নিজস্ব ছবি এই সময়
Published on
:
5 min read
সত্যগোপাল দে
খবরের কাগজের এক কোণে ছোট্ট একটা খবর, হয়তো অনেকেরই খবরটা চোখে পড়েনি। এই খবরের অনুষঙ্গে একটি সাত বছরের ছোট্ট মেয়েকে কোনও এক ট্রায়াল কোর্টের বিচারপতির লেখা একটি চিঠি সংবাদে সংযোজিত হয়। কী লিখেছিলেন সেই মহিলা বিচারপতি সেই চিঠিতে, আর কেনই বা লিখেছিলেন, তা ক্রমশ প্রকাশ্য।
তা হলে একটু দেখে নেওয়া যাক কী লেখা ছিল এই চিঠিতে, মাননীয়া বিচারক আদালতের আইনি ভাষাকে সম্পূর্ণ বর্জন করে মেয়েটিকে লিখেছিলেন— ‘বেটা.../ আমরা হয়তো তোমার শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারব না,/ কিন্তু কথা দিচ্ছি— যে আঙ্কল তোমার এত বড় ক্ষতি করেছে,/ সে এই জেলের খাঁচাতেই বুড়ো হবে, এখানেই মরবে.../ লিভ ইয়োর লাইফ।/ নিশ্চিন্তে স্কুলে যাও,/ বন্ধুদের সঙ্গে হাসো, খেলো, স্বপ্ন দেখো...’। এ বার কেন এই চিঠি, তার প্রেক্ষাপটটি জেনে নেওয়া যাক। বাচ্চা মেয়েটি যাকে ‘আঙ্কল’ বলে ডাকত, যাকে সে বিশ্বাস করত, তার মনে যে এই অভিসন্ধি, সাত বছরের মেয়েটি তা বুঝতে পারেনি। মেয়েটির মা-বাবার অতীব বিশ্বাসভাজন এই ‘আঙ্কল’-এর দায়িত্বে তাকে একা রেখে দিতে কোনও দিন ইতস্তত বোধ করেনি তার অভিভাবকেরা। একদিন বাড়িতে একা পেয়ে সেই তথাকথিত বিশ্বস্ত ‘আঙ্কল’ তাকে নৃশংস ভাবে ধর্ষণ করেছিল। ভয়ে-যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েছিল সাত বছরের মেয়েটি। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সামলেও ওঠে সে। বাড়িতে বলেছিল সব কিছু। ফার্স্ট ট্র্যাক পকসো কোর্টে গিয়েও আঙুল তুলে বলেছিল— ‘হ্যাঁ, এই আঙ্কলই ছিল সে দিন... আমাকে...’। সংবাদে প্রকাশ, বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিল বাচ্চা মেয়েটি।
ঘটনাটা ২০২৩-এর। তার পর কেটে গেছে আরও তিন-তিনটে বছর। এর মধ্যে বেশ কয়েক বার তাকে যেতে হয়েছে কোর্টে। লোকটার কী শাস্তি পাওয়া উচিত, খুদে মাথায় তার হিসেব কষে উঠতে পারেনি মেয়েটি। তবে আদালতের কাছে বারবার সে শুধু একটাই আর্জি রেখেছিল— ‘বুড়ো হওয়ার আগে যেন এই আঙ্কল কিছুতেই জেল থেকে বেরোতে না পারে।’ কোর্ট তার কথা শুনেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে দিল্লির অতিরিক্ত দায়রা জজ রজনী রঙ্গ অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড সহ ১০.৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন। রায়ের আইনি নির্দেশ ছাড়াও বিচারক নির্যাতিতাকে একটি আবেগঘন ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন, যা এই নিবন্ধের প্রথমেই উল্লিখিত। পরবর্তীকালে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সাজা স্থগিতের জন্য দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করলে ২০২৬-এর সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি প্রতিভা এম সিং এবং বিচারপতি দিনেশ ভাটের বেঞ্চ ট্রায়াল কোর্টের ওই রায় ও সাজা বহাল রাখেন। হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের বিচারকের চিঠিটিকে ‘অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক’ ও ‘মানবিক’ আখ্যা দিয়ে নির্দেশ দেয়, দিল্লির জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ যেন চিঠিটির বার্তা শিশুটির কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। অন্যান্য অনেক খবরের মতো এই ঘটনাটি খবরেই শুরু আর খবরেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্ত কলম ধরতেই হলো।
ভারতে প্রতি ঘণ্টায় চারজন নারী ধর্ষিতা হন। এই তথ্যটি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি)। এনসিআরবি-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের বিরুদ্ধে মোট অপরাধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ৭০২টি, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় যা প্রায় ৫.৯ শতাংশ বেশি। মোট অপরাধের প্রায় ৩৬.৯ শতাংশ অপরাধ পকসো আইনের অর্থাৎ শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের আওতাভুক্ত। মনে রাখতে হবে যে এটি শুধু নথিভুক্ত সংখ্যা। এই ধরনের অনেক ঘটনাই সামাজিক লজ্জার ভয়ে নথিভুক্ত হয় না। পকসো মামলার ক্ষেত্রে ৯৭ শতাংশের বেশি ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুর পূর্বপরিচিত অর্থাৎ পরিবারের সদস্য, নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী, পারিবারিক বন্ধু, গৃহশিক্ষক বা অন্য কোনও পরিচিত ব্যক্তি। নির্যাতিত শিশুদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কন্যা শিশু, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছর। সংখ্যায় কম হলেও ছেলে শিশুরা এই ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই নিবন্ধটি শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ভরিয়ে তোলা উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য একটাই, শিশুদের অভিভাবকরা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে একটু সচেষ্ট হলে এই অপরাধের সংখ্যা অনেকাংশে কমতে পারে, এমনকী শূন্য হয়ে যেতে পারে। শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণা আছে, সমাজে অনেক মিথ আছে। অনেকেই মানতে চায় না যে পরিবারের আপন জন এই অপরাধে যুক্ত থাকতে পারে। কেউ যদি মেনেও নেয়, পারিবারিক মান-সম্মান খোয়ানোর ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করে না। অথচ পকসো (প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট), ২০১২ অনু্যায়ী এই অপরাধ ঘটলে পুলিশকে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানানো বাধ্যতামূলক। নতুবা কঠিন শাস্তির বিধান আছে আইনে। অনেকে আবার মনে করে, আজকাল মিডিয়ার দৌলতে ছোট ঘটনাকেও বড় করে দেখানো হয়, কিন্তু আগে এমনটি হতো না। বিষয়টি যে আদৌ সাম্প্রতিক কালের নয়, কয়েকটি উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে।
বিখ্যাত মার্কিন টিভি উপস্থাপক, অভিনেত্রী এবং সমাজসেবী ওপরা উইনফ্রে মাত্র নয় বছর বয়স থেকে পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও পরিচিতদের দ্বারা ধারাবাহিক ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এই ট্রমা অতিক্রম করে তিনি পরবর্তী কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাশনাল চাইল্ড প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ বলবৎ করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন, যে কারণে এখন তা ‘ওপরা বিল’ নামে পরিচিত। কিংবদন্তি আমেরিকান লেখিকা ও কবি মায়া অ্যাঞ্জেলু মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর মায়ের প্রেমিকের দ্বারা ধর্ষিত হন। এই ঘটনার ট্রমায় তিনি প্রায় পাঁচ বছর কথাই বলতে পারেননি। পরে তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস’-এ তাঁর এই অভিজ্ঞতা এবং ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। মনে রাখতে হবে, শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন সুপ্রাচীন কালেও ছিল। প্রাচীন গ্রিক সমাজে পিডাস্টেরিয়া অর্থাৎ বয়স্ক পুরুষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা সামাজিক ভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর যৌন শোষণ। উনিশ শতকের ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে পথশিশু ও অভিভাবকহীন শিশুদের বাধ্য করা হতো যৌনকর্মী হতে। এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেই ১৮৮৫ সালে ব্রিটেনে ‘ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’ বলবৎ হয়, যার ফলে যৌন সম্মতির বয়স বাড়িয়ে ষোল করা হয়।এত তথ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জানাবার কারণ একটাই। এই ঘৃণ্য অপরাধটি শুধু সাম্প্রতিক কালের নয়, অথচ চেষ্টা করলে এই অপরাধ অনেকাংশে কমতে পারে।
নারী ও শিশুদের উপর যৌন হিংসা বন্ধ করতে হলে সেক্স, সেক্সুয়ালিটি এবং জেন্ডার-সংক্রান্ত বয়সোপযোগী শিক্ষা এবং পাঠক্রম চালু করা আশু কর্তব্য। এ বিষয়ে দু’টি বইয়ের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে— ‘দ্য অরেঞ্জ বুক: আ টিচার্স ওয়ার্কবুক অন সেক্সুয়ালিটি এডুকেশন’ এবং ‘দ্য ইয়েলো বুক: আ পেরেন্ট’স গাইড টু সেক্সুয়ালিটি এডুকেশন’। এখনও এ দেশে যৌনতা এবং প্রজনন সম্পর্কে ফিসফিস করে কথা বলা হয়। ফলে অধিকাংশ কিশোর-কিশোরীই প্রকৃত যৌন শিক্ষার অভাবেই বড় হয়। ভুল উৎস থেকে সেক্স-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য লাভ করে তারা, তাতে বাস্তবে তাদেরই ক্ষতি হয়। কৈশোরে যৌনশিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের সময় থেকেই সন্তানকে সঠিক যৌন শিক্ষা দেওয়া ও নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তোলার দায়িত্ব মূলত মা-বাবা এবং অভিভাবকদের। কোনও মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা যে স্রেফ সেক্স টার্গেট নয়— ‘তুমি দেখো নারী পুরুষ/ আমি দেখি শুধুই মানুষ’ এই গানটির মর্মার্থ ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে। এমনকী প্রারম্ভিক শিক্ষার বয়স থেকে শিশুকে খুব সহজ করে বোঝানো যেতে পারে কোনটি তার প্রাইভেট পার্টস অর্থাৎ গোপন অঙ্গ। এই অঙ্গগুলির বিকৃত নাম না বলে আসল নাম শেখাতে হবে। কেন এই অঙ্গগুলি ঢেকে রাখতে হয়, কেনই বা এটি অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারে না, যদি কেউ এমনটা করে তা হলে সে চেনা কিংবা অচেনা হোক, নির্ভয়ে শিশুটি যেন তার মা-বাবা বা অভিভাবককে বলে দেয়— শৈশব থেকে এ ভাবেই ‘ভালো স্পর্শ, মন্দ স্পর্শ’ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। এ দেশে শিশু ও নারী সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন এবং নীতিমালা প্রচুর। কিন্ত দুঃখের বিষয়, এই আইনগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করে শুধু আদালত ও পুলিশ। এই ধরনের আইন আমজনতার দরবারে পৌঁছনো উচিত, যাতে যে কোনও মানুষ এই আইনগুলির সহজ সংস্করণ সংগ্রহ করতে পারে।
শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত আইনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন) অ্যাক্ট ২০১৫, এই আইনটিকে শিশু সুরক্ষার প্রধানতম আইন বলা যেতে পারে। পকসো আইনের কথা আগেই বলেছি। এ ছাড়া প্রহিবিশন অফ চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট ২০০৬, চাইল্ড লেবার প্রহিবিশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যাক্ট এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং নাগরিক সংহিতা। নতুন আইনে যৌন নিগ্রহকে ‘লিঙ্গ নিরপেক্ষ’ করা হয়েছে, যা ভারতীয় দণ্ডবিধিতে ছিল না। ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য করা হবে না। মনে রাখতে হবে আইনগুলি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকলে কী ভাবে প্রতিরোধ করা যাবে, ঘটনা ঘটলে কোথায় যেতে হবে, কেমন ভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে, কী ভাবে মেডিক্যাল টেস্ট হবে, নির্যাতিত ছেলেমেয়েদের ক্ষতিপূরণ কী ভাবে, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, শিশুবান্ধব বিচার প্রক্রিয়া কী ভাবে চলবে, কোনগুলি যৌন অপরাধ এবং এই অপরাধের প্রকারভেদ এবং শাস্তির মেয়াদ ইত্যাদি অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা যাবে। এমন একটা পৃথিবী দরকার যেখানে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ যেন আর না ঘটে, আর তার দায়িত্ব সকলের। লেখক বিক্রমশীলা এডুকেশন রিসোর্স সোসাইটির, শিশু সুরক্ষা কৌশল, সরকারি সম্পর্ক ও মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান
