি। একটা কোষ থেকে যদি সত্যি সত্যি লক্ষকোটি কোষ তৈরি হতে পারে, তাহলে এই গ্রহ ছেড়ে আমাদের পালানো উচিত হবে না। আমাদের সঙ্গে যদি একটা কোষও এই গ্রহ ছেড়ে বেরোতে পারে, পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে যাবে।’
‘তুমি নিশ্চিত?’
‘সেটাই পরীক্ষা করে দেখছি। হতে পারে, ওদের সংখ্যা খুব বেশি নয়; আবার এমনও হতে পারে, সবখানে রয়েছে ওরা।’ হাত নেড়ে ল্যাবের ভেতরটা দেখাল হল। ‘হয়তো এই ঘরের অর্ধেক জিনিসই নকল। এরা আমাদের আক্রমণ করে বসলে বিপদ; আর যদি না করে, সেটা আরও ভয়াবহ।’
‘কেন?’
‘এদের অনুকরণ করার ক্ষমতা প্রায় নিখুঁত। অন্তত জড়বস্তুর ক্ষেত্রে আরকি। তোমাকে তো বলেছি, স্টেলা, নকল মাইক্রোস্কোপটা ব্যবহার করছিলাম আমি, ওতে একবিন্দু খুঁত ছিল না। আসল মাইক্রোস্কোপের মতোই লেন্স অ্যাডজাস্ট করা যাচ্ছিল, ইমেজ ছোট-বড় করা যাচ্ছিল। এমন ডুপ্লিকেটও যে হতে পারে, তা কল্পনাতীত। একটা জিনিসের অণু-পরমাণু পর্যন্ত অনুকরণ করা হচ্ছে!’
মাথা ঝাঁকাল হল। ‘হ্যাঁ। তবে আমরা সতর্ক থাকব। খুব বেশি গ্যাস ছাড়ব না।’ নব ঘুরিয়ে হেলমেটের ভেতরে অক্সিজেনের প্রবাহ ঠিক করে নিল সে।
‘তার মানে ওরা আমাদের যেকোনো ইকুইপমেন্ট, এমনকি জামাকাপড়ের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছে যেতে পারে!’ বিপদের স্বরূপ বুঝতে পেরে কেঁপে উঠল স্টেলার গলা।
‘হ্যাঁ। সেটাই বলতে চাইছিলাম তোমাকে।’
‘এরা কি বুদ্ধিমান?’
‘জানি না। না হলেই ভালো।’ স্প্রে ট্যাংকটা উঁচু করল হল। ‘এদের বিস্তার কত দূর, তা আশা করি এখন আমরা বুঝতে পারব।’
সুইচ টিপে দিল সে। নজল ঘুরিয়ে পুরো ল্যাবে শুরু করল স্প্রে। স্টেলা আর চার গার্ড দাঁড়িয়ে রইল একদিকে। সবকিছু যেমন ছিল, তেমনই আছে। জানালা দিয়ে ঢুকছে রোদ, আলোয় ঝলমল করছে ল্যাবের ভেতরের কাচের জিনিস।
‘কিছুই তো ঘটছে না,’ খানিক পর বলল স্টেলা। ‘কিছু বেরোতেও দেখলাম না তোমার স্প্রেতে।’
‘আর্সাইনের কোনো রং নেই...বর্ণহীন,’ বলল হল। ‘হেলমেট খুলো না। গ্যাসটা খুবই বিষাক্ত। যেখানে আছ, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।’
অপেক্ষা করতে থাকল ওরা। অনেকক্ষণ কিছু ঘটল না। কিন্তু তারপরই আঁতকে উঠল স্টেলা।
‘গুড লর্ড!’
ল্যাবের শেষ প্রান্তে নড়ে উঠেছে একটা স্লাইড ক্যাবিনেট। কাঁপতে শুরু করল প্রথমে, এরপর শরীর মোচড়াতে থাকল। ধীরে ধীরে আকৃতি হারিয়ে একটা থিকথিকে তরলের রূপ নিল ওটা, ছড়িয়ে পড়ল ল্যাব টেবিলের ওপর। সেখান থেকে গড়াতে গড়াতে নেমে এল মেঝেতে। মনে হলো পালানোর চেষ্টা করছে।
‘ওই যে! আরেকটা!’ চেঁচিয়ে উঠল এক গার্ড।
এবার নড়াচড়া করছে একটা বুনসেন বার্নার। সেটা পুরোপুরি গলে যাওয়ার আগেই নড়তে শুরু করল আরও অনেক জিনিস। কাচের একটা বড় পাত্র ভাঁজ হয়ে গেল। গলতে শুরু করল টেস্টটিউবভর্তি একটা র্যাক, কেমিক্যালের একটা শেলফ...
‘সরে যাও!’ চেঁচিয়ে উঠে এক লাফ দিল হল।
তার সামনে ধপাস করে পড়ে গেল একটা বেল জার, গলে গেল। থিকথিকে জিনিসটা খুঁটিয়ে দেখল সে। পুরোটাই একটা কোষ; আবছাভাবে চোখে পড়ল কোষপ্রাচীর, নিউক্লিয়াস আর সাইটোপ্লাজমের ভেতরে ভাসতে থাকা নানা রকম কণা।
ততক্ষণে যেন ঝড় শুরু হয়েছে ল্যাবের ভেতরে। পাইপ, টেস্টটিউব, জার, বোতল, ফ্লাস্ক, মাইক্রোস্কোপ...নড়তে শুরু করেছে সব জিনিস। যত কিছুর নকল করা সম্ভব, সবই করা হয়েছে।
ব্লাস্টার বের করে ফেলল এক গার্ড, থাবা দিয়ে অস্ত্রটা নামিয়ে দিল হল। ‘খবরদার, গুলি কোরো না। আর্সাইন অত্যন্ত দাহ্য...আগুন ধরে যাবে। তার চেয়ে চলো বেরিয়ে যাই। যা দেখার, দেখা হয়ে গেছে।’
দৌড়ে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে এল সবাই। দরজাটা ভালো করে আটকে দিল হল।
‘অবস্থা তো খুবই খারাপ,’ মন্তব্য করল স্টেলা। গলায় জোর নেই তার।
‘ঠিকই ধরেছ,’ মাথা ঝাঁকাল হল। ‘কোনো সুযোগ নেই আমাদের। আর্সাইন ছিটিয়ে সামান্য খোঁচা দেওয়া গেছে ওদের, বেশি করে ছড়ালে হয়তো খতমও করা যাবে। সমস্যা হলো, এত আর্সাইন নেই আমাদের হাতে। তা ছাড়া পুরো গ্রহে যদি আর্সাইনের বন্যাও বইয়ে দেওয়া যায়, আমরা ব্লাস্টার ব্যবহার করতে পারব না, আত্মরক্ষা করতে পারব না।’
‘আমরা যদি গ্রহ ছেড়ে চলে যাই?’
‘ওরা যে আমাদের সঙ্গী হবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? এত বড় ঝুঁকি নিতে চাও তুমি?’
‘কিন্তু এখানে থাকলে আমরা সবাই মারা যাব।’
‘আর্সাইন আরও আনিয়ে নিতে পারি আমরা। কিংবা অন্য কোনো বিষ। তবে ওদের ধ্বংস করতে গেলে এই গ্রহের বাকি সব প্রাণও ধ্বংস হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত রইবে না কিছুই।’
‘দরকার হলে তা-ই করব। বিষ পাওয়া না গেলে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করব ওদের। তাতে গ্রহটা মরে গেলেও কিছু যায়-আসে না।’
ব্লাস্টার বের করে ফেলল এক গার্ড, থাবা দিয়ে অস্ত্রটা নামিয়ে দিল হল। ‘খবরদার, গুলি কোরো না। আর্সাইন অত্যন্ত দাহ্য...আগুন ধরে যাবে। তার চেয়ে চলো বেরিয়ে যাই। যা দেখার, দেখা হয়ে গেছে।’
অপলকে কমান্ডারের দিকে তাকিয়ে রইল হল।
‘সিস্টেম মনিটরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে যাচ্ছি আমি,’ খানিক পর বলল স্টেলা। ‘ইউনিটের সবাইকে এই গ্রহ থেকে সরিয়ে নেব...যতজন বেঁচে আছে আরকি। আগে নিজেরা বাঁচি, তারপর ঠিক করা যাবে, কীভাবে গ্রহটাকে সাফ করা যায়।’
‘ঝুঁকিটা তাহলে নেবেই তুমি?’ থমথমে গলায় বলল হল।
‘অনুরূপীরা কি আমাদের নকল বানাতে পারবে? মানে কোনো মানুষের?’
একটু ভাবল হল। তারপর বলল, ‘মনে হয় না। এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে শুধু জড়বস্তুর অনুকৃতি বানিয়েছে ওরা।’
ঠোঁটের কোণে একটুকরা হাসি ফুটল স্টেলার। ‘তাহলে আমরা জড়বস্তু ছাড়াই যাব।’
‘কিন্তু গায়ে তো পোশাক থাকবে! ওরা জামাকাপড়, বেল্ট, জুতা...সবকিছুর রূপ নিতে পারে।’
‘বললাম তো কিছু নেব না। জামাকাপড়ও না।’
এবার হলও হাসল। ‘বুঝতে পেরেছি। এতে অবশ্য কাজ হতে পারে। কিন্তু লোকজনকে রাজি করাতে পারবে? হাজার হোক, মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন।’
‘রাজি করানোর কিছু নেই। হুকুম দেব। জীবন বাঁচানোর জন্য আমি যেকোনো হুকুম দিতে পারি।’
‘তা অবশ্য ঠিক। জীবন বাঁচানোর এই একটা পথই খোলা আছে আমাদের সামনে।’
প্ল্যানেট ব্লু থেকে দুই ঘণ্টার দূরত্বে আছে সবচেয়ে নিকটবর্তী ক্রুজারটি। খোঁজখবর নিয়ে স্টেলা যোগাযোগ করল ওটার সঙ্গে। পুরো ব্যাপারটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, বুঝতে পারল না, তাই হাতছানি দিয়ে ডাকল হলকে।

ভিডিও স্ক্রিনে ক্রুজারের ক্যাপ্টেনকে অভিবাদন জানাল হল। নিজের পরিচয় দিল, ‘আমি মেজর লরেন্স হল, এই ইউনিটের রিসার্চ ডিভিশনের দায়িত্বে রয়েছি।’
‘ক্যাপ্টেন ড্যানিয়েল ডেভিস,’ নিজের নাম বললেন ক্যাপ্টেন। ‘আপনারা কি কোনো সমস্যায় পড়েছেন, মেজর? আপনার কমান্ডার ঠিকমতো কিছুই বললেন না।’
‘আমিও বলতে চাই না। মানে এখনই নয়। শিপে ওঠার পর সব খুলে বলব আপনাদের।’
‘এখন বলতে অসুবিধা কী?’
‘শুনলে বিশ্বাস হবে না আপনাদের। আমাদের পাগলও ঠাওরে বসতে পারেন।’ একটু ইতস্তত করল হল। ‘আরেকটা ব্যাপার...আমরা আপনার শিপে কোনো ধরনের জামাকাপড় ছাড়া উঠব।’
ভুরু কুঁচকে গেল ক্যাপ্টেনের। ‘জামাকাপড় ছাড়া মানে?’
‘জি।’
‘হুম, বুঝতে পেরেছি।’ আসলে কিছুই বোঝেননি ক্যাপ্টেন।
‘আপনারা পৌঁছাবেন কখন?’
‘দুই ঘণ্টার মতো লাগবে।’
‘এখন একটা বাজে। তার মানে কি বেলা তিনটা নাগাদ আশা করতে পারি আপনাদের?’
‘হ্যাঁ, তিনটার মধ্যেই ল্যান্ড করব আশা করি।’
‘আমরা অপেক্ষা করব। আপনার কোনো লোক যেন নিচে না নামে। আমাদের জন্য শুধু একটা দরজা খুলবেন। আমাদের সঙ্গে কিচ্ছু থাকবে না—না যন্ত্রপাতি, না জামাকাপড়...কিচ্ছু না। শুধু মানুষগুলো উঠবে। সবাই উঠে যাওয়ার পর একমুহূর্তও দেরি করবেন না, শিপ নিয়ে উড়াল দেবেন, ঠিক আছে?’
‘শুনলে বিশ্বাস হবে না আপনাদের। আমাদের পাগলও ঠাওরে বসতে পারেন।’ একটু ইতস্তত করল হল। ‘আরেকটা ব্যাপার...আমরা আপনার শিপে কোনো ধরনের জামাকাপড় ছাড়া উঠব।’
স্ক্রিনে উঁকি দিল স্টেলা। দ্বিধান্বিত গলায় বলল, ‘ক্যাপ্টেন...যদি কিছু মনে না করেন...আপনার লোকেরা কি...’
কী বলতে চাইছে ও, তা বুঝতে পারলেন ক্যাপ্টেন। আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘কিচ্ছু ভাববেন না। রোবট কন্ট্রোলের মাধ্যমে আমার শিপ ল্যান্ড করানো যায়। দৃষ্টিসীমায় আমার কোনো লোক থাকবে না। কেউ দেখবে না আপনাদের।’
‘ধন্যবাদ।’
‘কোনো ব্যাপার না। একটু ধৈর্য ধরুন। দুই ঘণ্টার মধ্যে দেখা হবে, কমান্ডার।’
অন্ধকার হয়ে গেল ভিডিও স্ক্রিন।
‘সবাইকে মাঠে জড়ো হতে বলি,’ বলল স্টেলা। ‘জামাকাপড় এখানেই খুলে রেখে যাবে। তাহলে শিপটা যখন ল্যান্ড করবে, সেখানে নকল করার মতো কিছু থাকবে না।’
‘হ্যাঁ। সেটাই ভালো।’
ঠোঁট কামড়াল লেফটেন্যান্ট ফ্রেন্ডলি। ‘জামাকাপড় ছাড়া আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, মেজর। আমি বরং এখানেই থেকে যাই। আপনারা চলে যান।’
‘অসম্ভব! যেতেই হবে তোমাকে।’
‘কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু নয়।’ হাতঘড়ি দেখল হল। ‘পৌনে তিনটা বাজে। স্পেসশিপটা চলে আসবে এখনই। জলদি জামাকাপড় খুলে ল্যান্ডিং ফিল্ডে চলো।’
‘কিছুই কি নিতে পারব না?’
‘না। অস্ত্রশস্ত্রও নেওয়া চলবে না। আরে বাবা, কয়েক মিনিটেরই তো ব্যাপার। শিপে উঠলেই নতুন পোশাক দেওয়া হবে আমাদের।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফ্রেন্ডলি। ‘বেশ। আপনি যখন বলছেন। আমিও বোধ হয় একটু ছেলেমানুষিই করছি।’
ঠিক তখনই ভিডিও স্ক্রিনের স্পিকারে শোনা গেল ঘোষণা। ‘সবাইকে এক্ষুনি বিল্ডিং থেকে বেরোনোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। শিপ এসে গেছে। বেরিয়ে পড়ুন সবাই।’
‘এত তাড়াতাড়ি!’ একটু অবাক হলো হল। জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল। ‘ল্যান্ড করার শব্দই তো শুনলাম না।’
তবে সত্যিই এসেছে ক্রুজারটা। ধূসর রঙের বিশাল দেহ নিয়ে রাজহাঁসের মতো বসে আছে ল্যান্ডিং ফিল্ডের ঠিক মাঝখানে। শরীরে উল্কাপিণ্ডের হাজারো আঘাতের চিহ্ন—মহাকাশভ্রমণে যা হয়। ক্যাপ্টেন তাঁর কথা রেখেছেন, শিপ থেকে বেরিয়ে আসেনি কেউ, কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন ওটায় কেউ নেই। জামাকাপড় ছাড়া একদল মানুষ ইতিমধ্যে হাঁটতে শুরু করেছে ওটাকে লক্ষ্য করে।
‘এসে গেছে,’ বলল হল। ‘আর দেরি করা চলে না। চলো।’
‘দাঁড়ান একটু। কাপড়টা খুলে নিই।’
ঠিক তখনই ভিডিও স্ক্রিনের স্পিকারে শোনা গেল ঘোষণা। ‘সবাইকে এক্ষুনি বিল্ডিং থেকে বেরোনোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। শিপ এসে গেছে। বেরিয়ে পড়ুন সবাই।’
ঝটপট জামা খুলে হল আর ফ্রেন্ডলি বেরিয়ে পড়ল কামরা থেকে। লম্বা করিডর ধরে দ্রুত এগিয়ে চলল। শিগগিরই পৌঁছে গেল বিল্ডিংয়ের বাইরে। আকাশ থেকে কড়া রোদ ঢালছে সূর্য। তারই মধ্যে পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে পোশাকহীন নারী-পুরুষের দল, এগিয়ে চলেছে ল্যান্ড করা স্পেসশিপের দিকে।
‘এই দৃশ্য জীবনে ভুলব না,’ বলল এক অফিসার।
‘অন্তত প্রাণে তো বাঁচতে পারছ, এই ভেবে শোকর করো,’ পাশ থেকে বলল আরেকজন।
পেছন থেকে ডাক ভেসে এল, ‘লরেন্স!’
ঘাড় ফেরাতে শুরু করল হল।
‘প্লিজ, তাকিয়ো না। হাঁটতে থাকো। আমি তোমার পেছনে আছি।’
হাসল হল। ‘কেমন লাগছে, স্টেলা?’
‘আবার জানতে চাইছ? আজকের পর আমার লোকজনের সামনে আর মুখই বোধ হয় দেখাতে পারব না।’
‘জীবন বাঁচানোর জন্য এটুকু ত্যাগ স্বীকার নাহয় করলে।’
‘তা অবশ্য ঠিক।’
‘কী মনে হয় তোমার, কেউ আমাদের বিশ্বাস করবে?’
‘সন্দেহ আছে। আমার নিজেরই তো বিশ্বাস হচ্ছে না।’
‘যা-ই ঘটুক, আমরা জীবন নিয়ে ফিরতে পারছি।’
‘হুম, এটুকুই সান্ত্বনা।’
শিপ থেকে একটা র্যাম্প নামানো হয়েছে, ওদিকে তাকাল হল। দলে দলে মানুষ ঢুকছে ওখান দিয়ে, বৃত্তাকার এয়ারলক পেরিয়ে প্রবেশ করছে শিপের অভ্যন্তরে।
‘লরেন্স! আ...আমার...’
কেন যেন কাঁপছে স্টেলার গলা। হল জানতে চাইল,
‘কী হয়েছে?’
‘আমার ভয় করছে।’
‘ভয়!’ থেমে গেল হল। ‘কেন?’
‘জানি না।’
ঠিক বেলা তিনটায় প্ল্যানেট ব্লুর ল্যান্ডিং ফিল্ডে নিজের স্পেসশিপ নামিয়ে আনলেন ক্যাপ্টেন ডেভিস। দরজা খুলে গেল, ধীরে ধীরে মাটির দিকে প্রসারিত হলো র্যাম্প।
চারপাশ থেকে ওদের ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে লোকজন। হল বলল, ‘এ নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ো না। গায়ে কিছু নেই তো, তাই আজেবাজে চিন্তা ঢুকছে মাথায়। নিজেকে অরক্ষিত ভাবছ।’ র৵াম্পে একটা পা রাখল সে। ‘চলে এসো।’
‘আমি ফিরে যেতে চাই, লরেন্স,’ পরিষ্কার আতঙ্ক ফুটল স্টেলার কণ্ঠে। ‘ঢুকতে চাই না ওখানে।’
‘দেরি করে ফেলেছ,’ র্যাম্পের পাশের রেলিং ধরে তাল সামলাল হল। মানুষের স্রোতের ভেতরে পড়ে গেছে ওরা। এখন আর কিছু করতে হচ্ছে না, পেছনের লোকজনই ঠেলে ওদের নিয়ে চলেছে সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন পৌঁছে গেল এয়ারলকের সামনে। ‘এই তো, এসে গেছি।’
সামনের লোকজন ঢুকে গেল ভেতরে।
পিছু পিছু হলও ঢুকল—নিঃসীম অন্ধকারে। স্টেলা অনুসরণ করল তাকে।
ঠিক বেলা তিনটায় প্ল্যানেট ব্লুর ল্যান্ডিং ফিল্ডে নিজের স্পেসশিপ নামিয়ে আনলেন ক্যাপ্টেন ডেভিস। দরজা খুলে গেল, ধীরে ধীরে মাটির দিকে প্রসারিত হলো র্যাম্প। শিপের অভ্যন্তরে, কন্ট্রোল রুমে বসে ইউনিট সদস্যদের আরোহণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন ক্যাপ্টেন ও তাঁর সঙ্গীরা।
বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন কারও দেখা পাওয়া গেল না, ক্যাপ্টেন বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘ব্যাপার কী! কোথায় ওরা?’
অফিসাররা মুখ–চাওয়াচাওয়ি করল। একজন বলল, ‘হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে।’
‘কিংবা রসিকতা করা হয়েছে আমাদের সঙ্গে,’ বলল আরেকজন।
অপেক্ষার প্রহর কেবল দীর্ঘায়িতই হলো।
কিন্তু এল না কেউ।
