নিকোটিন অত্যন্ত তীব্র আসক্তি সৃষ্টিকারী একটি উপাদান। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সাইকেডেলিক ড্রাগ মানুষের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনবোধে এমন এক গভীর পরিবর্তন আনতে পারে, যা তাদের দীর্ঘদিনের ধূমপানের অভ্যাস পরিহার করতে সরাসরি সহায়তা করে।
তামাক ত্যাগ করা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন আসক্তিগুলোর একটি। এতে বিদ্যমান নিকোটিন কোকেন এবং হেরোইনের মতোই মারাত্মক আসক্তি তৈরি করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে যারা চেষ্টা করেন, তাদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম ব্যক্তি এক বছরের মধ্যে চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করেন।
তবে সাইকেডেলিক ড্রাগের মাধ্যমে ধূমপান পরিহারের পথ সুগম হতে পারে এমন গবেষণালব্ধ প্রমাণ ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় ৭৮১ জন অংশগ্রহণকারী জানান, এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম বা অন্য কোনো সাইকেডেলিক পদার্থের প্রভাবে তারা ধূমপান উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে অথবা পুরোপুরি ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই পদ্ধতির সফলতা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক উপলব্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যারা নিকোটিনের অভ্যাস ত্যাগ করতে পেরেছিলেন, তাদের প্রায় সবাই একটি অভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন। তারা হঠাৎ অনুভব করেন যে তাদের জীবনের মৌলিক মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকার বদলে গেছে। বিশেষ করে, ধূমপান যে তাদের জীবনে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে না, তা তারা গভীরভাবে অনুধাবন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও আচরণগত বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং উক্ত গবেষণার প্রধান লেখক ম্যাথিউ জনসন বলেন, ‘অভিজ্ঞতাটির ব্যাপকতা ধূমপান ছাড়ার আগে বিদ্যমান দুর্লঙ্ঘ্য মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।’
সিলোসাইবিন কীভাবে মস্তিষ্কে কাজ করে?
সাইকেডেলিক যৌগ সিলোসাইবিন মূলত মানুষের মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং স্নায়বিক সংযোগ বা 'নিউরোপ্লাস্টিসিটি'-এর ওপর গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। দীর্ঘমেয়াদি আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে বছরের পর বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু আচরণগত প্যাটার্ন বা অভ্যস্ততার পথ স্থায়ী রূপ নেয়, যার ফলে চাইলেও ওই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সিলোসাইবিন মস্তিষ্কে সুপ্ত ও শক্ত হয়ে যাওয়া কাঠামোগুলোকে এক ধরনের ‘রিসেট’ বা পুনর্গঠন করার অনন্য সুযোগ তৈরি করে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের মতো বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, অভিজ্ঞ সাইকোথেরাপিস্টদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মনোচিকিৎসার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ মাত্রায় সিলোসাইবিন প্রয়োগ করলে রোগীদের ধূমপানের প্রতি তীব্র মানসিক তাড়না ও আসক্তি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।
আসক্তি নিরাময়ে সাইকেডেলিকসের ইতিহাস
আসক্তি উপশমে সাইকেডেলিক উপাদানের ব্যবহার বহু পুরোনো। ১৯৫০-এর দশকে মদ্যপানের চিকিৎসায় এলএসডি ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া এমডিএমএ অ্যালকোহল আসক্তি কমাতে এবং মধ্য আফ্রিকার ‘ইবোগা’ গুল্ম থেকে প্রাপ্ত ‘ইবোগেইন’ নামক উপাদান অপিওয়েড প্রত্যাহারজনিত শারীরিক যন্ত্রণা কমিয়ে আসক্তি কাটাতে ভূমিকা রাখে।
অধ্যাপক জনসন ২০০৬ সাল থেকে ধূমপান ত্যাগে সিলোসাইবিনের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। বাস্তবসম্মত প্রমাণের সুবিধার্থে তিনি ধূমপানকে বেছে নেন। কারণ শ্বাস ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে নিকোটিনের জৈবিক উপস্থিতি খুব সহজেই ও নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা যায়।
২০১৪ সালে প্রকাশিত তার প্রথমদিকের এক পাইলট গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ জন দীর্ঘমেয়াদি ধূমপায়ীর মধ্যে যারা ১৫ সপ্তাহব্যাপী সিলোসাইবিন সহায়তামূলক কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপিতে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ৮০ শতাংশই ছয় মাস পর ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে এই সাফল্যের হার সাধারণত মাত্র ৩৫ শতাংশ।
প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় কার্যকারিতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
প্রচলিত পদ্ধতিতে ধূমপান ত্যাগের চেষ্টার ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথম কিছুদিন সফলতা মিললেও পরবর্তী সময়ে পুনরায় ধূমপান শুরু করার হার অত্যন্ত বেশি। এর মূল কারণ হলো- প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থা কেবল শারীরিক নিকোটিনের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মনের গভীরে গেঁথে থাকা মানসিক নির্ভরতাকে দূর করতে পারে না।
পক্ষান্তরে, সিলোসাইবিন থেরাপি গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রভাবে রোগীরা ধূমপানের আসল মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। এটি কেবল সাময়িক শারীরিক আসক্তি কমায় না, বরং ব্যক্তির মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়ে ধূমপানের প্রতি তীব্র অনীহা তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে ধূমপানমুক্ত জীবনযাপনে সহায়তা করে।
চিকিৎসকদের সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগের আবশ্যকতা
গবেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে জানিয়েছেন, ম্যাজিক মাশরুম বা সিলোসাইবিন কোনোভাবেই সাধারণ ঘরোয়া উপায় বা বিনোদনমূলক উদ্দেশে সেবনযোগ্য কোনো উপাদান নয়। চিকিৎসকের কঠোর পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল প্রোটোকল এবং নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া এর যত্রতত্র ব্যবহার অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে যাদের অতীতের কোনো গুরুতর মানসিক অসুস্থতা বা সাইকোটিক ব্যাধির ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সিলোসাইবিন মারাত্মক প্রতিকূল মানসিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই এটি সম্পূর্ণভাবে গবেষণাগার ও বিশেষায়িত চিকিৎসালয়ের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বাধ্যতামূলক।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও তাৎপর্য
আধুনিক মনোরোগ বিদ্যা এবং আসক্তি নিরাময় গবেষণায় সিলোসাইবিনের ব্যবহার এক বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘমেয়াদি নিকোটিন আসক্তি ছাড়াও অ্যালকোহল ও অন্যান্য ক্ষতিকর মাদকাসক্তি নিরাময়েও এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে নিবিড় গবেষণা চলছে। গবেষণার চূড়ান্ত সফলতা, আইনি অনুমোদন এবং চিকিৎসাগত প্রমিতকরণ সম্পন্ন হলে এটি বিশ্বজুড়ে ধূমপানজনিত বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ এবং অকালমৃত্যুর হার হ্রাসে একটি যুগান্তকারী ও মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হবে।সূত্র: বিবিসি
খাদিজা রুমি/
